Quantcast
ঢাকা, বুধবার 21 March 2012, ৭ চৈত্র ১৪১৮, ২৭ রবিউস সানি ১৪৩৩
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ১৩৬০ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

জাতীয় সংসদে খালেদা জিয়ার হুঁশিয়ারি

বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করতে হবে

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ভাষণ দেন বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া

সংসদ রিপোর্টার : জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গতকাল জাতীয় সংসদে বলেছেন, কোন প্রকার ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে লাভ হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া এদেশে কোন নির্বাচন হবে না। তিনি বলেন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে সমঝোতার মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন দিতে হবে। তিনি বলেন, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর আস্থার সংকট জিইয়ে রেখে দলীয় সরকারের অধীনে কোন নির্বাচন  এদেশে করতে দেয়া হবে না। এছাড়া  ৮৬ সালের মতো এরশাদকে নিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টা করা হলে সেই নির্বাচন দেশবাসী মেনে নেবে না। আর বিএনপিকে বাদ দিয়ে সাজানো কোন নির্বাচনও দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করবে। ইভিএম পদ্ধতিতেও কোন নির্বাচন মেনে নেয়া হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি সম্প্রতি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বিজয়ের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান। 

বেগম জিয়া বলেন, সরকার বিরোধী দলকে কোন দায়িত্বই পালন করতে দিচ্ছে না। এই সরকার সবক্ষেত্রেই ব্যর্থ তারা মানুষের জন্য কোন কিছুই করতে পারেনি। তিন বছর ধরেই দেশে এক হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে। বিরোধী দল আজ সংসদের ভেতরে যেমন আক্রান্ত হচ্ছে একইভাবে সংসদের বাইরেও বিরোধীদলকে আক্রান্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সংসদে জনগণের কল্যাণের কোন সমস্যা নিয়ে কথা বলা হয় না। বিরোধী দল সংসদের বাইরে থাকলেও তাদের নিয়ে গালমন্দ করা হয়। তিনি ৭২ থেকে ৭৫ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ আমলের নানা অপকর্মের কথা তুলে ধরেন। এছাড়া দীর্ঘ ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ আবারো যেসব অপকর্ম শুরু করে  তারও ফিরিস্তি তার এক ঘন্টা ৫৩ মিনিটের বক্তব্যে তুলে ধরেন বেগম জিয়া।

বেগম জিয়া বলেন, ৪০ বছর আমাদের স্বাধীনতার বয়স। এই সময়ের মধ্যে তারা কতটুকু সফল হয়েছে তার আলোচনা দরকার। আমরা কতটুকু এগিয়েছি তার আলোচনা করা দরকার। রাস্তার অবস্থা কি তা সবাই জানে। আজ দেশের অবস্থা যেমন ভালো নেই তেমনি মানুষের অবস্থাও।

এ সরকার দেশ ও মানুষের জন্যেই কিছুই করেনি। তাদের শরীক এরশাদ বলেছিল, মহাজোট সরকারের তিন বছরের আমলে দেশে হাহাকার শুরু হয়েছে। বিরোধী দল হিসেবে আমরা সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে সহযোগিতা করতে চেয়েছি। কিন্তু আমাদের তা করতে দেয়া হয়নি। স্পিকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এই সংসদকে আপনি মাছের আখড়া বলেছেন। আসলেই তাই। এখানে সমস্যা নিয়ে কথা বলা হয় না। বিরোধী দলকে গালাগালি করাই যেন মূল কাজ। আমরা না থাকলেও গালাগালি হয়। মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী সবাই খারাপ কথা বলেন। এতে নতুনরাও আক্রান্ত হন। বিরোধী দলকে কথা বলতে সুযোগ দেয়া হয় না। তিনি বলেন, এই সরকার আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে কিভাবে বাধা দিয়েছে তা আপনি দেখেছেন। বিরোধী দলীয় চীফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুককে কিভাবে আহত করা হয়েছে তাতে প্রতিটি সংসদ সদস্যকেই অপমাণিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমাদের কর্মসূচি পাললের সময় আ,লীগের গুন্ডাবাহিনী নির্যাতন করেছে। এমনকি মহিলা এমপিদের লাঞ্চিত করেছে। আমি আহবান জানাবো যেন এভাবে নির্যাতন করা না হয়।

তিনি বলেন, এই সংসদের আমলে সংসদ সদস্যরা মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হচ্ছে। তাদের ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। এই হলো সরকারের আচরণ। এই সংসদে আমরা জনগণের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারি না। সংবিধানে থাকলেও চুক্তি নিয়ে সংসদে তা নিয়ে আলোচনা হয় না। শুধু আমরা নই এই চুক্তির বিষয়ে সরকারি দলেরও কেউই জানে না। সংবিধান অনুযায়ী বিদেশীদের সাথে চুক্তি হলেই সেটা সংসদে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু সেটা করা হয়নি।

তিনি বলেন, আমরা দেশের স্বার্থকেই সবার আগে দেখবো। বর্ডারে আমাদের নাগরিকদের পাখির মতো গুলী করে হত্যা করা হচ্ছে। তার কোনো প্রতিবাদ করা হয় না। ফেলানীর লাশ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে । এরও কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি। চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ অন্যান্য এলাকায় একের পর এক হত্যা করেই চলেছে অথচ আমাদের সরকার তার প্রতিবাদ করে না। বিএসএফ বলেছে, তারা হত্যা করেই যাবে। সরকারের কাছে জানতে চান, এটা কি বন্ধুত্বের নমুনা। এমন বন্ধুত্ব আমরা চাই না। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা প্রতিবাদ করুন। আমরা আপনাদের সহযোগিতা করবো। আমরা দেশের স্বার্থে সবসময় এক থাকতে চাই।

এ সময় সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা হৈচৈ শুরু করে। স্পিকার সবার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে  বলেন, মাননীয় বিরোধ দলীয় নেতা আপনি আপনার বক্তব্য চালিয়ে যান। এরপরও সরকারি দলের সদস্যরা হৈচৈ করতে থাকে।

বেগম জিয়া বলেন, আমরা যখন ক্ষমতায় আসি তখন মোটা চালের দাম ছিলো ১৬ টাকা। কিন্তু এখন মোটা চালের দামও ৪০ টাকার কম নয়। গত তিন বছরে সব জিনিসপত্রের দামই কয়েকগুণ বেড়েছে। তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া। কিন্তু সরকার এখানে সম্পূর্ণ ব্যথতার পরিচয় দিয়েছে। তারা ব্যস্ত লুটপাট আর লুটপাট নিয়ে।

তিনি বলেন, মঈন -ফখরুদ্দীনরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। তারা হচ্ছে অবৈধ সরকার। তারা ২ বছরে দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অনেক দিন থেকেই গ্রামের মানুষ ফুটপাতে ব্যবসা করে। এ নিয়ে তাদের সংসার চলে। কিন্তু এই অবৈধ সরকার সব কিছু ছারখার করে দিয়েছে। এরা মানুষকে ভিক্ষুক বানিয়ে দিয়ে গেছে।  ২ বছরে তারা দেশকে ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছিল।

তিনি বলেন, এই আ'লীগ নির্বাচনের আগে বলেছিল, তারা নির্বাচিত হলে বিনামূল্যে সার, ঘরে ঘরে চাকরি দিবে, ১০ টাকায় চাল দিবে। কিন্তু তারা কিছুই করতে পারেনি। গরীব মানুষ না খেয়ে বেঁচে আছে। শিশুরা না খেতে পেরে পুষ্টিহীন হয়ে বেড়ে উঠছে। এদের দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। এখন দেশে দারিদ্রে্যর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। সময় এসেছে সব কিছু ক্রয় ক্ষমতায় নিয়ে আসা। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সরকারের ক্ষমতার তিন বছর পর প্রত্যেকটা জিনিসের দাম এখন ৩ গুণ হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের সরকারের সময়ে শেয়ারবাজার নিয়ে কোনো কেলেংকারি হয়নি। আ'লীগ ক্ষমতায় আসলেই কেন কেলেংকারি হয়। ৯৬ সালে হয়েছে এবারো হয়েছে। এবার ৯৬ সাল থেকেও বড় কেলেংকারি হয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছে। ৩৩ লক্ষ বিনিয়োগকারি প্রতিবাদ করতে চয়। কিন্তু সরকার তাও করতে দেয় না। সর্বস্ব হারিয়ে ৩ জন বিনিয়োগকারি ইতোমধ্যে আত্মহত্যা করেছে। এই লুটপাটের ঘটনা তদন্তের জন্যে একটি কমিটি করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, জড়িতদের নাম বলতে পারবেন না । প্রশ্ন উঠেছে, আজ তাহলে গরীব মানুষের টাকা লুটেপুটে খেয়েও কি তারা পার পেয়ে যাবে? এ জন্য তারা এ সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।  তারা এখন অন্য কিছু ভাবতে শুরু করেছে।

তিনি বলেন, এই সরকার বিনামূল্যে সারতো দূরের কথা। এখন সারের দাম বস্তা প্রতি ১১৬০ টাকা। যা বিএনপির আমলের চাইতে কয়েকগুণ বেশি। তিনি বলেন, গ্যাস সরবরাহের ভয়াবহ অবস্থা। দেশ জুড়ে তীব্র সংকট। এলসি গ্যাসের দাম দ্বিগুণ। এর ফলে চালু করা যায়নি লক্ষাধিক কারখানা। ফলে চাকরি হচ্ছে না অনেক বেকারের। কলকারখানা না হওয়ায় প্রতিনিয়ত বেকারত্ব বাড়ছে। সংসদ নেতা বলেছেন, আমাদের আমলে নাকি এক মেগাওয়াট বিদ্যুত জাতীয় গ্রীডে সংযোজন করা হয়নি। অথচ আমাদের সময় বিদ্যুত উৎপাদন বেড়েছিল ৪ হাজার মেগাওয়াট। তিনি বলেন, বিদ্যুত সমস্যার সমাধানে আমরা আরো অনেক প্রকল্প হাতে নিয়েছিলাম। আমাদের প্রকল্পগুলো বাদ না দিলে বিদ্যুতের সমস্যা হতো না। মানুষের এতো কষ্ট হতো না। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বিদ্যুত খাতকে হরিলুটের ক্ষেত্র বানিয়েছে। কুইকরিন্টালের নামে কুইক মানিকাটার ব্যবস্থা করেছে। এজন্যে দেশের মানুষের ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সবে মাত্র গরম শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে বিদ্যুৎ নেই বললেই চলে। বিদ্যুত না থাকায় অনেক শিল্প মার খাচ্ছে।  তিনি বলেন, আগে শুক্রবারে বিদ্যুৎ কম যেত। এখন শুক্রবারেও বিদ্যুত থাকে না। তিনি বলেন, শহরে বিদ্যুতের অবস্থা খুবই খারাপ। আর এখন গ্রাম দেশে তো বিদ্যুত নেই বললেই চলে। আজ মতিঝিলে ৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ ছিল না।

খালেদা জিয়া বলেন, এই সরকার ভারতকে ট্রানজিটের নামে করিডোর দিচ্ছে। সরকার বলেছিল এটা হলে নাকি দেশ সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে। আমরা জানতে চাই, বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে।  আমরা তো দেখছি, দেশ পেছনের দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বন্দরে আমাদের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। কিন্তু এই বন্দরও ভারতকে ব্যবহার করতে দেয়া হচ্ছে। অথচ আমরা এই ব্যবহার সুযোগ দিয়ে কিছুই পাচ্ছি না। অন্যদের দিয়ে যদি কোনো শুল্ক না পাই তাহলে কি  লাভ। তিনি বলেন, এই সরকার নিজেদের স্বার্থ না দেখে অন্যদের কেন বন্দর ব্যবহার করতে দিচ্ছে তা সবাই জানতে চায়। আমরা জানতে চাই কার স্বার্থে এটা করা হচ্ছে।

খালেদা জিয়া বলেন,  টিপাইমুখ বাঁধ হলে বাংলাদেশে একটি ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিবে। ফারাক্কার ফলে এমনিতেই দেশ মরুভূমি হয়ে গেছে। টিপাইমুখে বাঁধ হলে পুরো দেশ মরুভূমি হয়ে যাবে। হাওর-বাঁওড় সব শুকিয়ে যাবে। ভূমিকম্পে যদি বাঁধ ভেঙ্গে যায় তাহলে সিলেট এলাকার কোনো চিহ্ন থাকবে না। তিনি বলেন, আমরা বারবার এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে এর প্রতিবাদে চিঠি দিয়েছি। আমরা বলেছি দুই দেশের এক্সপার্টদের রিপোর্ট ছাড়া এটা করা যাবে না। কিন্তু সরকার এটা না করে সংসদের একটি কমিটি পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, এই টিপাইমুখ বাঁধ বন্ধে আমরা আপনাদের সহযোগিতা করবো। আমরা ভারতের আন্তঃনদী সংযোগে উদ্বিগ্ন। তারা ৫৪টি নদীর ওপর বাঁধ দিচ্ছে। আমরা পানির ন্যায্য হিস্যা চাই।  তিস্তার পানি বণ্টন ব্যবস্থা এখন বন্ধ হয়ে গেছে। তিস্তার পানি আমাদের ন্যায্য অধিকার। সরকারকে তিনি বলেন,  আপনারা আওয়াজ তুলুন। আমরা আপনাদের পাশে আছি।

সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, দেশে আইন-শৃক্মখলা বলতে কিছুই নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন নাকি  দেশ অনেক ভালো। অথচ প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায়,  হত্যা, অপহরণ, গুম অবাধে চলছে। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, বেডরুম পাহারা দিতে পারবেন না। পাহারা না দেন কিন্তু খুনীদের তো ধরতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাগর-রুনি হত্যাকারীদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের ঘোষণা দেন। কিন্তু পারেননি। আমরা কি বলবো, গ্রেফতার করতে পারেননি নাকি বলবো ধরে পাচার করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিদেশী কূটনৈতিক হত্যা হয়। আজ বিদেশীদের সাথে আমাদের সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে । পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশেষে সৌদি আরব গিয়েছেন। জানি না তিনি কি করতে পারবেন। তিনি বলেন, বিদেশী কূটনীতিক হত্যার বিচার না হলে বিদেশ থেকে আমাদের লোকজন ফিরে আসবে। যদি এসব লোক ফিরে আসে তাহলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে। আমি অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানাই।

ছাত্র লীগের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা কি তাদের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নমুনা। স্পীকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, যদি সংসদে কথা বলা না যায় তাহলে এসে কি লাভ। আমরা অনেকগুলো প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু কোনো নোটিশ আপনি গ্রহণ করেননি। তাহলে কি আমরা সরকারে গুণকীর্তন নাকি গালাগালি শুনতে আসবো। বিরোধ দলের নেতা হিসেবে আমাকে কিছু সুযোগ দিবেন তা হবে না। অন্যদের সুযোগ দিতে হবে। অন্যদের ইচ্ছা ছিল সকলেই কিছু কথা বলবে। কিন্তু তাদের কথা বলতে দেয়া হলো না। ২৯ তারিখ পর্যন্ত সংসদ চলবে বলেছেন কিন্তু এখন বলছেন রাষ্ট্রপতির ওপর আলোচনা শেষ। এটা কি ডাবল স্ট্যান্ড নয়?

তিনি বলেন, আদালতে বিচার হচ্ছে দুই রকম ভাবে। বিরোধীদল ও সাধারণ মানুষের জন্য এক রকম। আর সরকারি দলের জন্য অন্য রকম। তিনি বলেন, আদালতে গেলে বিরোধী দলের নেতাদের জেলে পাঠানো হয়। জামিন দেয়া হলেও জেলগেট থেকে আবারো গ্রেফতার করা হয়। এমন অভিযোগে মামলা দেয়া হয় যা সংসদ সদস্যদের জন্য অপমানকরও। মোবাইল চুরির মামলা দেয়া হয়। ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন, মুখ দেখে রায় দেয়া হয়। তিনি বলেন, আজ দলীয় বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ফলে আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। বিচারপতিরা এমন বক্তব্য দেন তাতে মনে হয় তারা রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। তারা যদি রাজনীতি করতে চান তাহলে তাদের রাজনীতি করা উচিত।

খালেদা জিয়া বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বিশ্বাস করি। রোড মার্চে লাখ লাখ মানুষ যোগ দিয়েছিল। ঢাকার গণমিছিল দেড় মাস আগে ঘোষণা করেছি। এটা দেখে সরকারি দল কর্মসূচি ঘোষণা করে। ফলে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু প্রশাসন এখানে নিরপেক্ষতা বজায় রাখেনি। আমরা গত ১২ মার্চ চলো চলো ঢাকা চলো কর্মসূচি দিয়েছি। কিন্তু সরকার এটাকে বন্ধ করার জন্যে তিন দিন ধরে অঘোষিত হরতাল ঘোষণা করেছে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ এমনকি হোটেল পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হলো। এ কেমন আচরণ। এটা কি গণতান্ত্রিক সরকারের নমুনা? তিনি বলেন, এটা ফ্যাসিস্ট সরকারের আচরণ ছিল। সেদিন ছাত্রলীগ যুবলীগের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়েছিল। তারা আমাদের নেতাকর্মীদের উপর হামলা করে সমাবেশ বন্ধ করতে চেয়েছিল।  কিন্তু তারা সেটি পারেনি। এই সমাবেশ মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। আমাদের মহাসমাবেশ টেলিভিশনে সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হলো। এটা কি ডাবল স্ট্যান্ড নয়? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোনো বাধা দেয়া হবেনা। বাধা দেয়া হয়নি।

তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনী শুধু সরকারি দলের লোকদের মিছিল পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়। এই বাহিনীকে সরকার দলীয় বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে। কয়েকদিন আগেএকজন পুলিশকে গুলী করা হয়েছে। এটা করেছিল সরকার দলীয় ক্যাডাররা। তারা এখন নিরাপদ নয়। পুলিশের গাড়ি হাইজ্যাক করা হচ্ছে। পুলিশ নিরাপদ না থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়। তিনি বলেন, এখনো রাতের বেঘরে ঢুকে পুলিশ বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে। আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে। এভাবে করতে থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। এর দায়দায়িত্ব কিন্ত আপনাদের। সরকার যদি ভালো কাজ করে তাহলে আমরা সহযোগিতা করবো।  পিলখানা হত্যার সময় আমরা বলেছি সহযোগিতা করবো। কিন্তু আমাদের ডাকা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে আমরা  বলেছিলাম জাতীয় স্বার্থে অটুট থাকুন, জলবায়ু সম্মেলনে যাবার আগে আমরা একটি সেমিনার করেছিলোম। সরকার সেখান থেকে সহযোগিতা নিতে পারতো।

তিনি বলেন, সংসদ আজ অকেজো। সরকারি দলের অনেক সদস্য, তারপরও কোরাম সংকট। এতে বুঝা যায় এই সংসদে সদস্যদের আগ্রহ নেই। এখানে যদি কথা বলতে দেয়া না হয় তাহলে কারোই কথা বলার আগ্রহ থাকবে না। তিনি বলেন, দেশ আজ ব্যাপক সংকটে। দেশের মানুষ চায় সার্বিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে। জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পথ খোলা রাখতে হবে।

তিনি বলেন, প্রতিদিন মৃত্যু ঘটছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের। ধরে নিয়ে যাচ্ছে সাদা পোশাকধারীরা। অবস্থা এমন হয়েছে যে, জনগণের মধ্যে প্রবলভাবে ভীতি-আতংক ছড়িয়ে পড়েছে এবং নিরীহ মানুষেরাও আজকাল সহজে বাড়ির বাইরে যাচ্ছেন না। এটাই স্বাভাবিক। কারণ, কাকে কখন গুম করা হবে তা জানা নেই কারো। গুপ্ত হত্যার শিকারদের তালিকায় অনেকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢাকার নির্বাচিত কমিশনার চৌধুরী আলম ও ঝিকরগাছা বিএনপির সভাপতি ও যশোর জেলা বিএনপির অর্থবিষয়ক সম্পাদক নাজমুল ইসলামের নামও কিন্তু প্রায় দুই বছর আগে চৌধুরী আলমকে গ্রেফতার করা হলেও আজও তার কোনো হদিস মেলেনি। দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষের মধ্যে কেবল নয়, বিদেশেও- এমনকি সরকারি পর্যায়েও এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটতে এবং গুপ্তহত্যার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। যেমন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এমনকি বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের গত সরকারের আমলেই দেশে জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হয়। সে সময় রাজনৈতিক দলের সভা, যশোরে উদীচির সম্মেলন, রমনার বটমূলে বর্ষবরণসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বোমাবাজি করে অনেক মানুষকে হতাহত করা হয়। তখন আওয়ামী লীগ সরকার প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করেছিল। আমাদের দলের সিনিয়র রাজনীতিবিদ তরিকুল ইসলামকে পর্যন্ত তারা জেলে পাঠায়। আমরা সরকার গঠন করার পরে জঙ্গিদের সব শীর্ষ নেতাকে আটক করে তাদের বিচারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত করতে সক্ষম হই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই মেয়েদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়।

খালেদা জিয়া বলেন, গত তিন বছরের এইসব ব্যর্থতা ও অপকর্মের কারণে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন আজ শূন্যের কোঠায়। তারা জানে সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তাদের ক্ষমতায় ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তাই তারা ছলে-বলে, কলে-কৌশলে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। আজ এই সংসদে দাঁড়িয়ে সকল বিরোধীদল এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পক্ষ থেকে আমি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই যে, পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের বিদ্যমান বাস্তবতায় আমরা কোনো দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো না। নির্বাচন কমিশনও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিতর্কিত ইভিএম মেশিনের ব্যবহার আমরা মেনে নেবো না। জার্মানিতে এই পদ্ধতি নির্ভরযোগ্য নয় বলে এর ব্যবহার সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাজ্য, জাপান, ভারত ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার করে না। আয়ারল্যান্ড ২০০৬ সাল থেকে ইভিএম পদ্ধতি ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। মার্চ, ২০০৯ সাল থেকে জার্মানি ইভিএমের ব্যবহারকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে। ফিনল্যান্ডের সর্বোচ্চ আদালত ২০০৯ সালে মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনে ব্যবহৃত ইভিএমের ফলাফল ইনভ্যালিড ঘোষণা করেছে। এপ্রিল, ২০০৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইভিএমের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটের ফলাফল পাল্টানো সম্ভব। কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, ইভিএম ‘হ্যাক' করে অনায়াসে ভোট চুরি করা যায়। এই বিতর্কিত মেশিনে ভোট করার ব্যাপারে অতি আগ্রহ দেখেই মানুষ বুঝতে পারে তাদের আসল মতলব কী। আমার কথা হচ্ছে, গণতন্ত্রকে টেকসই করতে হবে। গণতন্ত্র হচ্ছে গায়ের জোরের নয়, সমঝোতার শাসন।

তিনি বলেন, সমঝোতার সব পথ বন্ধ করে বর্তমান সরকার গায়ের জোরে সবকিছু করতে চাইছে। এতে গণতন্ত্র টিকবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী আন্দোলন করেছে। আর আজ তারা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই। দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। বাংলাদেশের মানুষ এটা মেনে নিবে না। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন চায়। এটা শুধু বিরোধী দলের নয়, আজ এটা জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। কাজেই নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে। কাজেই ছল-চাতুরী করে কোনো লাভ হবে না। আমরা রাজপথে মহাসমাবেশ করে এই জনদাবি তুলে ধরেছি। এর জন্য সরকারকে ৯০ দিনের সময়সীমা দিয়েছি। আজ সংসদেও আমরা একই দাবি তুলে ধরলাম। আমি আশা করি, সরকার সমঝোতার পথে সমস্যার সুরাহা করবে। আমাদেরকে আন্দোলনের পথে ঠেলে দেবেন না।  আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সেই একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলবো। বাংলাদেশে একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে বলে আমরা মনে করি না।

খালেদা জিয়া বলেন, সমুদ্রসীমার মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশ সফল হয়েছে।  এর জন্য আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও ধন্যবাদ দিচ্ছি। সরকারপ্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রীকেও আমি ধন্যবাদ দিতে চাই। সরকার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আমি আশা করবো, সকল ক্ষেত্রেই সরকার অতীতের সাফল্যের ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে। আমরা কেউ ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নই। সকলে এক হয়ে কাজ করলে দেশ-জাতির সমস্যা ও সংকট নিরসন সহজ হয়। এর জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংযম ও সহনশীলতা প্রয়োজন। আশা করি, সরকারি দলের নেতারা বিষয়টি মনে রাখবেন।

%sqZ420@