|
|
মহানগর আমীর মাওলানা শামসুল ইসলাম এমপিকে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে
চট্টগ্রামে অর্ধদিবস হরতাল পালিত
চট্টগ্রাম অফিস : জামায়াতে ইসলামী চট্টগ্রাম মহানগর আমীর মাওলানা শামসুল ইসলাম এমপিকে কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী আহূত অর্ধদিবস হরতাল গতকাল বুধবার চট্টগ্রামে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে। তবে কোথাও কোনো বড় ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। হরতাল চলাকালে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল ও পিকেটিংয়ের অভিযোগে পুলিশ ২১ জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবির কর্মীকে আটক করেছে।
হরতালের সময় চট্টগ্রামে সব কিছু বন্ধ ছিল। বিপণী কেন্দ্র, বড় বড় মার্কেটসহ দোকানপাট বন্ধ ছিল। রিকশা, কিছু সিএনজি টেক্সী ও পুলিশের গাড়ী ছাড়া কিছুই চলেনি। দূরপাল্লার যানবাহন এবং বিভিন্ন উপজেলা থেকে চট্টগ্রাম শহর অভিমুখী যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি অফিস, ব্যাংক, বীমা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খোলা থাকলেও উপস্থিতি ছিল কম, লেনদেন হয়নি। স্কুল, কলেজ, মাদরাসাসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন ক্লাস ও পরীক্ষা হয়নি। রেল ও বিমান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। হরতালের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে জাহাজ থেকে পণ্য উঠানামা স্বাভাবিক থাকলেও পণ্য নিয়ে কোন ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান জেটির বাইরে যেতে পারেনি।
চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে হরতাল পালনের দৃশ্য দেখা গেছে। সকাল থেকে নগরীর সর্বত্র পুলিশ, এপিবিএন, র্যাব, দাংগা পুলিশ কড়া সতর্ক প্রহরায় ছিল। হরতালে নগরীতে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১হাজার সাতশ পুলিশের সমন্বয়ে ৬৫ প্লাটুন পুলিশ মোতায়েন ছিল।
হরতালের সমর্থনে নগরীর আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এলাকা, ষোলশহর দুই নম্বর গেইট, বৌদ্ধ মন্দির মোড় এলাকায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা মিছিল করেছে। হরতাল চলাকালে সকাল আটটায় নগরীর মুরাদপুর ও চকবাজার এলাকা থেকে পাঁচ শিবিরকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এরপর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের সামনে থেকে আরও চারজনকে আটক করে পুলিশ। এছাড়া চান্দগাঁও এলাকা থেকে আরও ১০ জনকে আটক করা হয়। কোতয়ালী থানা পুলিশ চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের সামনে থেকে দুইজন শিবির কর্মীকে আটক করেছে। তবে নগরীর কোথাও বড় ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (পাঁচলাইশ জোন) শরীফুল হাসান জানান, রাস্তায় মিছিল এবং পিকেটিং করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ২১ জনকে আটক করা হয়েছে। তিনি জানান, চান্দগাঁওয়ের আউটার সিগন্যাল ও চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা থেকে ১০ জন এবং পাঁচলাইশের প্রবর্তক মোড় ও ষোলশহর ২ নম্বর গেট থেকে ৮ জনকে আটক করা হয়।
ছাত্রশিবির উত্তরের নেতারা জানান, সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে জামায়াত ও শিবিরের খন্ড খন্ড মিছিল এবং নেতা-কর্মীদের রাজপথে মজবুত অবস্থানের প্রেক্ষিতে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল সমাপ্ত হয়েছে। মিছিলোত্তর সমাবেশে নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে শামসুল ইসলাম এমপিসহ অন্যায়ভাবে গ্রেফতারকৃত জামায়াতের আমীর ও সকল নেতাকর্মীর নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানান। অন্যথায় ছাত্রশিবির আপামর জনতাকে সাথে নিয়ে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদী এই সরকারের পতনের আন্দোলন জোরদার করতে বাধ্য হবে। স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালন করার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরী উত্তর সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য মুহাম্মদ ইসমাঈল বীরচট্টলাবাসীর প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে আগামী দিনের সকল কর্মসূচিতে এভাবে অংশ গ্রহণ করে জালিম সরকারের পতন ঘটানোর আহবান জানান।
হরতালের সমর্থনে নগরীতে শিবিরের মিছিল, সমাবেশ-হরতালের সমর্থনে নগরীর বিভিন্ন স্থানে মিছিল সমাবেশ করেছে নগর উত্তর শিবির। এতে নেতৃবৃন্দ বলেন- সরকারের জুলুম-নির্যাতনের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। নির্যাতিত জনতার ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছে। রাজপথে থেকে গণতন্ত্রের লেবাসে ক্ষমতায় আসা ফ্যাসিস্ট সরকারের সকল অপকর্ম প্রতিহত করতে হবে। দেশের মানুষকে দানব সরকারের দুঃশাসন থেকে মুক্ত করতে ছাত্র জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, এ অবৈধ সরকার দ্রুত বিচার আইন নামক কালো আইনকে হাতিয়ার বানিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে দলীয় ক্যাডার বাহিনীর মতো ব্যবহার করে জামায়াত-শিবিরসহ ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের ওপর গ্রেফতার নির্যাতন চালাচ্ছে। সরকারের আস্কারা পেয়ে পুলিশ সাক্ষাৎ আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ জনগণসহ সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। আদালত এলাকায় প্রকাশ্যে নারীর সম্ভ্রমহানি করেছে। দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নগরীর চান্দগাঁও, মিমি সুপার মার্কেট, লালদীঘি, বাকলিয়ার রাহাত্তারপোল এলাকায় মিছিল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা জানায়, গতকাল বুধবারের আধাবেলা হরতালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। শাটল ট্রেন যথারীতি চললেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। পরিবহন দফতরের উপ-পরিচলক মোহাম্মদ রবিউল আলম জানান, হরতালের কারণে গতকাল বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে শহরগামী কোনো বাস চলাচল করেনি।
লোহাগাড়া-সাতকানিয়ায় স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত
সাতকানিয়া ও লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানায়, লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য মাওলানা আ ন ম শামসুল ইসলামের জামিন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণের প্রতিবাদে জামায়াত আহূত অর্ধদিবস হরতাল তার নির্বাচনী এলাকা লোহাগাড়া-সাতকানিয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়েছে। বুধবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছিল ফাঁকা। অভ্যন্তরীণ রুটসমূহেও অটো রিকশা, রিকশা ছাড়া ভারি কোন যানবাহন চলাচল করেনি। ব্যাংক-বীমা ও অফিস আদালত ছিল বন্ধ। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমীর জাফর সাদেক হরতাল পালন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়েছে। বিগত সময়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসী এমন সফল হরতাল খুব কমই দেখেছে। লোহাগাড়া উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা নুরুল হোসাইন বলেন, জনপ্রিয় নেতা মাওলানা শামসুল ইসলামকে লোহাগাড়া সাতকানিয়াবাসী কত ভালবাসে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বুধবারের হরতালে। লোহাগাড়া বটতলী মোটর স্টেশনের ব্যবসায়ী তৌহিদুল ইসলাম জানান, সকাল বেলা হরতালের কারণে বটতলী মোটর ছিল অনেকটা ফাঁকা। দোকান পাটও খুলেছে অনেক দেরীতে।
অন্যদিকে মাওলানা শামসুল ইসলামকে জেলে নেয়ায় নিন্দা অব্যাহত রয়েছে, অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমীর জাফর সাদেক, নায়েবে আমীর মোহাম্মদ ইছহাক, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম সদর অঞ্চল সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির প্রচার সম্পাদক লায়ন নাজমুল মোস্তফা আমিন, লোহাগাড়া উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা নুরুল হোসাইন, সাতকানিয়া উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আবুল ফয়েজ, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন লোহাগাড়া শাখা সভাপতি শফিউল আলম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও লোহাগাড়া উপজেলা যুবদলের আহবায়ক আবু সেলিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শিবিরের সভাপতি মো. নুরুল হক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মো. ফৌজুল কবির ফজলু ও লোহাগাড়া শহর শিবির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন প্রমুখ।
২১ নেতাকর্মীকে আটকের নিন্দা ও প্রতিবাদ
নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশী হামলা এবং ২১ নেতাকর্মীকে আটকের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে নগর উত্তর শিবির। চট্টগ্রাম মহানগর উত্তর সভাপতি মুহাম্মদ ইসমাঈল ও সেক্রেটারি আবদুল মোনায়েম স্বাক্ষরিত বার্তায় নেতৃবৃন্দ বলেন- সরকার বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে পুলিশকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যায়ভাবে ১৮ দলীয় জোট নেতৃবৃন্দসহ ছাত্রশিবির নেতৃবৃন্দের গ্রেফতার নির্যাতন চালাচ্ছে আবার উল্টো গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে সারাদেশকে কারাগারে পরিণত করেছে। জনতার ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টির দায় সরকার এড়াতে পারবে না। নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে অন্যায়ভাবে আটককৃত ২১ জন নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দেয়ার জোর দাবি জানান।

