|
|
১৪ হাজার ফ্লাইট বাতিল জাতিসংঘসহ অন্যান্য দফতর বন্ধ
স্যান্ডির তান্ডবে যুক্তরাষ্ট্রে পূর্বউপকুলে প্লাবিত এলাকা। দুর্দশাগ্রস্ত একজন মানুষের আহাজারি -ইন্টারনেট
সংগ্রাম ডেস্ক : প্রলয়ংকরী ঝড় স্যান্ডির তান্ডবে যুক্তরাষ্ট্রে ১৭ জন প্রাণ হারিয়েছে। নিউইয়র্ক শহরের অধিকাংশ এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ভয়াল এই ঝড়ে অর্ধশত বাড়িতে আগুন ধরে যায়। স্যান্ডির কারণে নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, পেনসিলভেনিয়া, ওয়াশিংটন, কানেকটিকাট ও বস্টন বিমান বন্দরে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত বিগত ৩ দিনে ১৪ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। ক্যারিবীয় সাগরে সৃষ্টি হওয়ার পর জ্যামাইকা, হাইতি ও কিউবার ওপর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাওয়ার পথে অন্তত ৬৭ জনের প্রাণ কেড়ে নেয় স্যান্ডি। স্যান্ডিতে প্রায় ১৪ ফুট উঁচু জলোচ্ছবাসে তলিয়ে গেছে নিউইয়র্ক শহরের নিচু এলাকা। এছাড়া জাতিসংঘ, ব্রডওয়ে থিয়েটার এবং নিউজার্সি ক্যাসিনোসমূহ বন্ধ করে দিতে হয়েছে। রয়টার্স/বিবিসি/আল জাজিরা/সিএনএন/এএফপি।
ভয়াল রূপ নিয়ে ঘণ্টায় ১২৯ কিলোমিটার বেগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি উপকূল অতিক্রম করা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় স্যান্ডির আঘাতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন।
পূর্ণিমার প্রভাবে রেকর্ড ১৪ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে গেছে নিউইয়র্ক শহরের নিচু এলাকা। ক্যাসিনোর জন্য বিখ্যাত আটলান্টিক সিটিও প্রায় ৮ ফুট পানির নিচে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ম্যানহাটনের অধিকাংশ এলাকায়। স্যান্ডির আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রে অর্ধশতাধিক বাড়িতে আগুন লেগে ভস্মিভূত হয়েছে। এসব এলাকার পৌনে ৪ লাখ অধিবাসীকে ২৪ ঘণ্টা আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হলেও ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়। নিউজার্সি, নিউইয়র্ক, মেরিল্যান্ড, পেনসিলভেনিয়া, ওয়েস্টভার্জিনিয়া ও কানেটিকাটে যে ১৭ জনের মৃত্যুর খবর পুলিশ দিয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজন মারা গেছেন ঝড়ে গাছ পড়ে। এটা ১০৪ বছরের মধ্যে ভয়াবহতম ঝড়ের ঘটনা।
স্যান্ডি এগিয়ে আসতে থাকায় গত রোববারই যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে গত সোমবারের সব কর্মসূচি বাতিল করা হয় এবং ট্রেডিং ফ্লোর বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয় নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ। অবশেষে স্থানীয় সময় সোমবার রাত ৮টার দিকে (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর ৬টা) নিউজার্সি উপকূল অতিক্রম করে এগোতে থাকে স্যান্ডি। সব মিলিয়ে অন্তত পাঁচ কোটি মানুষ এই ঝড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্যান্ডির কারণে নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, পেনসিলভেনিয়া, ওয়াশিংটন, ডেলওয়ারে, কানেকটিকাট ও বস্টন বিমানবন্দরে গত তিন দিনে ১৪ হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। গত বছরের আগস্টে হারিকেন আইরিনের প্রভাবে ৪ দিনে মোট ১৪ হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছিল।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইকিউইসিএটির প্রাথমিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, স্যান্ডির আঘাতে ক্ষতির পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। গত বছরের হারিকেন আইরিনের ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১০ বিলিয়ন ডলার। আর ২০০৫ সালে প্রলয়ঙ্করী হারিকেন ক্যাটরিনায় ক্ষতিগ্রস্তদের বীমা বাবদেই দিতে হয়েছিল ৪৫ বিলিয়ন ডলার। ক্যারিবীয় সাগরে সৃষ্টি হওয়ার পর জ্যামাইকা, হাইতি ও কিউবার ওপর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাওয়ার পথে অন্তত ৬৭ জনের প্রাণ কেড়ে নেয় স্যান্ডি। ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় ক্যারিবীয় অঞ্চলের এ তিন দেশে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টার বলছে, হ্যারিকেন স্যান্ডি স্থলভাগে উঠে এসে পোস্ট ট্রপিক্যাল ঝড়ের রূপ নিয়েছে। পাশাপাশি পশ্চিম ভার্জিনিয়া, ভার্জিনিয়া ও কেন্টাকিতে ৩ ফুট পর্যন্ত তুষারপাতের আশঙ্কা করা হয় স্যান্ডির প্রভাবে।
এদিকে আগামী ৬ নবেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও স্যান্ডি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী প্রেসিডেন্ট বরাক ওবামা এবং রিপাবলিকান দলের প্রার্থী মিট রমনি দুজনেই প্রচারণা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছেন। হোয়াইট হাউজ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন প্রেসিডেন্ট বরাক ওবামা। তিনি দুর্যোগকবলিত এলাকায় ন্যাশনাল গার্ড এবং পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুনর্বাসনের পদক্ষেপ নিতে ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট অথরিটিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
নিউইয়র্ক ভুতুড়ে শহর \ জলোচ্ছবাসে লন্ডভন্ড
এদিকে গত সোমবারের প্রলয়ঙ্করী ঝড় স্যান্ডির তান্ডবে নিউইয়র্ক শহরের অধিকাংশ এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে শহরের ঐতিহাসিক ওয়াটারফ্রন্ট, পাতাল রেলের ট্যানেলসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ম্যানহাটানের একটি হাসপাতালসহ হাজার হাজার বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে নিউইয়র্ককে মনে হচ্ছে ভুতুড়ে নগরী। যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ এই শহরে সুপারস্টর্ম স্যান্ডি আঘাত হানার কারণে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এর অধিকাংশ যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্কুল, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ব্রডওয়ে । ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবার নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
নগরের মেয়র অফিসের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ঝড়টি রেকর্ড ১৩.৮৮ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসসহ ব্যাটারি টানেলে অতিক্রম করে। ব্যাটারি পার্ক সিটির সমুদ্র তীরবর্তী বাঁধের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে রেলস্টেশন ও ব্রুকলিনসহ শহরের নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানোর জন্য ঐসব অঞ্চলের বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।
দক্ষিণ নিউ জার্সির ওপর প্রচন্ড শক্তিশালী ঝড়টি আছড়ে পড়ার পরপরই ডাউনটাউন ম্যানহাটানের বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এর পরেই নগরের বিশাল এলাকা অন্ধকারে তলিয়ে যায়। বাণের তোড়ে ভেসে গেছে বহু গাড়ি, উপড়ে পড়েছে গাছপালা। ঝড়ের তান্ডবে ম্যানহাটানের মিডিল টাউনে একটি বহুতল ভবনের ছাদে রক্ষিত ক্রেন বিকল হযে পড়লে ঐ ভবনে অবস্থিত হোটেল থেকে শতাধিক ব্যক্তিকে সরিয়ে নেয়া হয়। এছাড়া চেলসিয়ার কাছাকাছি এলাকায় একটি চারতলা ভবন আচমকা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে পড়ার খবরও পাওয়া যায়। তবে এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। এমন প্রলয়ঙ্করী ঝড়ে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও গোটা নিউইয়র্কে ঝড়ের সময় গাছ চাপা পড়ে নিহত হয়েছেন কেবল এক ব্যক্তি। সরকারি হিসেবে এখানে সর্বমোট মৃতের সংখ্যা ৫ জন বলে জানানো হয়।
এছাড়া ফায়ার আইল্যান্ড নামের একটি রিসোর্ট থেকে ১৪ জন মানুষকে উদ্ধার করে ফেরার সময় পুলিশের একটি গাড়ি প্রবল জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়ার কথা জানা গেছে।
এছাড়া, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন মেডিকেল সেন্টার থেকে প্রায় ২শ' রোগীকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
ঐ হাসপাতালের কর্মকর্তা লিসা গ্রেইনার বলেন, আমাদের টেলিফোন সংযোগও ঠিকমতো কাজ করছে না। তাই যেসব হাসপাতালে এই রোগীদের নেয়া হচ্ছে তারা তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
এদিকে, নিউইয়র্কের বেলভ্যু হাতপাতালের বেসমেন্টেও পানি উঠেছে। জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এই হাসপাতালও চলছে নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়। কতক্ষণ এভাবে চালিয়ে নেয়া যাবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় সময় সোমবার রাত ৮টার দিকে (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর ৬টা) নিউ জার্সি উপকূলের আটলান্টিক সিটির পাশ দিয়ে ঘণ্টায় ৮০ মাইল বেগে বয়ে যায় স্যান্ডি।
লন্ডভন্ড
১৪ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস আর স্যান্ডির করাল ছোবলে লন্ডভন্ড নিউইয়র্কসহ আশপাশের এলাকার প্রায় ৬০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর ফলে ভুতুড়ে অন্ধকারে ডুবে আছে পুরো এলাকা। নগরের এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে খাবি খেতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের। স্থানীয় বাসিন্দারা অস্থিরতায় সময় কাটাচ্ছেন। জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে তাদের দানবের মতো জাপটে ধরেছে অন্ধকার। বেসরকারি হিসেবে স্যান্ডির আঘাতে নিউইয়র্কসহ আশপাশের এলাকায় এ পর্যন্ত ১৭ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নবজাতকসহ রোগীদের প্রায় ৪০টি অ্যাম্বুলেন্সে করে নিরাপদ হাসপাতালে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। নিউইয়র্কের বেলেভিউ হাসপাতালের বেজমেন্টও পানিতে প্লাবিত হয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। সেখান থেকে রোগীদের নিরাপদে নিকটস্থ হাসপাতালে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনের ১৪ স্ট্রিটের থেকে নিচে ব্যাটারি পার্ক পর্যন্ত নিম্নপূর্বাঞ্চল ও নগরের মধ্যাঞ্চলের (ডাউনটাউন) ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ব্যাটারি পার্ক সিটি এলাকা কয়েক ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এছাড়া ডাউনটাউনের ৭টি সাবওয়ে টানেল (ভূগর্ভস্থ রেলপথ) স্যান্ডির আঘাতে ইস্ট রিভার থেকে উপচে পড়া জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গেছে। নদীর নিচ দিয়ে যাওয়া সুড়ঙ্গ পথ ব্রুকলিন ব্যাটারি টানেলেও পানি ঢুকে পড়েছে। প্রচন্ড ঝড়ে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে অগ্নিকান্ডের ঘটনাও ঘটেছে।
উল্লেখ্য, হারিকেন স্যান্ডির আঘাতে রেকর্ড গড়া ১৩/১৪ফুট উচ্চতায় পানির ঢেউকে ৫০ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন নিউইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রু কোমো। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে কন এডিসন কর্তৃপক্ষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এত ব্যাপক হারে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাকে নিউইয়র্কের ইতিহাসে এই প্রথম বলে উল্লেখ করেছে।

