|
|
কাদের মোল্লার মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাকে পুনরায় জেরা রোববার
শাহেদ মতিউর রহমান : ট্রাইব্যুনালে দেয়া একজন সাক্ষীর জবানবন্দির বিষয়ে এবার খোদ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্যরা প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলীকে তিরস্কারও করেছে। ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, গত ১৫ এপ্রিলের তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটরের স্বাক্ষর সম্বলিত কাজী রোজি নামের এক সাক্ষীর জবানবন্দি তাদের দেয়া হয়। অথচ গত ২৪ জুলাই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চতুর্থ সাক্ষী কাজী রোজী ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন। যা তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দি হিসেবে ব্যাক ডেটে স্বাক্ষর দিয়ে আসামী পক্ষের আইনজীবীদের দেয়া হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনাল-২ এ' তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক খান আসামী পক্ষের জেরার জবাবে বলেছেন, সাংবাদিক আবু তালেব হত্যাকান্ডের ঘটনায় সাক্ষী মোমেনা বেগমের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। উল্লেখ্য এই মামলার অন্যতম সাক্ষী এই মোমেনা বেগম। কেননা ইতোপূর্বে এই ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম সাক্ষ্য দিতে এসে বলেছিলেন, তার মা বোনকে বিহারীরা অমানুষিক নির্যাতন করেছিল এবং তার বাবাকেও বিহারীরা হত্যা করে তার লাশ মিরপুরের জল্লাদখানায় ফেলে দিয়েছিল যার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিলেন এই মোমেনা বেগম নিজে। কিন্তু গতকাল এই মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক খান ডিফেন্স পক্ষের জেরার জবাবে স্পষ্ট বলেছেন এই মোমেনা বেগম আবু তালেব হত্যাকান্ডের সাক্ষী। অন্য কোন ঘটনায় তাকে সাক্ষী করা হয়নি।
এদিকে সাক্ষী কবি কাজী রোজির আদালতে দেয়া জবানবন্দি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দি হিসেবে ডিফেন্স কাউন্সিলকে দেয়ায় প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলীকে তিরস্কার করেছে ট্রাইব্যুনাল। ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, গত ১৫ এপ্রিলের তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটরের স্বাক্ষর সম্বলিত এই জবানবন্দি তাদের দেয়া হয়। অথচ গত ২৪ জুলাই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চতুর্থ সাক্ষী কাজী রোজী ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন। যা তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দি হিসেবে ব্যাক ডেটে স্বাক্ষর দিয়ে আসামী পক্ষের আইনজীবীদের দেয়া হয়। প্রসিকিউটরের এই অবৈধ কাজটিকে অনেকটা জালিয়াতির সাথে তুলনা করেছেন ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবীরা।
গতকাল এ বিষয়ের নথিপত্র ট্রাইব্যুনাল পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার পর প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলীকে তিরস্কার করেন এবং এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলেন। আদালত প্রসিকিউটরকে বলেন, কোর্টের জবানবন্দি কিভাবে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দি বলে চালিয়ে দিলেন? ট্রাইব্যুনাল আরো বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দি হিসেবে যে কপি দেয়া হয়েছে তার প্রত্যেকটি অক্ষর কোর্টে দেয়া জবানবন্দির সাথে মিলে গেছে। জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, ভুল হয়ে গেছে। শেষে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এটা ভুল, ডেলিবারেটলি করেনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান এ টি এম ফজলে কবীরের অনুপস্থিতিতেই আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। ট্রাইব্যুনাল- ২ এর অপর দুই সদস্য ওবাইদুল হাসান ও শাহিনুর ইসলাম জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
জেরাতে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সাংবাদিক আবু তালেব এর হত্যাকান্ডের ঘটনায় সাক্ষী হিসেবেই তদন্ত কালে মোমেনা বেগমের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। গতকাল ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট আবদুস সোবহান তরফদার তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন। তাকে সহায়তা করেন এডভোকেট ইকরামুল হক, এডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, এডভোকেট সাজ্জাদ হোসাইন প্রমুখ। গতকাল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তাকে আগামী রোববার আধা ঘণ্টার মধ্যে জেরা শেষ করতে ডিফেন্স পক্ষকে সময় বেঁধে দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল জেরার জবাবে আবদুস সোবহান তরফদার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চান আপনি কি কবি কাজী রোজীর জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন? জবাবে আবদুর রাজ্জাক খান বলেন, হ্যাঁ। তখন আইনজীবী ট্রাইব্যুনালকে বলেন সাক্ষী কবি কাজী রোজীর বিষয়ে আমাদের দুই ধরনের জবানবন্দি দেয়া হয়েছে। তিনি দুটি কপি ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেন। ট্রাইব্যুনাল দুই ধরণের জবানবন্দিতে আদালতে দেয়া জবানবন্দিও রয়েছে তা নিশ্চিত হয়ে প্রসিকিউট মোহাম্মদ আলীকে তলব করেন। ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউটরের কাছে জানতে চান, কাজী রোজীর এই জবানবন্দি ডিফেন্সকে দিয়েছেন কি না। জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, কিভাবে হল বলতে পারছি না। ট্রাইব্যুনাল আবার প্রশ্ন করেন, এগুলো দেয়ার পর কিভাবে তদন্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর দিয়ে সাবমিট করেছেন?
এদিকে গতকাল অপর এক মামলায় মাওলানা আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও চার্জ গঠনের এই তারিখ আগামী ৪ নবেম্বর রোববার পুন:নির্ধারণ করা হয়েছে।
গতকালের জেরার উল্লেখযোগ্য অংশ
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধে শহীদ নবীউল্লাহ মোল্লার পরিবারের কাউকে আপনি জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন কি?
উত্তর : না, করি নাই।
প্রশ্ন : গয়েজ উদ্দিন মোল্লাকে আপনি জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন কি?
উত্তর : হ্যাঁ করেছি।
প্রশ্ন : গয়েজ উদ্দিন মোল্লার দ্বারা আলুবদি গ্রামের অসংখ্য লাশ কূপে ফেলা হয়েছিল বলে কোন তথ্য পেয়েছেন কী? (এ প্রশ্নটি গ্রহণ করেনি ট্রাইব্যুনাল)
প্রশ্ন : আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে গয়েজউদ্দিনকে কোর্টে সাক্ষী হিসেবে আনেননি।
উত্তর : ইহা সত্য নয়।
প্রশ্ন : সাক্ষী সৈয়দ আবদুল কাইয়ুম তার জবানবন্দিতে বলেছেন, ৭০ সালে নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে শফিউদ্দিন, নইম খান ও জনৈক মোল্লা কাজ করেছেন।
উত্তর : আমার কাছে দেয়া জবানবন্দিতে একথা বলেননি।
প্রশ্ন : দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে কাজ করেছেন যে জনৈক মোল্লা সেই মোল্লা আসামী কাদের মোল্লা ছিলেন কী?
উত্তর : মোল্লার পুরো নাম আমি পাইনি তদন্তকারেও এই মোল্লার পুরো নাম কেউ বলতে পারেননি।
প্রশ্ন : পাশের বাড়ির মোল্লা নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নিয়েছিল।
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আসামী কাদের মোল্লাকে এই মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে।
উত্তর : ইহা সত্য নয়।
প্রশ্ন : আপনি মিরপুরে তদন্তকালে কাদের মোল্লা নামে একাধিক ব্যক্তি পেয়েছেন?
উত্তর : না, আসামী ব্যতিত আর কোন ব্যক্তি পাইনি।
প্রশ্ন : অপর তদন্ত কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম তার পদবী কী?
উত্তর : তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবেই কাজ করছেন।
প্রশ্ন : পুলিশে থাকাকালে মনোয়ারা বেগম আপনার জুনিয়র নাকি সিনিয়র?
উত্তর : আমরা তখন সবাই তদন্ত কর্মকর্তা। এখানে জুনিয়র বা সিনিয়র কেউ নয়।
প্রশ্ন : মোমেনা বেগমকে কোন ঘটনার সাক্ষী হিসেবে মনোনীত করেছেন?
উত্তর : খন্দকার আবু তালেবকে হত্যাকান্ড ঘটনায়।
প্রশ্ন : মামলার তদন্তকালে অনেক বই স্ট্যাডি করেছেন?
উত্তর : হ্যাঁ। অনেক বই পড়েছি।
প্রশ্ন : কবি কাজী রোজি লিখিত বইটি পড়েছেন কী?
উত্তর : না। পড়িনি।
প্রশ্ন : কবি কাজী রোজি ১৯৭১ সালে কোথায় বসবাস করতেন?
উত্তর : মিরপুরে ৬ নং সেক্টরের সি ব্লকে থাকতেন।
প্রশ্ন : কবি মেহেরুন্নেসা কোথায় থাকতেন?
উত্তর : মিরপুর ৬ নং সেকশনের বি ব্লকে থাকতেন।
প্রশ্ন : কবি কাজী রোজি মিরপুরে ৭১ সালে গঠিত এ্যাকশন কমিটির সভাপতি ছিলেন আর কবি মেহেরুন্নেসা ছিলেন সদস্য।
উত্তর : হ্যাঁ সত্য।
প্রশ্ন : কবি কাজী রোজি লিখিত বইটিতে লেখা আছে কবি মেহেরুন্নেসা কিভাবে নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু বইটি পড়েও আপনি না পড়ার কথা বলেছেন?
উত্তর : সত্য নয়।
প্রশ্ন : আবু তালেব সাহেবের গাড়িচালক নিজামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন?
উত্তর : না। তিনি পাকিস্তানে চলে গেছেন।
প্রশ্ন : ইত্তেফাক পত্রিকা অফিসের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হালিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন?
উত্তর : না। তাকেও পাওয়া যায়নি।

