ঢাকা, শনিবার 4 August 2018, ২০ শ্রাবণ ১৪২৫, ২১ জিলক্বদ ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শিক্ষার্থীরাই পারবে অচলায়তন ভাঙতে

গত ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহন কোম্পানির ৩বাসের রেষারেষির সময় চাপা পড়ে ২ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। আহত হয় ১০/১২ জন। এ দুর্ঘটনা নিয়ে কথা বলবার সময় নৌপরিবহন মন্ত্রীর অনাকাক্সিক্ষত হাসির প্রতিবাদে এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে সেদিন থেকেই বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সোচ্চার মহানগরীতে। পরে নিহত দিয়া মিমের বাসায় গিয়ে নৌমন্ত্রী শোকাহত পরিবারকে সান্ত¡না এবং সেদিনের হাসির ব্যাখ্যা দেন। ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি। এরপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবার উপক্রম হয়। বিক্ষোভ যেন ক্রমাগত দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ঢাকার সীমানা পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাবার জন্য অন্য মন্ত্রীদের আহ্বান বা অনুরোধে কোনও কাজ হচ্ছে না। পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ, ধরপাকড়, হুমকিধামকি কাজে আসছে না। ঢাকার রাজপথে গাড়ি চলাচল সীমিত হয়ে পড়ছে। হন্তারক দুই বাসের রেজিস্ট্রেশনসহ রুট পার্মিট গত বুধবার বিআরটিএ বাতিল করেছে। আটক করা হয় গাড়ির মালিককে। রিমান্ডে নিয়েছে ড্রাইভারকে পুলিশ। এরপরও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরছে না। তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে প্রতিদিন তারা পথে পথে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখছে। মানববন্ধন করছে। যানবাহন চলাচলে বাধা দিচ্ছে তাদের ন্যায্য দাবিতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বৃহস্পতিবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এতে কি শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে থাকবে বলে মনে হয়?
নিরাপদ সড়কের দাবি কেবল ছাত্রছাত্রীদেরই নয়। এ দাবি সকলের। ব্যবসায়ী, শিক্ষক, অভিভাবক, মুটেমজুর সবাইকে রাস্তায় চলাচল করতে হয়। ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে কেউ নিশ্চিন্তে নিরাপদে ঘরে ফিরবেন তা আশা করা কঠিন। কে কখন কোন বাসের চাকায় চাপা পড়েন তার কোনও ঠিক নেই। ঘর থেকে বেরুলেই ভয়। জীবন হারাবার শঙ্কা। অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুভয়ে যাত্রী, পথচারি, বাসস্টপেজে অপেক্ষমান সবাই সন্ত্রস্ত। যেন প্রাণ হাতে নিয়েই ঘর থেকে বেরুতে হচ্ছে মানুষকে। সড়কে চলছে বেপরোয়া ফিটনেসবিহীন বাস-মিনিবাস। ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই অনেক চালকের। অপ্রাপ্ত বয়স্করা চালাচ্ছে গাড়ি। তাই বলা চলে, সড়ক, মহাসড়ক এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত। রাস্তায় কখন কার প্রাণবায়ু বেরোয় কোন গাড়ির চাপায় বলা মুশকিল। উল্লেখ্য, নিহত দিয়া মিমের বাবাও বাসের ড্রাইভার। ২৭ বছর ধরে তিনি ঢাকা-রাজশাহী রুটে বাস চালান। তার দ্বারা কোনও এক্সিডেন্ট ঘটেনি বলে জানান।
বিক্ষোভরত ছাত্ররা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে। লাইসেন্স ও ফিটনেসের কাগজপত্রও চেক করে তারা। জিটিভি জানায় ছাত্রদের হাতে ধরা পড়েছেন লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে ১৭ পুলিশ অফিসারও। এদের কেউকেউ কানধরে উঠবোস করে রেহাই পেয়েছেন বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের কাছ থেকে। আরও একটা মজার খবর ভাইরাল হয়েছে অনলাইনে। বাণিজ্যমন্ত্রী উল্টোপথে গাড়ি চালাতে গিয়ে ছাত্রদের হাতে ধরা খেয়ে সোজাপথে যেতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে ছাত্রছাত্রীরাই পারবে অনিয়মের অচলায়তন ভাঙতে। সবাইকে সোজা পথে চালাতে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ট্রাফিক আইন পরিবর্তনসহ দোষী চালকদের উপযুক্ত শাস্তিবিধান ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ড্রাইভারদের আটক করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক আইনমন্ত্রী নতুন ট্রাফিক আইনের খসড়া মন্ত্রীপরিষদে উপস্থাপন করবেন বলেও জানান। তবে নিহত দিয়াদের বাসায় গিয়ে নৌমন্ত্রী বলেন, তিনি সেসময় নাকি অন্য প্রসঙ্গে হাসছিলেন এবং তখনও এয়ারপোর্ট রোডের সেদিনের দুর্ঘটনার খবর জানতেন না। অথচ তিনি তখন ভারতে বাস পাহাড়ি খাদে পড়ে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৩ শিক্ষক-কর্মচারী নিহত হবার খবর উল্লেখ করছিলেন। এর মানে কি আবারও পানি ঘোলা করা? অতএব কথা বলতে গিয়ে চুলকিয়ে ঘা করবেন না কেউ। এতে ইনফেকশন হতে পারে। ইনফেকশন থেকে ক্যানসার হলে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হবার আশঙ্কা থাকে। পানি অনেক ঘোলা হয়েছে। আর নয়। সময় থাকতে নিরাপদ সড়কের দাবি নিশ্চিত করুন। দোষী ড্রাইভারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনুন। শিক্ষার্থীরা নিশ্চয়ই ক্লাসে ফিরে যাবে। পড়ালেখায় মনোনিবেশ করবে।

আর্কাইভ