Quantcast
ঢাকা, রোববার 6 MAY 2012, ২৩ বৈশাখ ১৪১৯, ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৩৩
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৭৫ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » শেষের পাতা

চাষীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসার উপক্রম

মওসুমের শুরুতেই খুলনাঞ্চলে চিংড়িতে মড়ক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ব্যাহত হবার আশংকা

আব্দুর রাজ্জাক রানা : মওসুমের শুরুতে খুলনাঞ্চলের চিংড়ি ঘেরে হোয়াইট স্পট ভাইরাসে বাগদা চিংড়ি ঘেরে মড়ক লেগেছে। ইতোমধ্যে ২০ শতাংশ ঘের ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের ভাইরাসের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য এবার অনেকেই বেশি করে বাগদার চাষ শুরু করেন। অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আবার কেউ মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে ঘের করে বাগদার চাষ করেন। আবার কোন কোন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী অন্যের জমি লীজ নিয়েও চিংড়ি চাষে সম্পৃক্ত হয়েছেন। এ অবস্থায় এ খাতে তাদের লগ্নি করা মোটা অংকের টাকা কিভাবে ওঠাবেন তা নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীদের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। মওসুমের শুরুতেই ঘেরে বাগদা চিংড়ি মারা যাওয়ার ব্যাপকতা বেশি হওয়ার কারণে চাষীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। তবে মৎস্য অফিস জানিয়েছে, সনাতন পদ্ধতিতে চাষ এবং পরিবেশগত সমস্যার কারণে চিংড়ি ঘেরে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মড়ক লেগেছে। তিনি চাষীদের সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে গুচ্ছ খামারের মাধ্যমে চিংড়ি চাষের পরামর্শ দিয়েছেন। চিংড়ি ঘের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিংড়ি মারা গেলে চাষীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও ব্যাহত হবে বলে তারা জানান।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি চাষের জন্য দেশের মধ্যে খুলনা জেলার অবস্থান অন্যতম। জেলার ৯টি উপজেলাতেই চিংড়ি চাষ হয়। এপ্রিলের মাঝামাঝি হতে জুন পর্যন্ত চিংড়ি চাষের মওসুম। চলতি মওসুমে জেলায় ৫০ হাজার ৫৪৬ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়েছে। এরমধ্যে ৩৬ হাজার ৪২৭ হেক্টর জমিতে বাগদা এবং ১৪ হাজার ১০৭ হেক্টর জমিতে গলদা চিংড়ি রয়েছে। এর সাথে সরাসরি জড়িত রয়েছেন প্রায় তিন লাখ চাষী। জেলার বিভিন্ন বাগদা ঘেরের চিংড়িতে দেখা দিয়েছে ভাইরাস। চাষিরা জানিয়েছেন, হোয়াইট স্পট নামে এক ধরনের ভাইরাসে চিংড়ি মরছে। মওসুমের শুরুতে ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে চিংড় মরায় চাষিরা রয়েছে উদ্বিগ্নের মধ্যে ভাইরাস নাকি অন্য কোন কারণে চিংড়ি মরছে এ ব্যাপারে মৎস্য অফিস নিশ্চিত না হলেও চিংড়িতে মড়কের কথা স্বীকার করেছে।

স্থানীয় চিংড়ি চাষীরা জানান, ভাইরাসের কারণে ঘেরে মাছ মরে মরে ভেসে উঠছে। ঘেরের ভেড়ির পাশে লালচে আকার ধারণ করে মরা মাছ পড়ে থাকছে। আবার যে সামান্য পরিমাণ জীবিত মাছ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো অধিকাংশই দুর্বল। এগুলো নড়াচড়া করতে না পেরে মাটির সঙ্গে মিশে থাকছে। এ অবস্থায় চাষীরা আবারো নতুন করে পোনা ছাড়ার কথা ভাবছেন। শেষ পর্যন্ত এ খাতে চাষীদের পুঁজি উঠবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কয়েকজন ঘের ব্যবসায়ী জানান, তাদের ঘেরেও ভাইরাসের কারণে অধিকাংশ বাগদা চিংড়ি মরে গেছে। এ অবস্থায় এ খাতে তাদের লগ্নি করা মোটা অংকের টাকা কিভাবে ওঠাবেন তা নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষীদের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। মওসুমের শুরুতেই ঘেরে বাগদা চিংড়ি মারা যাওয়ার ব্যাপকতা বেশি হওয়ার কারণে চাষীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে বিভিন্ন কারণে বাগদা চিংড়ি মারা গেলেও এবার ভয়াবহ তাপমাত্রার জন্যই ঘেরে ব্যাপকহারে ভাইরাস দেখা দিয়েছে এবং এতে মাছ মরে যাচ্ছে। এ ছাড়া মওসুমের শুরুতে ঘের প্রস্তুত করার সময় চাষীরা ঘেরের মাটি ঠিকমতো শুকাতে পারেনি। জমির ব্যাকটেরিয়া মারার জন্য যে পরিমাণ চুন ব্যবহার করার দরকার তাও ঠিকমতো দেয়া হয়নি। এ ছাড়া বৃষ্টি না হওয়ার কারণে ঘেরে পানি কম থাকায় সূর্যের প্রচন্ড তাপে পানি গরম হয়ে ঘেরে একপ্রকার শ্যাওলা জন্মায়। এ শ্যাওলা পচে পানিতে অক্সিজেনের অভাব তৈরি করে। যার কারণে মাছ মারা যাচ্ছে। ঘেরে অতিরিক্ত পানি রাখা, নিয়মিত ফরমুলেটেড ফিড সরবরাহ না করা, পানি পরিবর্তন ও বায়ু সঞ্চালনের ব্যবস্থা না করার কারণেও মাছ মরে যায়। এব্যাপারে খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রফুল্ল কুমার সরকার দাবি করেন, পরিবেশগত সমস্যা এবং সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করায় বাগদা ঘেরে মড়ক লেগেছে। তিনি চাষীদের সনাতন পদ্ধতি বাদ দিয়ে গুচ্ছ খামারের মাধ্যমে চিংড়ি চাষের পরামর্শ দিয়েছেন। চিংড়ি ঘের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিংড়ি মারা গেলে চাষীরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনও ব্যাহত হবে। তিনি চাষীদের দাবি ভাইরাস প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিছুটা ভিন্নমত পাওয়া গেল আর এক মৎস্য ব্যবসায়ীর কাছ থেকে।

ফুলতলা উপজেলার গাড়াখোলার চিংড়ি ব্যবসায়ী নিলু মোল্লা এ বছর ৫ বিঘা জমিতে গলদা চিংড়ি চাষ করেছেন। স্থানীয় মাছের বাজারে চিংড়ির ভাল দাম আছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার এ পর্যন্ত গলদা বিক্রি করে ৫ লাখ টাকা আয় হয়েছে। তিনি জানান, তার এলাকায় এ ভাইরাসের তেমন প্রভাব পড়েনি। তবে এ বিষয়ে দৌলতপুরের গলদা চিংড়ি চাষী এমএইচকে সৈকত বলেন, এ বছর তিনি ৩ একর জমিতে গলদা চাষ করেন। তিনি বলেন, তবে অসময়ে বৃষ্টির কারণে অনেক চিংড়ি পানির সাথে ভেসে চলে গেছে। তারপর আবার চিংড়িতে এ ভাইরাস দেখা দেয়ায় এ বছর ব্যবসায় লাভের আশা থাকছে না। আসলটা তুলতে পারলেই এখন রক্ষা।

এদিকে মংলা উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানিয়েছে, এ উপজেলায় ১২ হাজার ৫০০ হেক্টর কৃষি জমির মধ্যে ১০ হাজার ৮৯৫ দশমিক ৭২ হেক্টর জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়ে থাকে। এ পরিমাণ জমির মধ্যে ছোট-বড় মিলিয়ে ঘেরের সংখ্যা ৫ হাজার ৩৮১ টি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিংড়ি চাষের ঘেরগুলোতে ব্যাপক হারে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় চাষীদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। জানা গেছে, মংলা এলাকায় প্রায় ২ যুগ ধরে বাগদা চিংড়ি চাষ হয়ে আসছে। বাগদা চাষে স্বল্প সময়ে অধিক লাভবান হওয়ার কারণে চাষীরা দিনকে দিন চিংড়ি চাষে ঝুঁকে পড়ে।  চিংড়ি চাষীরা বিগত কয়েক বছরের ভাইরাসের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য এবার অনেকেই বেশি করে বাগদার চাষ শুরু করেন। অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আবার কেউ মহাজনদের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে ঘের করে বাগদার চাষ করেন। আবার কোন কোন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী অন্যের জমি লীজ নিয়েও চিংড়ি চাষে সম্পৃক্ত হয়েছেন।

মংলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান চিংড়ি ঘেরে বাগদা মাছ মারা যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও ভাইরাসের কারণেই যে মারা যাচ্ছে তা স্বীকার করেননি। তার মতে, মূলত এবারের প্রচন্ড তাপমাত্রা ও অবকাঠামোগত ত্রুটির কারণে কিছু মাছ মরে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবেশগত কারণে মাছ মরে গেলেও একশ্রেণীর লোক নানাভাবে অপপ্রচার চালিয়ে এখাতের ক্ষতি করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। তবে তিনি এ দাবদাহ অব্যাহত থাকলে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে চিংড়ির ফলন কম হওয়ার আশংকা করেছেন।