ঢাকা, রোববার 16 April 2017, ৩ বৈশাখ ১৪২৩, ১৮ রজব ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সর্বগ্রাসী অসহিষ্ণুতা

১৫ এপ্রিল, ডয়চে ভেলে: ভারতের কেন্দ্রে বিজেপি সরকার আর বিধানসভা ভোটে বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ভর করে হিন্দুত্ববাদী সংঘ পরিবারের লক্ষ্য এবার ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচন। ধর্মীয় মেরুকরণ ও সর্বগ্রাসী অসহিষ্ণুতা তারই প্রতিফলন, যার শিকার খ্রিষ্টান ও আফ্রিকানরাও।
প্রধানমন্ত্রী মোদী যতই উন্নয়নের কথা বলুন না কেন, আসল লক্ষ্য তার ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচন। তাই তলে তলে সমানে চলেছে ধর্মীয় মেরুকরণের কাজ। উত্তর প্রদেশ বিধানসভার হালের নির্বাচনে বিজেপির বিপুল সাফল্যের পর যোগী আদিত্য নাথকে যখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করা হলো, তখনই তা স্পষ্ট বোঝা গেছে যে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি আরো আগ্রাসী হয়ে উঠবে। হচ্ছেও তাই। অসহিষ্ণুতার প্রকাশ ঘটছে নানাভাবে। কেন্দ্রে মোদী আর উত্তর প্রদেশে যোগী- এই দুইয়ের মেলবন্ধনে হিন্দুত্ববাদী সংঘ পরিবার ঝাঁপিয়ে পড়েছে গোটা ভারতে।
 গো-রক্ষার নামে কট্টর মনোভাব, গরু পরিবহণকারীদের গণপিটুনি। তাতে মারাও গেছে জনা দুই। তাদের অপরাধ, তারা গরু বিক্রির জন্য লরিতে গরু নিয়ে যাচ্ছিলেন। রাস্তা ঘাটে নজর রাখছে ‘অ্যন্টি-রোমিও স্কোয়াড’।
তরুণ-তরুণীদের একসঙ্গে বসে গল্প করতে দেখলেই ধরপাকড় করা হয়। সব ধর্মের লোকদেরই ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার জন্য চাপ দেয়া হয়। এমনকি সূর্য নমস্কারের ভঙ্গির সঙ্গে নামাজের মিল খুঁজে অযথা বিতর্ক তোলা হয়।
উত্তর প্রদেশে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করতে রাজ্যে ‘হিন্দু যুব বাহিনী’ নামে একটি গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এদের সীমা শালীনতার গ-ি ছাড়িয়ে গেছে। কয়েকদিন আগে উত্তর প্রদেশের মিরাট শহরে এক মুসলিম বাড়িতে জোর করে ঢুকে এক দম্পতিকে হেনস্থা করা হয়। যুব বাহিনীর মতে, তারা নাকি দম্পতি নয় ছেলে বন্ধু-মেয়ে বন্ধু। এই ধরনের আরেকটি ঘটনায় যুব বাহিনী একটি ছেলের মাথা মুডিয়ে দেয়। তার অপরাধ, তিনি তার বান্ধবিকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন।
বিজেপিশাসিত গুজরাটে ভোট এ বছরের শেষ নাগাদ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী গো-হত্যার শাস্তি বাড়িয়ে যাবজ্জীবন করতে চাইছেন। বিজেপিশাসিত অপর রাজ্য ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী গো-হত্যার অপরাধে ফাঁসিতে ঝোলানোর দাবি জানিয়েছেন।
উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি খ্রিষ্টান পাদ্রি এবং চার্চগুলোও। কেরালা, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, ছত্তিশগড় রাজ্যের চার্চগুলোতে ভাঙচুর চালানো হয়, আগুণ লাগায় সংঘ পরিবারের সদস্যরা। মারধর করে চার্চের পাদ্রী এবং মহিলা নানদের।
অভিযোগ, খ্রিষ্টানরা জোর করে বা লোভ দেখিয়ে নাকি হিন্দুদের বিশেষ করে উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকদের খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করছিল। তাই দেশে মুসলিমদের মতো খ্রিষ্টান জনসংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। ‘ঘর ওয়াপসি’-র নামে আবার হিন্দু ধর্মে তাদের ফিরিয়ে আনা হবে।
একটি চার্চে গৈরিক পতাকা ছিঁডে ফেলার অভিযোগে গির্জার পুরুষ ও মহিলা সদস্যদের দৈহিক হেনস্থা করা হয়। যদিও চার্চ কর্তৃপক্ষ জানায়, গৈরিক পতাকা কেউ ছিঁড়ে ফেলেনি, বাতাসে ছিঁড়ে গেছে।
বাদ যায়নি বিদেশিরাও। আফ্রিকানদের ওপর হামলার ঘটনা জাতিবিদ্বেষের নগ্ন নজির। সম্প্রতি দিল্লির উপকণ্ঠে নয়ডায় নাইজেরীয় এক শিক্ষার্থীকে এবং কেনিয়ার একজন তরুণীকে নিগ্রহের ঘটনায় নয়া দিল্লির আফ্রিকান দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা উত্তর প্রদেশের যোগী সরকার এবং কেন্দ্রের মোদী সরকারকে মূলত দায়ী করেছেন।
এই প্রসঙ্গে উঠে আসছে, গত দু’বছরে রুয়ান্ডা, উগান্ডা ও কংগোসহ অনেক আফ্রিকান দেশের নাগরিকদের উপর হিংসাত্মক ঘটনার প্রসঙ্গ। এমন ঘটনা দিল্লী ও বেঙ্গালুরুর মতো শহরেও ঘটেছে। বছর খানেক আগে দক্ষিণ দিল্লীতে কংগোর মাসুন্ডা অলিভারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
স্বাভাবিকভাবেই তুলনা চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বা অস্ট্রেলিয়ায় ভারতীয়দের খুনের ঘটনায় জাতিবিদ্বেষ বা বর্ণবিদ্বেষের জিগির তুলে দিল্লি যদি সোচ্চার হতে পারে, তাহলে ভারতে এমন ঘটনা কেন ঘটছে, তার সদুত্তর কি মোদী সরকার দিতে পারবে?
 মোদি প্রশাসনের একাংশের অভিযোগ, আফ্রিকানদের মধ্যে কিছু মানুষ আছেন যারা মাদক পাচার এবং অন্যান্য অসামাজিক কাজে লিপ্ত। বৃহত্তর সুশীল সমাজ অবশ্য মনে করেন, এ সবই হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিরই ফল। আফ্রিকানদের বিরুদ্ধে নরমাংস খাওয়ার মতো অভিযোগ তোলা অসহিষ্ণু হিন্দুত্বাবাদী রাজনীতির আগ্রাসন ছাড়া আর কী?
অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি এবং সংঘ পরিবার তাদের সংগঠনগুলোকে আরো শক্তিশালি করতে ময়দানে নেমেছে। রাম নবমীর দিনটিকে সামনে রেখে রাজ্যের বিজেপি কর্মীরা রাস্তায় নেমে পড়েছে। হাতে রাম দা নিয়ে মিছিলও করছে। নিষেধাজ্ঞাতে কাজ না হওয়ায় পাল্টা রণকৌশলে তৃণমূল কংগ্রেসও পালন করছে হনুমান পুজো। সব মিলিয়ে বাড়ছে রামের রাজ্যপাট। এতে অনেকেই সাম্প্রদায়িক গ-গোলের সিঁদুরে মেঘ দেখছেন।
গত বুধবার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির এক প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেন তারা তাকে জানিয়েছেন, উগ্র হিন্দ্ত্বুবাদীদের দৌরাত্মে গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের শাসন বিপন্ন। ছড়ানো হচ্ছে সাম্প্রদায়িক হিংসা। তৈরি হয়েছে সাধারণ নাগরিদের নিরাপত্তাহীনতার আবহ। সিপিআইএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি মনে করেন, সংঘ পরিবারের অঙ্গ হিসেবে বিজেপি সংবিধান সংশোধন করে হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে চাইছে।

আর্কাইভ