|
|
খালেদা জিয়া-সালমান খুরশিদ বৈঠকে আলোচনা
গতকাল মঙ্গলবার দিল্লীর হায়দারাবাদ হাউসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদের সাথে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বৈঠক করেন -সংগ্রাম
স্টাফ রিপোর্টার : অতীত দূরে রেখে বাংলাদেশের বিএনপির সাথে ভারতের ক্ষমতাসীন কংগ্রেস তথা সরকারের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া ও সালমান খুরশিদ। ভারত সফরের তৃতীয় দিনে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২ টায় ঐতিহাসিক হায়দরাবাদ হাউজে বৈঠকে তারা এ বিষয়ে একমত পোষণ করেন। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন। সালমান খুরশিদ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা। সালমান খুরশিদ সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন। খালেদা জিয়া হায়দরাবাদ হাউজে এসে পৌঁছালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে অভ্যর্থনা জানান।
বৈঠককালে বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সাথে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, ভাইস-চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য খালেদা রাববানী, বিরোধী দলীয় নেতার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান উপস্থিত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক এই বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব রঞ্জন মাথাই ও যুগ্ম সচিব (বাংলাদেশ-মিয়ানমার-শ্রীলংকা ডেস্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত) হর্ষ বর্ধন সিংলাসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সালমান খুরশিদের সাথে বৈঠক শেষে খালেদা জিয়া তার সম্মানে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বৈঠকের বিষয়বস্তু নিয়ে সংবাদ ব্রিফিং করেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেছেন, এই সফর নতুন দিনের সূচনা, পেছনে নয়, আমাদের তাকাতে হবে সামনের দিকে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে জানিয়েছেন, আমরাও অতীতকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে তাকাতে চাই।
পররাষ্ট্র সচিব আরো বলেন, খালেদা জিয়ার সাথে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, সন্ত্রাসবাদ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমে হবে বলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন।
নয়াদিল্লী সরকারের আমন্ত্রণে এই সফর করছেন বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। সাধারণ নির্বাচনের এক বছর আগে ভারতে খালেদা জিয়ার এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা। অন্যদিকে ভারত বলছে, এটা বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে নয়া দিল্লীর যোগাযোগের অংশ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ভারত বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। অনেকে সফর করে গেছেন।
সালমান খুরশীদের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার বৈঠকের বিষয়বস্তু তুলে ধরে শমসের মবিন চৌধুরী জানান, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সমস্যার সমাধান, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার যোগাযোগ (কানেকটিভিটি) স্থাপন, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ সুবিধাসহ বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
শমসের মবিন চৌধুরী আরো বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিরোধী দলীয় নেতা বলেছেন, কানেকটিভিটি দুইদেশের জন্য অবশ্যই অনিবার্য। তবে এটা কেবল দুই দেশ কিংবা দক্ষিণ এশীয় নয়, দক্ষিণপূর্ব এশীয় ও দূরপ্রাচ্য পর্যন্ত সম্প্রসারণ করতে হবে। এতে এই অঞ্চলে জনগণ লাভবান হবে বলে জানিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা।
তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির সম্পর্কে শমসের মবিন জানান, বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, তিস্তানদীর পানি বন্টনের গ্রহণযোগ্য সমাধান যত দ্রুত করা যাবে, ততই দুইদেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন হবে। এ ব্যাপারে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, তিনি তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি যাতে হয়, সেজন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নেবেন। ভারত এই বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখছে। শমসের মবিন চৌধুরী জানান, সালমান খুরশীদ ভারতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন বলে এই বিষয়টি নিয়ে তার আগ্রহ রয়েছে।
সীমান্ত হত্যাকান্ডের বিষয়টিও বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে উল্লেখ করে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উদ্বেগের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, সীমান্ত হত্যাকান্ডের মতো ঘটনার শেষ টানতে হবে। এজন্য ভারত সরকার আলোচনার মাধ্যমে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথাও স্মরণ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশীদ।
প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার বৈঠকের ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকটিকে ইতিবাচক অভিহিত করে শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সাথে এই দুটি বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রাখবে বলে আমরা মনে করি।
এক প্রশ্নের জবাবে বিরোধী দলীয় নেতার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান বলেন, ভারতে খালেদা জিয়ার সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অপ্রমাণিত ও প্রমাণিত অভিযোগের তিক্ত অভিজ্ঞতায় আর ফিরে যেতে চাই না। সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই।
শিব শংকরের সাথে আলোচনা : গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টায় হোটেল তাজ প্যালেসে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে বৈঠক করেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা শিব শংকর মেনন। বিরোধীদলীয় নেতার সুইটে এই বৈঠক হয়। বিরোধী দলীয় নেতার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান জানান, শিব শংকর মেননের সাথে পৌনে এক ঘণ্টার এই বৈঠকে সন্ত্রাস দমন, বিরোধপূর্ণ সীমানা নির্ধারণ, সীমান্ত হত্যাসহ দুইদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে খালেদা জিয়ার সাথে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, সহ-সভাপতি শমসের মবিন চৌধুরী ও প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান উপস্থিত ছিলেন।
ভারত সরকারের আমন্ত্রণে এক সপ্তাহের সফরে গত রোববার নয়াদিল্লী পৌঁছান খালেদা জিয়া। সফরের প্রথম দিনে লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা বিজেপির সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। পরদিন সোমবার দুপুরে নয়াদিল্লীর ৭ নম্বর রেস কোর্স সড়কে মনমোহন সিংয়ের সরকারি বাসভবনে তার সঙ্গে বৈঠক করেন বিরোধীদলীয় নেতা। প্রধানমন্ত্রীর দেয়া এক মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেন তিনি।
এই সফরে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও কংগ্রেসপ্রধান সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গেও খালেদা জিয়ার বৈঠকের কথা রয়েছে।
আজমীরে সুফি সাধক হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) মাজার জিয়ারতও বিরোধীদলীয় নেতার কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে।
সফর শেষে আগামী ৩ নবেম্বর তিনি দেশে ফিরবেন বলে প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান জানিয়েছেন।
খালেদা জিয়া সর্বশেষ ২০০৬ সালে ভারত সফরে যান। সেবার তিনি গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে প্রতিবেশী দেশটিতে এটাই তার প্রথম সফর।

