Quantcast
ঢাকা, শুক্রবার 27 January 2012, ১৪ মাঘ ১৪১৮, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৪১৩ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » সংগ্রাম সাহিত্য

বাংলা সাহিত্যে মুসলমান নারী

উম্মে আইরিন : নওয়াব ফয়জুন্নেসা (১৮৫৮-১৯০৩) : ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাঙালী মুসলমান নারীদের তরফ থেকে বাংলা সাহিত্য সৃজনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন নওয়াব ফয়জুন্নেসা। নওয়াব ফয়জুন্নেসা ১৮৫৮ খৃস্টাব্দে ত্রিপুরা জেলার পশ্চিম গাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মুহম্মদ গাজী চৌধুরীর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। ফয়জুন্নেসার দাম্পত্য জীবন সুখময় হয়নি এবং পরিশেষে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। নানা ব্যাধি ও অন্তর্জীবনের অশান্তিই তার সাহিত্য সাধনার অন্যতম কারণ।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরোপকারী ও সমাজ সেবিকা। ত্রিপুরা জেলার উন্নতিকল্পে সরকার কর্তৃক গৃহীত বিরাট পরিকল্পনার সমস্ত ব্যয়ভার তিনি গ্রহণ করেছিলেন বলে তৎকালীন সরকার তাকে ‘নওয়াব' উপাধিতে ভূষিত করেন। ফয়জুন্নেসা ১৮৯৪ সালে কন্যা বদরুন্নেসা ও দৌহিত্রের সঙ্গে পবিত্র হজ্ব পালনের জন্য মক্কা গমন করেন। সেখানে তিনি একটি মুসাফির খানা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন।

ফয়জুন্নেসার একটি মাত্র সাহিত্য কীর্তি ‘রূপজালাল।' তার এ আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসখানি প্রকাশিত হয় ১৮৭৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। তিনি ‘সংগীত সার' ও ‘সংগীত লহরী' নামে আরও দু'খানা গ্রন্থ রচনা করেন। কিন্তু, দুঃখের বিষয় গ্রন্থ দু'টির কোন মুদ্রিত কপি বা পান্ডুলিপি পাওয়া যায়নি। তিনি অন্তর্দাহ প্রকাশ করতে গিয়ে উপন্যাস রচনায় মাঝে মাঝে কবিতার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। ‘রূপ জালাল' -এ ফুঠে উঠেছে ফয়জেুন্নেসার কবি-প্রতিভা। কবি ফয়জুন্নেসা তার এই একটি মাত্র রচনা দিয়েই সমকালীন বাংলা সাহিত্যে একটি মর্যাদার আসন প্রতিষ্ঠা করেছেন।

হাজী সহিফা বিবি (১৮৫৪-১৯১২) : হাজী সহিফা বিবি বেগম রোকেয়ার জন্মের আনুমানিক প্রায় দুই যুগ আগে সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন লক্ষণ ছিরি ও কৌড়িয়ার জমিদার দেওয়ান আলী রেজা। সহিফা বিবি ছিলেন হাছন রাজার বৈমাত্রেয় বোন। তার স্বামী হাজী মোজাফফর চৌধুরী।

সহিফা বিবি সঙ্গীতে পারদর্শী ছিলেন। সহিফা বিবির তিনখানা গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়। ‘সহিফা সঙ্গীত', ‘ইয়াদ গাওে', ‘সইফাও ছাহেবানের জারি।' এর মধ্যে ‘সহিফা সঙ্গীত' বইখানিই সমধিক পরিচিত। বিবি সহিফা বানুর উর্দু বাংলার বেপরোয়া মিশ্রণে কাব্য রচনা অনেককেই সচকিত করে তোলে। তার কবিতায় সে কালের সামাজিক চিত্র ফুটে উঠেছে। সমাজের উদ্দেশ্যে তিনি ব্যঙ্গ করে লিখেছেন :

ধনে জনে ভাল যারা, মিথ্যা

          হইলে জয়ী তারা

দুঃখিত এতিম বিধবারা, তারা

          জিতে মরা।

চোরা যারা, ভাল তারা, চোরা

          ধনে বুক তার পুরা

টাকার বলে যা না ধরা কি

          বুঝিবে বেচারীরা।

সহিফা ভাবিয়া বলে সারা

          তেলেঙ্গী বিষম চোরা।

হাজী সহিফা বিবির কাব্য সমগ্র হয়তো সাহিত্যের বিচারে পুরোপুরি রসোত্তীর্ণ বলে দাবি করা যায়। কিন্তু তার রচনার সুর মাধুরী সহজভাবে মনকে ছুঁয়ে যায়। যে কালে মেয়েরা কাব্য রচনার কথা দূরে থাক, তাদের লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। সে সময় সহিফা বিবির এমন সাহিত্য রচনা কৃতিত্বের দাবি রাখে।

বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২) : রবীন্দ্র যুগে যে কয়জন মুসলিম মহিলা বাংলা সাহিত্য সাধনা করে যশ অর্জন করেন, বেগম রোকেয়া তাদের মধ্যে প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ। উনিশ শতকের শেষার্ধে অর্থাৎ ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেন। এক রক্ষণশীল পরিবারে সম্পূর্ণ প্রতিকূল এক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করে নিজের চেষ্টা ও মনোবল সম্বল করে তিনি ইংরেজী, বাংলা ও উর্দু ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

সম্ভ্রান্ত ঘরে বেগম রোকেয়ার বিবাহ হয়। বিবাহের পর স্নেহশীল ও মুক্ত মনের অধিকারী স্বামীর সংস্পর্শে এসে তিনি লেখাপড়া করার ও চিত্ত বিকাশের সুযোগ পান। কিন্তু স্বামীর সান্নিধ্যসুখ তার বেশিদিন ভোগ করার সৌভাগ্য হয়নি। বিবাহের মাত্র দশ বছর পরে তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন ইন্তিকাল করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের প্রতি সমস্ত আকর্ষণ হারিয়ে তিনি সমাজ সংস্কার ও সমাজ গঠনমূলক কাজে নিজেকে সঁপে দেন।

বেগম রোকেয়ার প্রথম উল্লেখযোগ্য কীর্তি, মুসলিম মহিলাদের অশিক্ষিত ও কুশিক্ষা থেকে মুক্তি দেবার জন্য তিনি স্বামীর স্মৃতিস্মারক ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' স্থাপন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, অশিক্ষা ও কুশিক্ষা থেকে মুক্ত করে সৎ ও সুন্দর পথে মুসলিম নারী জাতিকে এগিয়ে দেবার জন্য প্রয়োজন সংঘবদ্ধতা ও সমবেত প্রচেষ্টা। এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে তিনি ‘আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতীনে ইসলাম' প্রতিষ্ঠা করেন।

মুসলিম নারী সামজের উন্নতি সাধন এবং সর্ববিধ সামাজিক কুসংস্কার দূরীভূত করার উদ্দেশ্যেই তিনি সাহিত্য চর্চায় স্বীয় প্রতিভা নিয়োজিত করেন। ঊনিশ শতাব্দীতে যখন বঙ্কিম চন্দ্র-হেমচন্দ্র-নবীনচন্দ্র-রঙ্গলালের কলমে উগ্র হিন্দু-জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম বিদ্বেষ দেখা দিচ্ছিল তুমূলভাবে, সেই পটভূমিতে ঊনিশ শতকের শেষে বাঙালি-মুসলমানের নবজাগরণ ঘটতে শুরু করলো, প্রধানত সাহিত্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হলো প্রচুর সৃজনশীল শিল্পী। তাদের মধ্যে একমাত্র বেগম রোকেয়াই ছিলেন নারী শিল্পী। সৈয়দ এমদাদ আলী প্রাকশিত মাসিক ‘নবনূর' পত্রিকায় রোকেয়ার আত্মপ্রকাশ। সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ আলী প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে ‘অন্তঃপুরস্থ প্রত্যেক মহিলাকে' লেখক তার আহবান জানিয়েছিলেন। সে আহবানে সাড়া দিয়ে বেগম রোকেয়া তিনি সমকালীন হিন্দু-মুসলমান লেখিকাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, ‘নবনূর'-এর পৃষ্ঠাতে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।

বেগম রোকেয়া রচিত গ্রন্থাবলী তার চিন্তা ও কর্মাদর্শের বাণীরূপ। ‘মতিচূর', ‘পদ্মরাগ', ‘অবরোধবাসিনী', ‘সুলতানার স্বপ্ন' প্রভৃতি লেখিকার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তার শ্রেষ্ঠ রচনা কোনটি তা নিয়ে সাহিত্য সমাজে মতভেদ আছে। কেউ বলেন, ‘মতিচূর' শ্রেষ্ঠ, আবার কেউ বলেন, ‘অবরোধবাসিনী' শ্রেষ্ঠ। প্রবন্ধ, গল্প ও রূপক রচনায় ‘মতিচূর' সমৃদ্ধ। গ্রন্থের বিষয়সূচি থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সামাজিক, অধ্যাত্মিক ও কাল্পনিক বিষয়বস্তু  সন্নিবেশের মুখ্য উদ্দেশ্য নারী মুক্তি ও আদর্শ প্রচার। বেগম রোকেয়া রচিত ‘অবরোধবাসিনী' ১৯২৮ সালের কার্তিক মাসে প্রকাশিত হয়। খান্দানী জমিদার ঘরে, কি সাধারণ সম্ভ্রান্ত মুসলিম ঘরে অবরোধের নামে নারীত্বের ও মনুষ্যত্বের অবমাননা এ দেশে বহুকাল থেকে প্রচলিত আছে। এই অবরোধ প্রথার কঠোর অনুশাসনে কত রমণীর সম্ভাবনাময় জীবন যে অকালে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় তার অনেক করুণ চিত্র এঁকেছেন বেগম রোকেয়া তার এ গ্রন্থে। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, অবরোধ ছিন্ন মানে পর্দাহীনতা নয়।

‘পদ্মরাগ' বেগম রোকেয়া রচিত একটি উপন্যাস। সম্ভবত ‘পদ্মরাগ' লেখিকার সর্বশেষ রচনা। বিবাহিত জীবন তথা সংসার ধর্ম পালনই যে, নারী জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়, সেই বক্তব্যই উচ্ছবসিত হয়েছে নায়িকা সিদ্দিকার কণ্ঠে।

রবীন্দ্র যুগে আবির্ভূত হয়ে বাংলা সাহিত্যের চর্চা করে যে ক'জন মুসলিম মহিলা প্রতিষ্ঠা অর্জন করেন, তাদের মধ্যে বেগম রোকেয়া নিঃসন্দেহে প্রথম ও শ্রেষ্ঠ।

সারা তৈফুর (জন্ম ১৮৮৮ সাল) : বেগম রোকেয়ার পরে যিনি সমাজের অবরুদ্ধ পরিবেশে নির্ভীকচেতা নারী হিসেবে সকল প্রতিকূলতাকে রুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি মিসেস সারা তৈফুর। ১৮৮৮ সালে বরিশাল শহরে বেগম তৈফুর জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা মজহার হোসেন নূর আহম্মদের বাড়ি ছিল ঢাকার নওয়াবগঞ্জ থানার নয়াবাড়ীতে। তার মা ছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের বড় বোন। শ্বশুর বাড়ির রক্ষণশীল পরিবেশে থেকেও উচ্চ শিক্ষিত স্বামীর আন্তরিক সহযোগিতায় তিনি ইংরেজী শিখলেন, নিজেকে সমৃদ্ধ করলেন যুগোপযোগী ভাবধারায়। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট সমাজ কর্মী, সমাজ কল্যাণের কাজে প্রশংসনীয় কৃতিত্বের জন্য তিনি পেয়েছিলেন কায়সারে হিন্দু মেডেল।

বেগম সারা তৈফুরের সাহিত্য জীবন ছিল উল্লেখযোগ্য। বিবাহের মাত্র দু'বছর পর ১৯১৬ সালে 'হযরতের জীবন ও আদর্শ ভিত্তি করে তিনি রচনা করেন ‘স্বর্গের জ্যোতি' নামক গ্রন্থ। তা ছাড়া বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকা, আল ইসলাম প্রভৃতি পত্রিকায় তার লেখা নিয়িমিত প্রকাশিত হতো।

নুরুন্নেসা খাতুন (১৮৯৪-১৯৭৪) : বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রায় সমসাময়িক কালের আর একজন মুসলিম মহিলা সাহিত্যিক বেগম নুরুন্নেসা খাতুন। ১৮৯৪ সালে মুর্শিদাবাদ জেলার শাহপুর গ্রামের প্রসিদ্ধ খোন্দকার পরিবারে শাহ সুফী শাহ তাহেরের বংশে নুরুন্নেসা খাতুন জন্মগ্রহণ করেন। বেগম রোকেয়ার পরিবারের মতো তার পরিবারও ছিল রক্ষণশীল পরিবার। ফলে বাইরের স্কুল-কলেজে শিক্ষা অর্জন তার ভাগ্যে হয়ে ওঠেনি। তার বিবাহ হয় বারাসত মহকুমার আনোয়ারপুর কাজীপাড়ার কাজী গোলাম মোহাম্মদের সাথে। স্বামীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি বই পড়া ও সাহিত্য চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী স্বামীর কর্মব্যপদেশে এবং ভ্রমণ সূত্রে তার ভারতের বহু স্থান দেখার সুযোগ ঘটে।  এভাবে তার প্রখর পর্যবেক্ষণ শক্তি তার সাহিত্যের উপাদন সংগ্রহ ও সাহিত্য রচনার সহায়ক হয়। অভিজ্ঞতালব্ধ গার্হস্থ্য জীবনের ছবি ও জ্ঞানলব্ধ তথ্য তার সাহিত্যকে রঞ্জিত করেছে।

তার প্রথম পারিবারিক উপন্যাস ‘স্বপ্ন দ্রষ্টা'। ঐতিহাসিক উপন্যাস জানকী বাঈ বা ভারতে মোসলেম বীরত্ব। আলাউদ্দিন খিলজী কর্তৃক ভারতে মুসলিম রাজ্য বিস্তারের কাহিনীকে কেন্দ্র করে তার সেনাপতি আলেফ খাঁ ও রাজা রামদেবের ভাইজি জানকী বাঈ এর প্রণয় কাহিনী নিয়ে রচিত এ উপন্যাস। উপন্যাসের মুখ্য বর্ণিতব্য বিষয়  রোমান্টিক ‘ভাগ্যচক্র', ‘বিধিলিপি' এবং ‘নিয়তি' উপন্যাস ধর্মী এ তিনটি ছোট লেখাতে লেখিকার রোমান্স প্রীতি ফুটে উঠেছে। ১৩৩৬ সালে নুরুন্নেসা গ্রন্থাবলী মোট ছয়টি উপন্যাস নিয়ে প্রকাশিত হয়। এই ছয়টি উপন্যাস হচ্ছে- ‘স্বপ্ন দ্রষ্টা', ‘জানকী বাঈ বা ভারতে মোসলেম বীরত্ব', ‘আত্ম দান', ‘ভাগ্যচক্র', ‘বিধিলিপি' ও ‘নিয়তি।' ‘মোসলেম বিক্রম ও বাংলায় মুসলমান রাজত্ব' লেখিকার সাহিত্য সাধনার শেষ ফল। এ রচনায় লেখিকা হযরত  আবুবকর থেকে শুরু করে বাংলার শেষ স্বাধীন নওয়াব সিরাজ-উদ-দৌলার পতন পর্যন্ত মুসলিম বীরত্ব ও কীর্তিগাথার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।

নুরুন্নেসার ভাষা অনাড়ম্বর ও সরল। তার সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি হিসাবে তিনি ‘বিদ্যাবিনোদিনী' এবং ‘সাহিত্য স্বরস্বতী' উপাধিতে ভূষিতা হয়েছিলেন।

খয়েরুন্নেসা খাতুন

খয়েরুন্নেসা খাতুন নাম্নী এক লেখিকার ‘সতীর পতি ভক্তি' নামক একখানা বইয়ের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন সিরাজগঞ্জের অধিবাসিনী। সম্ভবত বর্তমান শতাব্দীর কোন এক সময় তিনি সাহিত্য সাধনা করে ছিলেন। তিনি প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষয়িত্রী ছিলেন। ‘সতীর পতি ভক্তি' গ্রন্থে তিনি নিজেকে বিদ্যা বুদ্ধিহীন এক মুসলিম নারী বলে পরিচয় প্রদান করেছেন। প্রকৃতভাবে তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্না এক নারী।

মম্ লুকুল ফাতেমা খানম (১৮৮৪-১৯৫৭)

মম্ লুকুল ফাতেমা খানম ১৮৮৪ সালে ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহাকুমার অন্তর্গত তসবিডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা রইস উদ্দীন আহমদ রেল পুলিশে চাকরি করতেন। ফাতেমা খানমের উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ ঘটেনি। পিতার স্নেহচ্ছায়ায় তার মনে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে এবং লেখালেখির অভ্যাস সৃষ্টি হয়। বেগম রোকেয়ার সহকর্মিণী হিসেবে তিনি রোকেয়া সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে শিক্ষকতা করেন।

ফাতেমা খানমের সাহিত্য সাধনার উল্লেখযোগ্য সময় ১৯২১ থেকে ১৯৩১ সাল। এ সময় তার সমপর্যায়ের দ্বিতীয় কোন মুসলমান গল্প লেখিকা ছিলেন না। সে যুগের নির্মীত কথা শিল্পের সব ধারায়ই তাঁর একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। সেলিনা চৌধুরীর সম্পাদনায় তার সাতটি গল্পের সংকলন ‘সপ্তর্ষি' ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে। গল্পগুলোর মধ্যে তিনি একটি সুস্থ জীবনবোধের পরিচয় তুলে ধরেছেন।

সৈয়দা মোতাহেরা বানু (জন্ম-১৯০৬ সাল)

সৈয়দা মোতাহেরা বানু ১৯০৬ সালের নবেম্বর মাসে বরিশাল জেলার বামনা গ্রামে মাতামহ মীর সরোয়ার জানের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শাহ সৈয়দ সাজ্জাদ মোজাফ্ফর। শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের আপন ভাগিনেয় এ. এন. এম ইউসুফ আলীর সাথে তার বিবাহ হয়। বিবাহের পর থেকেই তিনি স্বামীর প্রবল উৎসাহে নিয়মিত কাব্য চর্চা শুরু করেন।

১৯১৯ সালের জুন মাসে মোতাহেরা বানু ‘খেলার সাথী' নামক একটি কবিতা রচনা করেন যা ‘সওগাত' পত্রিকায় ছাপা হয়। তিনি প্রায় দেড়শত কবিতা রচনা করেন যার মধ্য থেকে একশতের উপর ‘কাফেলা' নামক গ্রন্থে সংকলিত ও প্রকাশিত হয়। সওগাতের মহিলা সংখ্যায় ১৩৩৬ সালে তাঁর ‘শাওন নিশিথ', ১৩৩৭ সালে ‘অবেলায়', ১৩৫২ সালে ‘হেমন্ত রজনী' কবিতা প্রকাশিত হয়। সওগাত ছাড়া তাঁর কবিতা সাপ্তাহিক ‘বেগম'এ নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। মোতাহেরা বানুই বাংলার মুসলিম কবিদের মধ্যে স্বভাব কবি হিসাবে খ্যাত। বিশিষ্ট লেখিকা শ্রীমতি মোহিনী সেন গুপ্তা তাঁর ‘অধীরা' ও ‘প্রতিক্ষা' নামক কবিতা দুটিতে সুর সংযোজন করেন এবং পরবর্তীতে বিখ্যাত গায়ক কে, মল্লিকের কণ্ঠে গীত এবং রেকর্ড করা হয়েছিল। বাংলার মুসলমান মহিলা কবিদের মধ্যে তার গানই প্রথম রেকর্ড করা হয়।

মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা (১৯০৬-১৯৭৭)

মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা ১৯০৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাবনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম খান বাহাদুর মোহাম্মদ সোলায়মান সিদ্দিক। এক সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশে জন্মগ্রহণ করায় তার কাব্য প্রতিভা অতি শৈশবে প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে তিনি প্রথম কবিতা লেখেন। মাত্র নয় বছর বয়সে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘আল ইসলাম' পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ত্রিশ বছর ধরে তার কবিতা সাপ্তাহিক ‘বেগম' পত্রিকায় ছাপা হযেছে। তাঁর রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পসারিণী' ১৯৩৮ সালে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। বাংলা ভাষায় মুসলমান মহিলা কবির এটাই প্রথম প্রকাশিত আধুনিক কবিতার বই। কবির অন্যান্য কাব্য গ্রন্থ ‘মন ও মৃত্তিকা', ‘অরণ্যের সুর'। ছোটদের জন্য তার রচিত কাব্য গ্রন্থ ‘রাঙা ঘুড়ি', ‘রোদ বৃষ্টি' ও ‘শ্রাবনী'। অসাধারণ কাব্য প্রতিভার জন্য এই কবিকে ১৯৬৭ সালে বাংলা একাডেমী এবং ১৯৭৭ সালে একুশের পদকে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৭ সালের ২রা মে মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা ইন্তিকাল করেন।

শামসুন নাহার মাহমুদ (১৯০৮-১৯৬৪)

শামসুন নাহার মাহমুদ ১৯০৮ সালে নোয়াখালি জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বেগম মাহমুদের শিক্ষাজীবন অনন্তকৃতিত্বপূর্ণ। প্রবেশিকা পরীক্ষায় তিনি তিন বিষয়ে ডিস্টিংশন নিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। প্রবেশিকা পরীক্ষার পর তিনি ডাক্তার ওয়াহিদুদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। বেগম মাহমুদ ১৯৩২ সালে বিএ এবং ১৯৪২ সালে এম এ পাস করেন। তিনিই বাংলাদেশের মুসলিম মেয়েদের মধ্যে প্রথম গ্রাজুয়েট।

লেখিকা হিসাবে তার রয়েছে প্রচুর অবদান। অতি শৈশবেই শামসুন নাহারের সাহিত্য প্রতিভার উন্মেষ ঘটে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত তৎকালীন কিশোর পত্র ‘আঙ্গুর' এ তার প্রথম রচনা একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। তার ছাত্রী জীবনের লেখাসমূহের সংকলন ‘পূণ্যময়ী' (১৩৩১) গ্রন্থ।) এতে রযেছে রাবেয়া, ফাতেমা, আয়শা প্রমুখ প্রাচীন সতী সাধ্বী আট মুসলিম নারীর সংক্ষিপ্ত জীবনী। পরবর্তীকালে বেগম মাহমুদ রচনা করেছেন ‘রোকেয়া জীবনী', ‘বেগম মহল', ‘শিশুর শিক্ষা', ‘আমার দেখা তুরস্ক' ও সর্বশেষ রচনা ‘নজরুলকে যেমন দেখেছি'। এতদ্ব্যতীত ‘মহিলা মহল' নামে একটি প্রবন্ধ সংগ্রহ বিজ্ঞপ্তি হয়েছিল। ১৯৩৭ সালে লেখিকার শ্রেষ্ঠ রচনা ‘রোকেয়া জীবনী' প্রকাশিত হলে জীবনীকার ও প্রাবন্ধিক হিসাবে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। ‘রোকেয়া জীবনী'র গদ্যভঙ্গি সাবলীল, বেগবান ও শ্রুতি সুখকর। ‘নজরুলকে যেমন দেখেছি' (১৯৫৮) নজরুলের সঙ্গে লেখিকার আবাল্য পরিচয় ও সাহিত্য রচনায় কবির উৎসাহ দানের স্মৃতি কথা। নাহারের অগ্রজ হাবিবুল্লাহ বাহারের সঙ্গে কলকাতা থেকে ‘বুলবুল' (১৯৩৪-৩৯) সাহিত্য পত্র সম্পাদনা করার সময় তিনি যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন। এই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। শামসুন নাহারের রচনাবলীর প্রধান উপজীব্য হচ্ছে শিশু ও নারী।

ব্যক্তিগত জীবনে শামসুন নাহার বিভিন্ন সমাজ কল্যাণমূলক কাজে লিপ্ত ছিলেন। তিনি নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক পরিষদের সাবেক পাকিস্তান শাখা, ঢাকা ইডেন কলেজ, আর্ট ইনস্টিটিউট, নিখিল পাকিস্তান মহিলা সমিতির পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভানেত্রী, আন্তর্জাতিক মহিলা মৈত্রী সংঘের এশীয় আঞ্চলিক পরনিয়ন্তা ও সাবেক পূর্ব পাকিস্তান শিশু কল্যাণ পরিষদের সভানেত্রী হিসাবে এ দেশের নারী শিক্ষা সম্প্রসারণ ও সমাজকল্যাণ প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি ১৯৩৫ সালে কলকাতায় প্রখ্যাত তুর্কী সাহিত্যিক ও রাজনীতিক খালিদা এদিব হানুমের সংস্পর্শে আসেন।

বেগম সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯)

বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট মুসলিম মহিলা কবি বেগম সুফিয়া কামাল। সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালে বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদ পরগণায় মাতামহ সৈয়দ মুয়াজ্জম হোসেন চৌধুরীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কুমিল্লা জেলার সৈয়দ আবদুল বারী বিএল। সুফিয়া কামাল স্কুল কলেজে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাননি। তাদের পরিবারে বাংলা ভাষার প্রবেশ এক রকম নিষিদ্ধ ছিল। এই বিরুদ্ধ পরিবেশে সুফিয়া কামাল স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। ১১ বছর বয়সে জ্ঞাতি ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সাথে তার বিবাহ হয়। তার সংস্পর্শে এসে তিনি ভাষা ও সাহিত্য চর্চার সুযোগ পান। কিছুদিন পরে নেহাল হোসেন ইন্তিকাল করলে চট্টগ্রামের জনাব কামাল উদ্দীন সাহেবের সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিবাহ হয়। সুফিয়া কামাল বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় নিজকে নিয়োজিত করে কবি হিসাবে বরণীয় হয়ে আছেন। তার কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘সাঁঝের মায়া' (১৯৩৮), ‘মায়া কাজল' (১৯৫১), ‘মন ও জীবন' (১৯৫৭), ‘উদাত্ত পূরবী' (১৯৭১)। এছাড়াও তিনি গল্প, ভ্রমণ কাহিনী, প্রবন্ধ ও স্মৃতি কথাও লিখেছেন।

কবির বিভিন্ন কবিতায় বিশেষ করে তার সাহিত্য সাধনার প্রধান সহায়ক প্রথম স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের মৃত্যুর পর যে সব কবিতা তিনি রচনা করেছেন তাতে শোকের অপূর্ব অভিব্যক্তি ঘটেছে। কামিনী রায়ের পর বাংলা সাহিত্যে অনেকদিন পর্যন্ত বিশিষ্ট কোনো নারী কন্ঠস্বর শোনা যায়নি। সুফিয়া কামালের কবিতায় সেই কণ্ঠস্বর যেন আবার নতুন করে বাংলা ভাষায় উচ্চারিত হলো। এই নন্দিত মুসলিম মহিলা ‘কবি ঢাকাতে ১৯৯৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।