Quantcast
ঢাকা, শুক্রবার 9 December 2011, ২৫ অগ্রহাহণ ১৪১৮, ১৩ মুহাররম ১৪৩৩
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ১৫১ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » সংগ্রাম সাহিত্য

ছায়ামূর্তি

মোহাম্মদ অয়েজুল হক : সকালটা ভালো কাটবে ভেবেছিল জুলেখা। সূর্যটা তো সুন্দরই ছিল। কি নীল আকাশ! সুন্দর দিন হলেই যে জীবনের সবকিছু সুন্দর হবে এমন কোন কথা নেই। সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে কি কান্ডটাই না ঘটলো। মারুফ চলে যাবার পর এখন নিজেকে কেমন দোষী মনে হচ্ছে। ওর এতো রাগ করা উচিত হয়নি। মারুফের সাথে ওভাবে চিৎকার দিয়ে কথা বলা ঠিক হয়নি।

‘ও আফা। জুলেখা আফা আছেন নাকি?' দরজায় কাজের বুয়া। ইদানিং মহিলাটা অনেক দেরী করে আসছে। আসার কথা ন'টায় হলেও কোনদিন সাড়ে দশটার আগে আসে না। কয়েকদিন হলো এগারটা বাজাচ্ছে। এরপর কি করবে কে জানে! বিকালের দিকে আসবে। এসে হাত পা ছড়িয়ে বসবে। জুলেখাকে বলবে, আফা এককাপ চা বানান তো খাই। খুব ঘুম পাচ্ছে। নিজের মনে হাসে জুলেখা। আবার দরজায় খট খট শব্দ হয়। ও আফা, আফা। কাজের বুয়া ডাকে। তার ডাকে কিছুটা রুক্ষতা খুব ঘুম পাচ্ছে। নিজের মনে হাসে জুলেখা। আবার দরজায় খট খট শব্দ হয়। ও আফা, আফা। কাজের বুয়া ডাকে। তার ডাকে কিছুটা রুক্ষতা ছড়িয়ে পড়ছে। দ্বিতীয় বারের ডাক। তৃতীয় বার কিভাবে ডাকবে কে জানে! চিৎকার করতে পারে। জুলেখা উঠে গিয়ে দরজা খোলে।

‘ঘুমাইছিলেন নাকি আফা?' জুলেখাকে দেখেই প্রশ্ন করে কাজের মেয়েটা। ওর নাম হাসিনা। বিশ বছর বয়স হবে। পাঁচ বছর আগে বিয়ে হয়েছিল এক রিকশা চালকের সাথে। দু'বছর সংসার করার পর ছেলেটা ওকে ফেলে কোথায় যেন উধাও হয়েছে। একটা ছোট বাচ্চা আছে হাসিনার। বাচ্চাটা ভারী সুন্দর। হাসিনা কাজের সময় সাথে করে নিয়ে আসে।

- না, বসে ছিলাম। হাসিনার কথার জবাব দেয় জুলেখা।

- দরজা খুলতে এতো দেরী করলেন যে?

জুলেখার রাগ হয়। ওকে কৈফিয়ত দেবে কেন সে। ওর মুখ জড়িয়ে থাপ্পড় মারবে একটা? পরিস্থিতি ভাল হলে মারা যেত। এখন পরিস্থিতি খুব খারাপ। কাজের বুয়ারা পর্যন্ত মানুষ খুন করছে। ভাবলে জুলেখার গা শিউরে ওঠে। ঢাকাতেও একা। যদিও কয়েক বছর থাকে কিন্তু তেমন কারও সাথে জানাশোনা নেই। নিচে দারোয়ান রহিম সাহেবকে শুধু জানে। লোকটা ভাল।

জুলেখাকে চুপ থাকতে দেখে হাসিনা কথা বলে আবার, আফা আফনের কি মন খারাপ?

- না না মন ভাল আছে। জুলেখা হাসতে চেষ্টা করে।

হাসিনা আর কিছু বলেনা। মুচকি হেসে চলে যায়। ঘণ্টা খানিক কাজ করবে মেয়েটা। ঘর মুছবে, থালা বাটি ধোবে। মাঝে মাঝে কাপড়ও ধোয়। মাসে দু'একদিন। হাসিনা চলে যেতেই নিজের ঘরে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। বেশ ক্লান্ত লাগছে। শুয়ে শুয়ে মারুফের কথা ভাবতে ইচ্ছা করে। বিয়ের দু'বছর আগে মারুফের সাথে পরিচয়। একটা বেবীট্যাক্সিতে করে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছিল। এইচএসসি পরীক্ষা। জুলেখার পাশের সিটটা খালি ছিল। মাঝপথে একজন যুবক হাত উঁচু করে ট্যাক্সি থামায়। দেখতে মন্দ না। লম্বা মুখ। হালকা সাদা গায়ের রং। চুল গুলো ঘন আর মার্জিতভাবে ছাঁটা। ছেলেটা জুলেখার পাশে এসে বসে। বড় হবার পর থেকে বোরখা পরে জুলেখা। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া তেমন একটা বাইরে বের হয়নি কোনদিন। কারো সাথে ঢং করে কথা বলা, প্রেম করা আর কাউকে নিয়ে স্বপ্ন দেখারও অভ্যাস ছিল না তার। ছেলেটাকে দেখে গুটিশুটি মেরে একপাশে সরে বসে। প্রায় বিশ মিনিট বসে থাকার পর জুলেখার নেমে যাবার সময় হয়। নেমে ভাড়া মিটিয়ে সামনে হাটতেই পেছন থেকে মিষ্টি কণ্ঠে কেউ ডাকে, ম্যাডাম।

জুলেখা ফিরে তাকায়। সেই ছেলেটা। মুচকি হাসছে। ‘আপনার নামটা বলবেন?'

‘কেন!' জুলেখার রাগ হয়। ইদানিং পুরুষ মানুষগুলো কেমন যেন নির্লজ্জের মতো আচরণ করছে। একটা মেয়ে দেখলেই হয়। খাতির করতে চেষ্টা করবে। প্রাণপণ চেষ্টা করবে।

‘আপনি রাগ করছেন ম্যাডাম?'

‘হ্যা রাগ করছি। মেয়ে মানুষ দেখলেই কথা বলতে ইচ্ছা হয় তাইনা?

ছেলেটা আবার হাসে। হাসিটা খুব সুন্দর। জুলেখার ভাল লাগে।

‘শুনুন, আপনার একটা জিনিস আমার ভাল লেগেছে। আমি এখানে নামতাম না। শুধু আপনার জন্য নেমেছি। ' একদমে কথা গুলো বলে যু্বক ছেলেটা।

‘আপনাকে নামতে বলেছে কে?'

‘আপনার আদর্শ আমাকে টেনে নামিয়েছে।'

‘দেখুন আমি খুব খারাপ। যাই।'

কথা শেষ করে জুলেখা সামনে হাঁটতে থাকে। ছেলেটা পিছ পিছ আসে। ম্যাডাম, ম্যাডাম একটু শুনুন। জুলেখা দাঁড়ায় না। হেঁটে চলে যায়। পরীক্ষার সময় ওকে মনে পড়ছিল। ওভাবে না এসে ওর কথা একটু শুনতো। কি বলতে চায় মানুষটা। ভাবতে ভাবতে ওর মন খারাপ হয়। বান্ধবী সাবিহার সাথে পরীক্ষা শেষে গল্প করতে করতে বেরোচ্ছিল। প্রধান ফটক পেরোতেই জুলেখার চোখ ছানাবড়া। সে দাঁড়িয়ে আছে। জুলেখা পাশ কাটিয়ে যেতেই আবার ওর পিছ পিছ হাটা শুরু করে। সাবিহা ফিসফিস করে বলে, কে?

‘জানি না। ' সংক্ষেপে জবাব দেয় জুলেখা। ওর কথা শেষ না হতেই সামনে বাধ সাধে যুবক। ‘দাঁড়ান, একটু কথা শুনুন।'

‘আপনি যে আুদর্শের কারণে ট্যাক্সির মধ্যে গুটিশুটি মেরে বসলেন, যে আর্দশের কারণে আপনি বোরখা পরেন আমি সেই আদর্শকে সম্মান করি, ভালোবাসি।

‘বেশ আমি আপনার জন্য কি করতে পারি বলুন?' কথা বলে জুলেখা।

সাবিহা অবাক হয়ে শোনে। কিছু বোঝে না।

‘আপনার ঠিকানাটা দিন। দেবেন?'

সাবিহাকে দিয়ে ঠিকানাটা লেখায় জুলেখা। সাবিহাও নরম মেয়ে। কাঁপা কাঁপা হাতে ঠিকানা লেখে। ঠিকানা দিয়ে ওরা তাড়াতাড়ি বিদায় নেয়। কয়েকদিন বাদে জুলেখার আর তার কথা মনে থাকেনা।

পরীক্ষা শেষ হবার কয়েকদিন পরই ভাবীর মুখে শোনে তার বিয়ের কথা হচ্ছে। বিয়ে হবে জুলেখার। শুক্রবার দিন শেষে জুলেখাকে দেখতে আসে। আকাশি রংয়ের একটা সেলোয়ার কামিজ, একটা বড় ওড়না গায়ে চাপিয়ে জুলেখা কাঁপতে কাঁপতে যায়। কি এক ভয় তাকে গ্রাস করে। ওদের ড্রয়িং রুমে পাঁচ জন মানুষ। দু'জন পুরুষ আর তিনজন মহিলা। জুলেখা কারও দিকে তাকায় না। ওর বড় ভাইয়া পাশে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ শুনশান নিরুতা। নিরুতা ভেঙ্গে কথা বলে একজন যুবক। ‘কি নাম আপনার?'

জুলেখা কথা বলেনা। কথা বলতে যেন ভুলে গেছে সে। ছেলেটা হাসে। আবার বলে,‘ বলুন কি নাম আপনার?'

‘জুলেখা।'

‘জানেন পবিত্র কোরআনে একজন নারীর গল্প বলেছেন আমাদের মালিক, তার নাম জুলেখা।

‘জানি।' মাথা নিচু করে জবাব দেয় জুলেখা।

একজন মহিলা সোফা থেকে নেমে আসেন। জুলেখার নিচু মাথা উঁচু করে ধরেন। একটা অস্পষ্ট উক্তি তার মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, বাহ্ কি সুন্দর তোমার সৃষ্টি প্রভূ। জুলেখার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেন, তুমি আমার মা হবে?

জুলেখা কিছু বলেনা।

জুলেখাকে দেখে যাবার পর এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের দিন স্বামীর সাথে প্রথম সাক্ষাতে খুউব অবাক হয় জুলেখা। ওর স্বামী সেই ছেলেটা। মারুফ। বেবী ট্যাক্সিতে যার সাথে প্রথম পরিচয়। অবাক হয়ে বলেছিল, আপনি!

‘হ্যা জুলেখা। তোমার আদর্শ আমাকে তোমার থেকে সরতে দেয়নি। আমার মালিকও আমাকে সাহায্য করেছেন।'

হাসিনা কাজ শেষ করে এসে দেখে জুলেখা ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে ডাকতে ইচ্ছা করেনা হাসিনার। তার হাতে অনেক কাজ। ঘুম থেকে জাগালেই দেখা যাবে একটা হুকুম। বলবে, হাসিনা আজ এই কাজটা একটু করে দাও। তখন আরেক বিপদ। মুখের উপর জুলেখাকে না বলতে পারবে না। তার চেয়ে ঘুমিয়েই থাক না। দরজা টেনে দিয়ে হাসিনা নিরবে বেরিয়ে যায়। জুলেখার যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন দুপুর। এতো সময় কখনো ঘুমায় না ও। দিনের বেলা এমনিতেই ঘুমানো অভ্যাস নেই। আজ খুব ক্লান্ত লাগছে। ঘুম থেকে উঠে রান্না ঘরে যায়। হাসিনা সব কিছু রেডি করে রেখে গেছে। কি রান্না করবে আজ! মারুফের সবচেয়ে পছন্দের খাবারটা রান্না করবে। বিরিয়ানী আর গোশতের চপ। মারুফের রাগ ভাঙ্গাতে এক মিনিটও সময় লাগবে না জুলেখার। ও জানে। মারুফ কোনদিন ওর ওপর রাগ করে থাকতে পারবে না। কিভাবে থাকবে, ও যখন হাত ধরে বলবে, মারুফ আমাকে মাফ করো। একটা ভুল হয়ে গেছে মাফ করবে না? মারুফ ওর দিকে মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকাবে। মুচকি হাসবে।

সকাল বেলা জুলেখা রান্না করছে। মারুফ এসেই বলে, ‘এতো দেরী করো না। এখন কতো বাজে?'

‘কেন?'

‘আটটায় আমার অফিস। তোমাকে কতোদিন বলেছি একটু সকাল করে রান্না শুরু করবে। '

‘দেরী হলে যাও হোটেল থেকে খেয়ে নাও।'

মারুফ জুলেখার কাছ থেকে এমন কথা প্রত্যাশা করেনি। রেগে যায় মুহূর্তেই। ‘হোটেল থেকে খাব মানে।'

‘কতো হোটেল আছেনা আটটার আগে রান্না হয়ে যায়।'

মারুফ আর একটা কথাও বলেনা। চুপ করে বেরিয়ে যায়। ও কি জানে জুলেখা তাকে কতো ভালোবাসে। সত্যিই চলে গেল মারুফ! অভিমান ভাঙ্গানোর সময়ও দিলনা।

আকাশে মেঘ জমা হয়েছে। রাতের আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি। মাঝে মাঝেই শব্দ করে ডেকে উঠছে। দোতালার জানালা ধরে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে জুলেখা। একা। এতো রাত পর্যন্ত কোনদিন দেরী করেনা মারুফ। খুব বেশি কাজ থাকলেও রাত আটটা। ওর মোবাইলটা বন্ধ। বিকালের দিকে ফোন করেছিল অফিসে। কে যেন ফোন ধরে। ‘হ্যালো।'

‘কাকে চাই?'

‘আমি মারুফের স্ত্রী, ওনাকে দিন তো।'

‘ও ভাবী, ভাল আছেন?'

জুলেখার কষ্ট হয়। ‘মারুফকে দিন।'

‘তিনি তো তিনটার সময় একটা লোকের সাথে বেরিয়ে গেছেন।'

‘তিনটায় বেরিয়েছে! আচ্ছা কোথায় গেছে বলতে পারবেন?'

‘না, বলে যাননি।'

জুলেখা হাত ঘড়ির দিকে তাকায়। সোনালী ফ্রেমের ঘড়িটা মারুফ কিনে দিয়েছিল। টিক টিক করে চলছে। ওর বুকের ঘড়িটাও চলে। টিক টিক। সে ঘড়িটাও ওর। ওর জন্য বাজে, চলে আর গান করে। রাত সাড়ে এগারটা। কোন বিপদ হয়নি তো মারুফের! প্রশ্নটা জুলেখার মনের ভেতর ঘুরপাক খায়। অনেক সময় প্রধান ফটকের দিকে তাকিয়ে আছে জুলেখা। মারুফ আসবে। মনে হচ্ছে এই তো এখনই আসবে মারুফ। সময় চলে যাচ্ছে মারুফ আসছে না। দীর্ঘপ্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে মনে হয় মারুফ আসছে। জুলেখার মন আনন্দে নেচে ওঠে। অন্ধকার ভেদ করে একটা ছায়ামূর্তি হেঁটে হেঁটে সিড়ি ঘরের দিকে আসছে। মারুফ। জুলেখা দাঁড়ায় না। বড় চাদরটা গায়ে টেনে দৌড় দেয়। রাস্তাতেই ধরবে ওকে। নিচে। ওর পা ধরে বলবে, এই মারুফ তুমি না আমার স্বামী। আর কোনদিন রাগ করবে। সিড়ি বেয়ে কয়েক সেকেন্ডে নিচে নামে। মারুফের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বিদ্যুৎ নেই। জুলেখা ছায়ামূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। নিরু ব্যথা কি বুঝতে পারছে মারুফ! এক সময় মুখ থেকে ভালোবাসার, ব্যথার আর্তনাদ বেরিয়ে আসে, ‘মারুফ আমার ওপর এতো রাগ করলে?'

‘আফা আমি রহিম। দারোয়ান।' জবাব দেয় ছায়ামূর্তি। জুলেখা চমকে ওঠে।