Quantcast
ঢাকা, শুক্রবার 10 February 2012, ২৮ মাঘ ১৪১৮, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৩
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৩৬৭ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » সম্পাদকীয়

প্রসঙ্গ : আযাদ দীনী এদারা

বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনাই কওমী মাদ্রাসার মূলভিত্তি

মুহাম্মদ রুহুল আমীন নগরী : ভারত বর্ষে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার সূচনা ১৩০০ ঈসায়ী সনের প্রথম দিকে সুলতান কুতুবুদ্দীন আইবেকের আমলে হয়। মুলতানের গভর্নর নাসিরুদ্দীন কুবাচাহ মুলতানের ‘‘উচ্ছ’’ নামক স্থানে ‘‘মাদ্রাসায়ে ফীরুজী’’ নামে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করেন। কালের প্রবাহে ভারতবর্ষে অসংখ্য কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। বৃটিশ শাসনামলের শেষ দিকে মাদ্রাসার জন্য ওয়াক্ফকৃত জমিজমা সরকার কর্তৃক বিশেষ কৌশলে বিলুপ্ত করার কারণে ধীরে ধীরে মাদ্রাসার সংখ্যা হ্রাস পেয়ে যায়। ১৮৫৭ ঈসায়ী সনে আলেমদের এক সাগর রক্ত বন্যা ভেসে যাওয়ার পর ১৮৬৬ ঈসায়ী সনে ভারতের উত্তর প্রদেশে দেওবন্দ নামক স্থানে দারুল উলূম দেওবন্দ মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়। দেওবন্দ মাদ্রাসাকে বর্তমান বিশ্বের কওমী মাদ্রাসা সমূহের মূল উৎস বললে মোটেই অত্যুক্তি হবে না। আমাদের দেশের কওমী মাদ্রাসাসমূহ দারুল ঊলুম দেওবন্দের নিয়ম নীতি ও পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে। (সূত্রঃ এদারার সংবাদ সম্মেলন) 

       আঠারো শ' সাতান্ন সালের সিপাহী বিপ্লবে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেন বিপ্লবী মুজাহিদগণ। তখন ঘোর অন্ধকার নেমে আসলো ভারতের ভাগ্যাকাশে। ফলে বৃটিশ উপনিবেশ সাম্রাজ্যবাদীদের শাসন ক্ষমতা আরো সুসংহত হয়। দিল্লীর মসনদে বৃটিশরা পাকাপোক্ত হওয়ার পর প্রথমেই যে কাজটিকে গুরুত্ব দিয়েছিল, তা ছিল ইসলাম- মুসলমানদের দীনী ঐতিহ্য, সভ্যতা, শিক্ষা-সংস্কৃতি চিরতরে ধ্বংস করা, যাতে মুসলমানরা কোন দিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে। যে জাতিকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, চাপ প্রয়োগ করে দাবানো যায়নি, তাদের চিন্তাধারায় আস্তে আস্তে এমন পরিবর্তন আনতে হবে যে, তারা এক ভিন্ন জাতি হিসেবে যেন নিজেদের অস্তিত্ব ভুলে যায়। তারা নিজেদের দীনী ঐতিহ্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং সোনালী অতীত থেকে দিনে দিনে গাফেল হয়ে যায়। এমনকি দীর্ঘদিন পরে যেন তাদের একথা স্মরণ না থাকে যে, তারা কেমন সিংহের জাতি ছিল অথচ আজ শৃগালে পরিণত হয়েছে। এই হীন উদ্দেশ্য পূরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা তারা এই গ্রহণ করলো যে, মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন কিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে যার দ্বারা তাদের মস্তিস্কে প্রভাব প্রতিপত্তিপূর্ণ দমে বসে যায় এবং এতে তারা প্রভাবিত হয়ে স্বীয় বিবেক বুদ্ধি দ্বারা মুক্ত চিন্তার যোগ্যতাই যেন একেবারে হারিয়ে ফেলে। আগ্রাসী ইংরেজ শক্তি মুসলমানদের ঈমান আক্বিদা, তাহযীব- তামাদ্দুনের উপর ব্যাপক কুঠারাঘাত হানে।

১৮৫৭ সালে সংঘটিত ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর বৃটিশ সরকার ভারতের মুসলমান তথা আলেম সম্প্রদায়কে এর মূল নায়ক হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের উপর এক লোমহর্ষক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ অধ্যায়ের সূচনা করে। লাখ লাখ আলেমকে প্রকাশ্যে দিবালোকে শহীদ করা হয়। ত্রাস ও ভীতি সৃষ্টির লক্ষ্যে স্বাধীনতার স্বপ্নালোকটির আশা আকাংখাকে মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে দিনের পর দিন শহীদের বিকৃত লাশ বৃক্ষের ডালে ডালে লটকিয়ে রাখা হয়, ইতিহাস অনুসন্ধানে জানাগেছে, দিল্লীর চাঁদনীর চক থেকে নিয়ে ‘খায়বার' নামক স্থান পর্যন্ত এমন কোন বৃক্ষ বাকি ছিলো না যেখানে কোন একজন আলেমের (শহীদের) লাশ ঝুলেনি। কোন আলেমকে দেখলেই পাষান্ডরা নির্বিচারে হত্যা করতো। এক তথ্য মতে ১৮৬৪ সাল থেকে ৬৭ সাল পর্যন্ত ১৪ হাজার মুসলিম মিল্লাতের ধর্মীয় নেতা হক্কানী উলামায়ে কেরামকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। গ্রামকে গ্রাম খুঁজেও একজন আলেম পাওয়া যেতো না। নিরাশা- হতাশায় পূঞ্জিভূত মেঘমালার বিদ্যুৎ চমকে শিউরে উঠছিলো উপমহাদেশের আলেমগণ। ধীরে ধীরে নেমে আসছিলো অশিক্ষা-কুশিক্ষা, কুসংস্কৃতি, শিরক, বিদআতের এক চরম দুর্যোগ। অপর দিকে বৃটিশরা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্য চিরস্থায়ী করতে হলে ভারতীয় মুসলমানদেরকে আর্থিক অভাব অনটন ও চরম দুরবস্থায় ফেলতে হবে। তাদের অন্তর থেকে আল কোরানের আলো চিরতরে নিভিয়ে ফেলতে হবে। মুসলিম বিদ্বেষী ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, বৃটিশ জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলাকালে পবিত্র কোরআন উত্তোলন করে বলেছিলো- ‘‘যতদিন এই পুস্তক অবশিষ্ট থাকবে ততদিন পৃথিবী কৃষ্টি ও সভ্যতা লাভ করতে পারবে না।' এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইংরেজরা ১৮৬১ সালে ভারতবর্ষে তিন লাখ কোরআন শরীফের কপি জ্বালিয়েছিল। বৃটিশ সরকারের শিক্ষানীতি সম্পর্কে ইংল্যান্ডের লর্ড ম্যাকালে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছিলো ‘‘ভারতীয়দের জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, এমন এক যুব সম্প্রদায় সৃষ্টি করা যারা বংশে ভারতীয় হলেও মন মস্তিষ্কে হবে খাঁটি বিলাতী।’’ এ হীন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নানা আইন ফরমান জারী করে মুসলমানদের থেকে নবাবী জমিদারী কেড়ে নিয়ে প্রতিবেশী হিন্দুদের মাঝে বন্টন করে দেয়। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকুরী এক কথায় জীবন জীবিকার সকল ক্ষেত্র থেকে মুসলমানদেরকে বঞ্চিত করে রাখে। তখন ফার্সীর স্থানে ইংরেজী ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলমানদের ঈমান আকিদা বিনষ্টের এক সুপরিকল্পিত হীন প্রয়াস চালিয়ে যায়।

লর্ড ম্যাকালে ভারত বর্ষের জনগণের জন্য নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রস্তাব পেশ করলো এবং এই উদ্দেশ্য পূরণে এক দীর্ঘ সুপারিশমালা তৈরি করলো যার মধ্যে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে ঠাট্টা বিদ্রূপ করা হল। মুসলমান এবং উলামায়ে কেরামের উপর ভিত্তিহীন অভিযোগ আরোপ করে। শেষে উল্লেখ করা হয় যে, ‘‘এখন আমাদের এমন একটা শ্রেণী সৃষ্টির জন্য চেষ্টা করা উচিত, যারা আমাদের এবং এই কোটি কোটি মানুষের মধ্যে দোভাষীর কাজ আঞ্জাম দিতে পারে, যাদের উপর আমরা বর্তমানে কর্তৃত্ব চালাচ্ছি, এমন এক শ্রেণী যারা রক্ত এবং রঙ্গের দিক দিয়ে ভারতীয় হবে কিন্তু চাল-চলন, সভ্যতা-সংস্কৃতি, স্বভাব-চরিত্র এবং বুদ্ধি ও বিবেচনার দিক দিয়ে ইংরেজী হবে।’’ মুসলমানদের মস্তিষ্ক ধোলাই করে- তাদেরকে সর্বকালের জন্য ইংরেজদের অনুগত গোলাম বানানোর এই ষড়যন্ত্র প্রকৃতপক্ষে ভারত বর্ষের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব দীর্ঘায়িত করারই এক ষড়যন্ত্র ছিল। যে কর্তৃত্ব ভারতবাসীদের বিভিন্ন স্বাধীনতা আন্দোলনের কারণে সর্বদা ডামাডোল থাকত, যা রক্ষার জন্য তাদের বন্দুক-কামানের শক্তি হার মেনেছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী আলেমদেরকে জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে ভন্ড নবী মীর্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ও স্যার সৈয়দ আহমদ প্রমুখকে (সাম্রাজ্যবাদীরা) খরিদ করে তাদের মাধ্যমে সংগ্রামী আলেমদের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারে মেতে উঠে। আর খৃস্টান মিশনারীদের গ্রামে-গঞ্জে ব্রাহ্মণ্যবাদির প্রবক্তা স্বামী দিয়ানজীর শুদ্ধি আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মান্তরিত ও বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালায়। তখনকার অবস্থার ভয়াবহতায় মনে হচ্ছিলো এদেশে স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য আর বুঝি উদিত হবে না। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, সবকিছু বুঝি ধ্বংসের অতল গহবরে নিপতিত হবে। মুসলমানদের ঈমান-আকীদা, তাহজীব-তামাদ্দুন আর বুঝি রক্ষা করা যাবে না। উপমহাদেশ হয়তো বা হবে আরেক স্পেন।  কর্ডোভার জামে মসজিদের মতো কুতুব মিনারও নির্জীব হয়ে যাবে। আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আর বুঝি উপমহাদেশের আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠবে না। সে ছিল মুসলিম জাতির এক চরম মর্মান্তিক দুর্যোগের সময়। মোট কথা ইংরেজরা তাদের দৃষ্টিতে মুসলমানদের ইসলামী মূল্যবোধ ও জেহাদী প্রেরণাই যেহেতু তাঁদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনের মূল কারণ, তাই তারা ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ ধর্মীয় শিক্ষা সভ্যতার পিঠে কুঠারাঘাত করতে কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে এদেশের জনসাধারণের উপর চাপিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে হাজার হাজার ধর্মীয় শিক্ষা কেন্দ্র মক্তব-মাদ্রাসা,মসজিদ ধ্বংস করে সমগ্র ভারতে হাজার হাজার পাশ্চাত্য শিক্ষাকেন্দ্র, স্কুল, কলেজ, গীর্জা, মিশন স্থাপন করতে লাগল।

 কিন্তু তখন কতিপয় দূরদৃষ্টি সম্পন্ন বিজ্ঞ হক্কানী উলামায়ে ক্বেরাম এই ভয়াবহ ষড়যন্ত্র এবং এর সুদূর প্রসারী ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। ১৮৫৭ সালের আযাদী আন্দোলনের ঐতিহাসিক শামিলির ‘জেহাদ' যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন যথা-আমিরুল মুমিনিন হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজীরে মক্কী (র), মাওলানা রশিদ আহমদ গং গুহী, হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতুবী (র) প্রমুখ। উল্লেখিত জেহাদে হযরত মাওলানা হাফিজ জামীন (র) শহীদ হন। ভাগ্যক্রমে উক্ত তিন মনীষী বেঁচে গিয়েছিলেন। স্বাধীনতা বিদ্রোহের বীর সেনানী আমিরুল মোজাহিদীন হাজী ইমদাদ উল্লাহ মুহাজীরে মক্কী (রঃ) থানা ভবন সরকারের পতনের পর আত্মগোপন করে মক্কা শরীফে হিজরত করেন এবং সেখান থেকেই ইংরেজের বিরুদ্ধে পুনরায় তাঁর সঙ্গী সাথীদের সংগঠিত করতে থাকেন। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর মাওলানা কাসেম নানুতবী (রঃ), মাওলানা রশিদ আহমদ গাংগুহী (র) প্রমুখ বীর মোজাহীদরা আবার কর্মক্ষেত্রে নেমে আসেন। দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনার পর আপাততঃ সশস্ত্র যুদ্ধ পরিহার করে (রাজনীতির মাধ্যমে ইংরেজদের সরাসরি মোকাবিলা থেকে সরে দাঁড়ালেন) কৌশলগত দিক অবলম্বন করলেন। ইংরেজদের প্রণীত নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার অবর্ণনীয় ক্ষতি থেকে মুসলমানদেরকে হিফাজত করার জন্য সাংস্কৃতিক যুদ্ধের পথ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের চেতনা জাগরুক রাখা, ইলম-আমল, ঈমান-আকিদা ও ইসলামী তাহযীব তামদ্দুন সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের সুমহান বাস্তব কর্মসূচী হাতে নেওয়া হয়। এ মহান কর্মসূচী ও উদ্দেশ্য রূপায়ণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হাজী ইমদাদুল্লাহ মোহাজিরে মক্কীর ইংগিতে কাশেম নানুতভীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ভারতের সাহারানপুরের দেওবন্দ নামক স্থানে (১৮৬৬ সালের ৩০ মে) ১৫ই মুহাররাম ১২৮৩ হিজরী রোজ বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠা করা হয় আজকের বিশ্ববিখ্যাত ‘দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা'। এ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের প্রতি ইংগিত করে কাছেমনানতবী বলেছিলেন- ‘এটি নিছক একটি বিদ্যালয়ের নাম নয়; এটি ইসলাম তথা স্বাধীনতা আন্দোলনের মজবুত দূর্গ, এটি হচ্ছে মোজাহীদদের সেনানিবাস'। আরও বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের মতে- দারুল উলুম দেওবন্দ হচ্ছে মুঘল সাম্রাজ্য পতনের পর ইসলামের আলো প্রজ্জলিত রাখার একটি উচ্চ মিনার। বৃটিশ বেনিয়াদের ইসলাম বিদ্বেষী চক্রান্ত মোকাবেলায় সশস্ত্র সংগ্রামের পরিবর্তে একটি পরোক্ষ সংগ্রামের নাম দারুল উলুম দেওবন্দ। যা লাখো শহীদের প্রাণঢালা রক্তের সিঞ্চনে স্বাধীনতা আন্দোলনের চেতনা নিয়ে অসংখ্য শাখা-প্রশাখায় ভারত বর্ষের প্রতিটি অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি শাখা-প্রশাখা স্বাধীনতা পাগল মোজাহীদদের দুর্গম দূর্গে পরিণত হয়। লাখো সূর্য সন্তান জন্ম দেয়। জন্ম দেয় মোজাহীদ মোবাল্লীগ, আর আউলিয়া। যাদের নিরলস প্রচেষ্টা, অনুপ্রেরণায় আবার বিদ্রোহী কাফেলার দুর্দমনীয় যাত্রা শুরু হয়। জ্বলে উঠে বিদ্রোহের লেলিহান অগ্নিশিখা, কেঁপে উঠে ভারতবর্ষ। বৃটিশ সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়ে বিদ্রোহের প্রচন্ড কম্পনে। দেশবাসীর হাতে ফিরে আসে আবার এদেশ। এদেশের বুকে আবার উদিত হয় স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। তাই ‘‘দারুল উলুম দেওবন্দ’’ সকলের নিকট একটি বিদ্রোহ, একটি জেহাদ, একটি চির অম্লান ইতিহাস। হিংস্র ইংরেজদের দাবানল থেকে জাতিকে উদ্ধার করে দারুল উলুম দেওবন্দ (তার প্রতিষ্ঠিত সূর্য সন্তানেরা) যে সফলতার পরিচয় দিয়েছে তা সর্বকালের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।

আর এ বিশ্ববিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসরণে বিশ্বে (বাংলাদেশে) হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কওমী মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে। এসব মাদ্রাসাই জন্ম দিচ্ছে অগণিত আলেম, মুফতী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসির, সমাজ সংস্কারক, দেশপ্রেমিক, মর্দে মুজাহিদ। যারা দেশ ও জাতির তরে জীবনকে তুচ্ছ করে মরণকে বরণ করতে জানে। এ সমস্ত আত্মত্যাগী সংগ্রামী উলামায়ে কেরামের দ্বারাই এ উপমহাদেশে ঈমানদীপ্ত বৃহৎ কাফেলা শত বাধা বিপত্তির সাগর পাড়ি দিয়ে আজ দু'টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র শক্তির অধিকারী হয়েছেন। সংগ্রামী সে কাফেলার ত্যাগী ভূমিকার কথা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ হওয়া সত্ত্বেও দুর্ভাগ্য ক্রমে আমরা সেসব বর্তমান প্রজন্মের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারিনি। যা আমাদের এক চরম ব্যর্থতা। ১৭৫৭-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদূত ছিল এসব কওমী মাদ্রাসা ও উহার উলামায়ে কেরাম। দারুল উলুম দেওবন্দও এই সমস্ত কওমী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার বুনিয়াদী উদ্দেশ্য মুসলমান এবং ইসলামকে ধ্বংস করার যে পরিকল্পনা লর্ড ম্যাকলে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে করেছিল, সেটাকে অকার্যকর করে ইসলামী ঊলূমকে ঠিক ঠিকভাবে হিফাজত করা এবং জীবন উৎসর্গকারী এমন এক দল উলামা (নায়েবে নবী) তৈরী করা, যারা কঠিন থেকে কঠিন অবস্থায় (পিচঢালা প্রাচীরের ন্যায়) দ্বীনকে শুধু হিফাজতই করবে না এবং দ্বীনকে অন্যের নিকট প্রচার ও প্রসারের দায়িত্বও পালন করবে। একথা সত্য যে, দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার সময় এমন ছিল- যখন ভারতবর্ষে কোন দীনী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা নতুন নতুন মুসিবতকে ডেকে আনারই নামান্তর। দারুল উলুম দেওবন্দ ও তার শাখা কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা শুধু প্রকাশ্যে ইসলামের গুণেই গুণান্বিত হতো না বরং বাস্তবেও একজন সৎ ও খাঁটি মুসলমান হয়ে বেরুচ্ছে, যাদের প্রত্যেকের চলাফেলা উঠাবসা মানুষকে ইসলামের পথ দেখাচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসার প্রতিনিধিত্বশীল বোর্ডগুলোকে তাদের পাঠ্যসূচিকে যুগোপযোগী করতে পারলে,সেখানকার আলেমগণ জাতীয় র্পযায়ে আরো বেশী অবদান রাখতে পারতেন । কয়েক বছর যাবত দেশে কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার সনদের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য সংশ্লিষ্টরা আন্দোলন করে আসছেন। কিন্তু  আওয়ামীলীগ ও বিএনপির কোন সরকারই কওমী সনদের স্বীকৃতি দেয়নি। বহুকাল থেকে চলে আসা পুরোনো সিলেবাসকে কোন সরকারই মানতে নারাজ,অপর দিকে কওমী ধারার উলামায়ে কেরামের বিশাল একটি অংশ সেলেবাস পরির্বতনে নারাজ। সিলেট কেন্দ্রীক মাদ্রাসা শিক্ষা র্বোড আযাদ দীনী এদারায়ে তালিমের পক্ষ থেকে ও কওমী সনদের দাবী দীর্ঘ দিনের।