Quantcast
ঢাকা, সোমবার 19 November 2012, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪১৯, ৪ মহররম ১৪৩৪ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৫৯৫৩ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

তিন শ্রেণীর বিচারকদের মধ্যে দু'শ্রেণীই সরাসরি জাহান্নামে যাবে

প্রধানমন্ত্রী বিচারকে দ্রুততর করার কথা বলার পরে আর বিচার থাকে কিভাবে -মাওলানা সাঈদী

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর বিশ্ববরেণ্য আলেমে দ্বীন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে পাহাড়সম মিথ্যাচার বলে অভিহিত করেছেন। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে তাকে বক্তব্য রাখতে না দিয়ে ট্রাইব্যুনাল তাকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন এমন অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই বলেছেন, বিচারকে দ্রুততর করা হবে। তাহলে বিচার থাকলো কোথায়? স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অস্তিত্ব কোথায়? তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ অথচ আমার বক্তব্য না শুনে যদি আপনি এক পক্ষের মিথ্যা বক্তব্য শুনে কোনো রায় দেন আমার বিপক্ষে সেটা ঠিক হবে না। তিনি কুরআন-হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তিন শ্রেণীর বিচারকের মধ্যে দু'শ্রেণী সরাসরি জাহান্নামে যাবে। এর মধ্যে একশ্রেণী আছে যারা এক পক্ষের কথা শুনে রায় দেবে, আরেক শ্রেণী হলো যারা না বুঝে রায় দেবেন, আরেক শ্রেণীর বিচারক সরাসরি জান্নাতে যাবেন যারা ন্যয়বিচার নিশ্চিত করবেন কোনো দুষ্টু লোকের কথা শুনে রায় দেবেন না। তিনি বিচারকদের কাছে নিবেদন করেন যে, আপনারা এখন কোন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হতে চান সেটা আপনারাই ঠিক করুন।

মাওলানা সাঈদী বলেন, মাননীয় আদালত, আমাকে ৪০ বছর আগে সংঘটিত কিছু অপরাধের ব্যাপারে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এসব অপরাধের সাথে কষ্মিনকালেও আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। পিরোজপুরের লাখো মানুষ আমার এই কথার সাক্ষী। আমি ইতোপূর্বেও আপনাদের সামনে কথাগুলো বলার চেষ্টা করেছি। অভিযুক্ত হিসেবে অভিযোগের জবাব দেয়াটা ছিল আমার সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু আমাকে আমার এই অধিকার থেকে আপনারা বঞ্চিত করেছেন। আমাকে কথা বলতে না দিয়েই, অভিযোগের ব্যাপারে আমার জবাব না শুনেই আপনারা এই বিচার চালিয়ে যাচ্ছেন। অথচ, এই ট্রাইব্যুনালেই দিনের পর দিন কিছু সুবিধাভোগী সাক্ষী, এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ৯ দিন ধরে একজন বিজ্ঞ প্রসিকিউটরের আরগুমেন্ট আপনি শুনেছেন। শুধু আমার কথাই আপনারা শুনতে চাচ্ছেন না, কিন্তু আপনারা আমারই বিচারে ব্যস্ত আছেন। আজকে আমার পক্ষের আরগুমেন্ট শুরু হওয়ার দিন ধার্য আছে। এই ট্রাইব্যুনালে আমি আর কোনো কথা বলার সুযোগ পাবো কিনা তা আমার জানা নেই।

তিনি বলেন, মাননীয় আদালত, ইতোপূর্বে এই তথাকথিত মামলার আইও এবং একজন বিজ্ঞ প্রসিকিউটর আমার ব্যাপারে নানাবিধ অপরাধের অভিযোগ তুলেছেন। তারা একই অসত্য কথা বারবার বলছেন, আগেও বলেছেন এখনো বলছেন। আমি কুরআনে কারীমের সূরা বাকারার ৪২ নং আয়াতটি এখানে উল্লেখ করতে চাই। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন..... এ পর্যায়ে চেয়ারম্যান, প্লিজ, প্লিজ সাঈদী সাহেব, শুনানোর দরকার নাই, এইগুলা আমরা শুনেছি আগে।

সাঈদী বলেন : আপনি কুরআনে কারীমের আয়াত কেন শুনবেন না?

চেয়ারম্যান : এখন বইলেন না, পরে শুনবো, এগুলা আগেও শুনেছি।

সাঈদী বলেন, কুরআনে কারীমে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, (আরবী) ‘‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার পোশাক দিয়ে ঢেকে দিও না।’’ বিজ্ঞ প্রসিকিউটর যে কথাগুলো এখানে বলেছেন, যে কথাগুলোর সরাসরি উনার কোনো জ্ঞান নাই, নিজে দেখেন নাই, নিজে শুনেনও নাই। তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে এসব অসত্য বক্তব্য গ্রহণ করেছেন। এ ব্যাপারে সূরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, (আরবী) ‘‘যে ব্যাপারে তোমার সরাসরি কোনো জ্ঞান নাই, তুমি দেখ নাই সেই ব্যাপারে তুমি বলতে যেও না।’’ একটি হাদিসে সাক্ষী সম্পর্কে বলা হয়েছে, (আরবী) ‘‘হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) বলেন, আমি নবী করীম (সাঃ)কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি এমন এক মুসলমানের বিরুদ্ধে এমন সাক্ষ্য প্রদান করলো যে অন্যায় সে করেনি, সে সাক্ষ্য প্রদানকারী ব্যক্তি নিজেই নিজের ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নিলো।

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বলেন, মাননীয় আদালত, সূরা হুজরাতে আল্লাহ তায়ালা কি বলেছেন দেখেন...., এ পর্যায়ে চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিম আবারো সাঈদীকে থামার জন্য বললে সাঈদী বলেন, চেয়ারম্যান সাহেব আপনি শোনেন মেহেরবানী করে। সূরা হুজরাতের ৬ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, (আরবী) ‘‘হে ঈমানদার ব্যক্তিরা যদি কোনো পাপাচারী, দুষ্ট প্রকৃতির লোক তোমাদের কাছে কোনো তথ্য নিয়ে আসে, তবে তোমরা তার সত্যতা পরখ করে দেখবে। (কখনো যেনো এমন না হয়) যে, না জেনে তোমরা কোনো একটি সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেললে এবং এর পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে তোমাদেরকেই অনুতপ্ত হতে হলো।’’ মহান আল্লাহ তায়ালা সূরা মায়েদার ৮ নং আয়াতে পুনরায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, (আরবী) ‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা সত্যের ওপর স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত ও ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাও। কোনো দলের শত্রুতা তোমাদেরকে যেনো এমন উত্তেজিত না করে দেয়, যার কারণে তোমরা যেন ইনসাফ (তথা ন্যায়বিচার) থেকে সরে না যাও।’’

তিনি বলেন, মাননীয় আদালত, আমি আমার কথাগুলো বলতে চেয়েছিলাম আপনার কাছে। বিচারকদের অভিযুক্তের কথা শুনতে হয়। আপনি হজ্জ করে এসেছেন, আপনাদেরকে আমি ঈমানদার ব্যক্তি বলে বিশ্বাস করতে চাই। আপনি একদিন বলেছিলেন যে, আমি ফজরের নামায পড়ে অমুক পত্রিকাটি পড়ি, আমি পত্রিকাটির নাম নিলাম না। আবার একদিন এই ট্রাইব্যুনালে আপনি বলেছেন, আল্লাহ আমাকে অনেক বড় দায়িত্ব দিয়েছেন, এ দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হবে। সে প্রসঙ্গে নবী কারীম (সাঃ) কি বলেছেন শুনেন, (আরবী) ‘‘হযরত আলী (রাঃ) বলেন, নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘‘যদি দু'টি পক্ষ কোনো মোকদ্দমা তোমাদের কাছে নিয়ে আসে, তখন দ্বিতীয় ব্যক্তির অর্থাৎ অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য শ্রবণ না করে অভিযোগকারীর অনুকুল কোন রায় দিবে না।’’ হযরত আলী (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ)-এর এই নির্দেশ আমি সারাজীবন পালন করেছি। (আবু দাউদ শরীফ, হাদিস নং- ৩৫৮২। তিরমিযি শরীফ, হাদিস নং- ১৩৩১) সুতরাং, আপনি বিচারক আপনি বিচার করবেন কিভাবে? একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে হাজার হাজার অভিযোগ আসলো আর অভিযুক্তের কাছ থেকে যদি তার কোনো কথা না শুনেন, জিজ্ঞাসাবাদ না করেন, তাহলে আপনি সঠিক বিচার কিভাবে করবেন!!  আর যেভাবে আপনি ত্বরান্বিত করছেন তাতে তো জাতি এটা ভাবতেই পারে যে, আগে তো সাধারণ মন্ত্রীরা বলতো, আগে তো বুদ্ধিজীবীরা বলতো এখন তো স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলছেন বিচারকে আরো দ্রুততর করা হবে। বিচার তাহলে কোথায়? স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অস্তিত্ব তাহলে রইলো কোথায়? এজন্য আমি আপনাকে অনুরোধ করবো আপনি আমাকে রসূলের বিশুদ্ধ এই হাদিস অনুযায়ী আমার কথা আপনার শোনা উচিত। আমি অভিযুক্ত; আমাকে বলা হয়েছে, আমি পনের বছর পালিয়ে ছিলাম। আমি কোথায় ছিলাম? আমি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধচলাকালীন সময়ে দীর্ঘ আড়াই মাস পর্যন্ত যশোরে রওশনের বাড়িতে ছিলাম। সেই যশোরে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা রওশনের কাছ থেকে তার কোনো সাক্ষ্য গ্রহণ করেন নাই, তাকে সাক্ষী বানান নাই। তাকে সাক্ষী করা হয় নাই কারণ মিথ্যা বলতে সে রাজী হয় নাই। সেখানে আওয়ামী লীগের সভাপতি-সেক্রেটারিকে সাক্ষী করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, আমি ত্রিশ হাজার মানুষকে হত্যা করেছি, আমি পিরোজপুরে ঘর বাড়ি ভেঙ্গেছি, নিয়মিত ধর্ষণ করেছি। এই কাজটা যে লোকটা করে সেই লোককে সেই এলাকার মুসলমানরা তার পিছনে নামায পড়ে কি করে? তাকে ভোট দেয় কি করে? আমি পিরোজপুরের এমন কোনো মসজিদ নাই, যে মসজিদে আমাকে দিয়ে ইমামতি করানো হয় নাই। এসব কথা যদি আমার কাছ থেকে না শুনেন, তাহলে আপনারা সুবিচার করবেন কিভাবে?

আপনি বিচারপতি। আপনার মানবিক সত্তার কাছে আমার দাবি, আপনার মুখের কথাই আইন। আপনাদেরকে আল্লাহ তায়ালা অনেক মর্যাদা দিয়েছেন। যে ব্যক্তি আজকের প্রধানমন্ত্রী, অসম্ভব নয় তিনি আজকের এই কাঠগড়ায় আপনার সামনে এসে দাঁড়াবেন। আজকে যিনি প্রেসিডেন্ট, অসম্ভব নয় তিনি একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে এসে আসামীর বেশে দাঁড়াবেন। আপনাদেরকে এই ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন। এখন আপনি যদি আমার বক্তব্য না শুনেন, তাহলে আমি আজকের মতো শেষ হাদিসটি শুনাই আপনাদেরকে। বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ আবু দাউদ ও ইবনু মাজাহ শরীফে এই হাদিসটি বর্ণনা করা হয়েছে। নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, (আরবী) ‘‘বিচারক ৩ প্রকার হয়ে থাকে। তন্মধ্যে শুধুমাত্র এক শ্রেণীর বিচারক সরাসরি জান্নাত লাভ করবে। আর বাকি দু'শ্রেণী সরাসরি যাবে জাহান্নামে। যে বিচারক জান্নাতে যাবে সে এমন ব্যক্তি, যে প্রকৃত সত্যকে বুঝতে পেরেছে, অতঃপর সে অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করেছে। দ্বিতীয় সেই বিচারক, যে প্রকৃত সত্য জানতে বা বুঝতে পেরেও রায় দেয়ার ব্যাপারে অবিচার ও জুলুম করেছে, সে জাহান্নামে যাবে। আর তৃতীয় সেই বিচারক, যে অজ্ঞতাবশত ফয়সালা করেছে, সেও জাহান্নামে যাবে।

হাদিস বিশারদগণ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, উপরোক্ত হাদিস অনুযায়ী বিচারকদের আসন যেনো পুলসিরাতের ওপর স্থাপন করা, যার নিচে জাহান্নামের জলন্ত অগ্নিকুন্ড আর সম্মুখপানে জান্নাত লাভের অফুরন্ত নেয়ামতের হাতছানী। এখন বিচারকবৃন্দ সুবিচার অথবা জুলুম করার মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রকৃত গন্তব্য বেছে নিতে পারেন। এখন আপনারা ডিসিশন নিতে পারেন কোন দিকে আপনারা যাবেন। জুলুমের মাধ্যমে এটাকে শেষ করবেন, না আপনি জান্নাতের পথ বেছে নিবেন। আমার কথা বলার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে, আমি আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলাম।

আইন ও বিচারের নামে অনিয়মের সব কিছুই ঘটেছে এই পবিত্র আদালত অঙ্গনে। তারপরও আমি সুবিচার প্রত্যাশায় আপনাদের ন্যায়পরায়ণতা ও হক বিচারিক সিদ্ধান্তের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। একই সাথে মহান আল্লাহ রাববুল আলামীনের ফয়সালার প্রতীক্ষায় আছি। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘‘হে নবী আপনি বলুন! সত্য এসে গেছে এবং মিথ্যা (চিরতরে) বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবশ্যই মিথ্যাকে বিলুপ্ত হতেই হবে।’’

মাননীয় আদালত আপনাদেরকে ধন্যবাদ।