Quantcast
ঢাকা, বৃহস্পতিবার 31 MAY 2012, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, ৯ রজব ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৯৫৮ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

মুজাহিদের ডিসচার্জ শুনানিতে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক

বদর বাহিনীর কমান্ডার শব্দটি বাদ দিতে হবে ডকুমেন্টেও এ অভিযোগের কোন প্রমাণ নেই

স্টাফ রিপোর্টার : জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দানের আবেদনের শুনানিতে গতকাল বুধবার ডিফেন্স টিমের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, মুজাহিদকে আল বদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে কোন প্রমাণ দিতে পারেনি প্রসিকিউশন। শুনানিতে তিনি বলেছেন, যুদ্ধকালীন সময়ে পত্রিকায় বিবৃতি কিংবা বিভিন্ন সভা সমাবেশে বক্তব্য দেয়ার ডকুমেন্ট প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপকরলেও এসব ডকুমেন্টে মুজাহিদকে কোথাও সরাসরি আল বদর বাহিনীর প্রধান বলা হয়নি। তাই চার্জশিট থেকে বদর বাহিনীর প্রধান শব্দ বাদ দেয়ার আবেদন জানান তিনি।

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, মুজাহিদকে আল বদর বাহিনীর প্রধান ধরে নিয়ে চার্জ গঠন করা হলে এটা তার ওপর মহা অবিচার করা হবে। প্রসিকিউশনের মুখের কথা অনুযায়ী মুজাহিদ ছাত্রসংঘের নেতা ছিলেন এবং সে হিসেবে আল বদর বাহিনীরও লিডার ছিলেন, এটা ধরা হলে তার ওপর বড় ধরনের জুলুম করা হবে। কারণ প্রসিকিউশন আল বদর হিসেবে কোন এভিডেন্স দেখাতে পারেনি। এ বিষয়ে দৈনিক আজাদ পত্রিকার একটি স্ববিরোধী রিপোর্ট ছাড়া হাজার পৃষ্ঠার ডকুমেন্টে কিছুই নেই। এছাড়া চার্জশিটে মুজাহিদের বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরা হলেও মুজাহিদ নিজে কোন অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন একটি প্রমাণও প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেননি বলেও যুক্তি তুলে ধরেন তিনি।

গতকালের শুনানিতে ব্যারিস্টার রাজ্জাক উল্লেখ করেন, আজাদ পত্রিকায় মুজাহিদী নামে একজনের নাম প্রকাশ করলেও এই মুজাহিদী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ নন বলেও তিনি দাবি করেন। এছাড়া একটি পত্রিকায় তথ্য প্রমাণ ছাড়া কোন ব্যক্তিকে আল বদর বাহিনীর প্রধান বলে সংবাদ ছাপলেই তিনি আল বদর বাহিনীর কমান্ডার হয়ে যান না। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক চার্জশিট থেকে আল বদর বাহিনীর প্রধান বা কমান্ডার হিসেবে মুজাহিদের নাম অন্তর্ভুক্ত না করতেও ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন জানান। এদিকে চার্জশিটে মুজাহিদের বিরুদ্ধে নতুন তিনটি অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রসিকিউশনের আবেদন গ্রহণ না করতেও দাবি করেছে ডিফেন্স টীম। এ বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। মুজাহিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হবে কি হবে না সে বিষয়ে আদেশ দেয়ার তারিখও আজ ঘোষণা করবে ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে শুরু হয় ট্রাইব্যুনাল-২ এর কার্যক্রম। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে অপর দুই বিচারক ওবাইদুল হাসান ও শাহিনুর ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। গতকাল মুজাহিদের বিরুদ্ধে ডিসচার্জ আবেদনের শুনানি করেন ডিফেন্স টীমের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। তাকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার মুন্সী আহসান কবীর, মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, এডভোকেট শাহজাহান কবিরসহ আরো বেশ কয়েকজন আইনজীবী।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক শুনানিতে বলেন, মুজাহিদের বিরুদ্ধে কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় প্রসিকিউশন তাদের ডকুমেন্ট অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগই দেখাতে পারেননি। মুজাহিদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্নস্থানে সভা সেমিনার করে আল বদর বাহিনী ও রাজাকার বাহিনীকে নানা অপরাধের জন্য প্ররোচিত করার অভিযোগ আনা হলেও মুজাহিদ এর সাথে কিভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন কিংবা বক্তব্য দেয়ার পরে কারা কোথায় কি ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে তারও কোন স্পেসিফিকেশন এখানে নেই। ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট এক সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে মুজাহিদ পাকিস্তানের অখন্ডতার জন্য রাজাকার বাহিনীকে উস্কে দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। বক্তব্যের এই পর্যায়ে বিচারক শাহিনুর ইসলাম বলেন, তাহলে তো প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী মুজাহিদকে ১৫ আগস্টের আগের কোন ঘটনার জন্য কোনভাবেই দায়ী করা যায় না।

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুরের জেলা পরিষদ মিলনায়তনে এবং ২২ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা টাউন হলে পৃথক দুটি সেমিনারে মুজাহিদ পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষায় জন্য বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে পাকিস্তানের অখন্ডতা বা পাকিস্তানের পক্ষে বক্তব্য দেয়া কি পৃথিবীর কোন আইনে যুদ্ধাপরাধের মধ্যে পড়ে? শুনানির এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর বলেন, রাজ্জাক সাহেব আপনি বলছেন ধরে নেয়ার অবকাশ নেই। কিন্তু কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউরের যেটা বলে সেটা হল আমরা বলি আপনি অপরাধ করেছেন। এখানে প্রসিকিউশনের বক্তব্য আমাদের ধরে নিয়েই আগাতে হবে। চার্জ গঠনের সময় আমরা বলি এইসব বর্ণিত অপরাধ আপনি করেছেন। আমরা ধরে নিয়ে অভিযুক্তকে প্রশ্ন করি আপনি অপরাধী কি না?

এদিকে ১৯৭১ সাল থেকে ঢাকার ফকিরাপুলের গরম পানির গলিতে জনৈক ফিরোজ মেম্বার ওরফে ফিরু মেম্বারের বাড়িতে মুজাহিদের যাতায়াতের কথা বলা হয়েছে। তখন বিচারক শাহিনুর ইসলাম প্রশ্ন করেন প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী তাহলে কী মুজাহিদ সাহেব এখনো ঐ বাড়িতে যাতায়াত করছেন ? এসময় অপর বিচারক ওবাইদুল হাসান বলেন চার্জশিটের বক্তব্য অনুযায়ীতো তাই মনে হচ্ছে। চার্জশিটের বর্ণনা অনুযায়ী মুজাহিদ সাহেব যুদ্ধকালীন ৯ মাস সময়ের মধ্যে একদিন ঐ বাড়িতে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে আবার একই চার্জশিটে প্রায়শই যাওয়ার কথা বলে এখানে প্রসিকিউশনের বক্তব্যেরই বৈপরিত্যের প্রকাশ ঘটেছে।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, ৭১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লেখার কারণে তাকে হত্যা করা হয় বলে চার্জশিটে অভিযোগ আনা হলেও এই হত্যাকান্ডের সাথে মুজাহিদ কিভাবে জড়িত কিংবা আদৌ জড়িত ছিলেন কি না সে বিষয়ে পরিষ্কার কোন ব্যাখ্যা দিতে পারেনি প্রসিকিউশন। সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিনের যে ঘটনার অভিযোগ করা হয়েছে সে বিষয়ে ব্যারিস্টার রাজ্জাক আরো বলেন, ওই ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। ওই মামলায় মুজাহিদ আসামী ছিল না। সেখানে কয়েকজনের জেলও হয়েছিল। 

১৯৭১ সালের মে মাসে বাংলা জৈষ্ঠ মাসের কোন এক সময়ে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানার তিনটি গ্রামে তিনশ বাড়িঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ করা হলেও এই ঘটনার সাথে মুজাহিদের সরাসরি সম্পৃক্ততা দেখাতে পারেনি রাষ্ট্র পক্ষ। শুধু বলা হয়েছে ঐ তিন গ্রামে ৫০ জনের বেশি লোক নিহত হয়েছে। তবে নিহত মাত্র ২১ জনের নাম অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করেছে তদন্ত দল। ব্যারিস্টার রাজ্জাক ট্রাইব্যুনালে প্রশ্ন তুলে বলেন, এই কার্যক্রমে মুজাহিদ সাহেব প্রধান ভূমিকা নাকি সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে কিংবা তার ভূমিকাই বা কি ছিল তা বলা হয়নি।

শুনানিতে ব্যারিস্টার রাজ্জাক আরো বলেন, বগুড়ার আলতাফুন্নেসা গ্রামে এক জনসভায় মুজাহিদ আল বদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে বক্তব্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হলেও মুজাহিদ আসলেই আল বদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন কিনা তার পক্ষে কোন যুক্তিই প্রসিকিউশন দেখাতে পারেননি। তিনি ট্রাইব্যুনালে প্রশ্ন করেন মুজাহিদকে আল বদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে তারা কোথায় পেলেন? আর ঐ সমাবেশে বক্তব্য দিলেও মুজাহিদ কোন অপরাধ করেছেন এমন একটি উপাদানও এখানে নেই। ব্যারিস্টার রাজ্জাক তার শুনানিতে মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনীত সবকটি অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরে বলেন এখানে এমন একটি অভিযোগও নেই যার সাথে মুজাহিদ সম্পৃক্ত ছিলেন। বরং প্রসিকিউশন টীম তাদের ইচ্ছেমতো একটি শব্দ ‘প্রকারন্তরে' শব্দটি ব্যবহার করে বিচ্ছিন্ন ঘটনার সাথে মুজাহিদকে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টা করেছেন।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সেনা সদস্যের মধ্যে মাত্র ১৯৫ জনকে প্রসিকিউট করার জন্য যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বাকি ৯২ হাজার ৮০০ জনকে করা হয়নি। বাকিদের জন্য তদন্তও হয়নি। এখানে পাকিস্তান বাহিনীর সবাইকে আপনি যুদ্ধাপরাধী বলেননি। রাজাকার আল বদরের বিরুদ্ধেও প্রসিকিউট করা হয়নি। আর এখানে বিচার হচ্ছে ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য। এখানে মুজাহিদের বিরুদ্ধে কোন এলিগেশন নেই। কোন গোয়েন্দা রিপোর্টও নেই। পুরো অভিযোগপত্রেই আইনের ৩(২) ধারার হত্যা, গণহত্যা বা ষড়যন্ত্রের কোন অফেন্স বা অপরাধের এভিডেন্স নেই।

তিনি ট্রাইব্যুনালে বলেন, এখানে কোন রাজাকার বা আল বদরের বিচার হচ্ছে না। আর সব রাজাকার বা আল বদর বাহিনীর সদস্যরা যে যুদ্ধাপরাধ করেছে বিষয়টি এমনও নয়। তিনি বলেন মুজাহিদের বদর দিবস পালনের আহবান জানানোর মধ্যে এখানে যুদ্ধাপরাধ হয় কিভাবে? আবার একটি লাইব্রেরী লুটপাট হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করা হলেও এটাও কী মানসিক টর্চার কিংবা যুদ্ধাপরাধের মধ্যে পড়ে ? বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম তখন নিজেই বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, লাইব্রেরীর বই পুড়ানো বা লুটপাট কিভাবে মানসিক টর্চারের মধ্যে পড়ে?

এদিকে দুপুরের আগে ডিফেন্স পক্ষের বক্তব্য শেষ হলে দুপুরের পরে ল,পয়েন্টে জবাব দেন প্রসিকিউটর রানা দাস গুপ্ত। তিনি বলেন, এই মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এই মামলা চলছে না। কারণ মন্ত্রীরা বলেছেন ২০১১ সালের মধ্যে বিচার শেষ হবে। কিন্তু বিচার তো এখনো চলছে। তাহলে মন্ত্রীদের কথায় বিচার চলছে এটা ঠিক না। তিনি বলেন, ৪০ বছর পরে বিচার শুরু হয়েছে কারণ আগের সরকারগুলো বিচার শুরু করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ৯২ সালেও এই আওয়ামী লীগই বিচার শুরু করতে সংসদে বক্তব্য দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে আইনটি ৭৩ সালে করা হলেও উদ্যোগের অভাবেই তা করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিলের পরে রাজাকার বাহিনী গঠন করার পরবর্তী সময়ে সারা বাংলাদেশে যত অপরাধ হয়েছে তার সবকিছুর দায়ভার মুজাহিদকে নিতে হবে। কারণ তারাই বক্তব্য দিয়ে উস্কানি দিয়েছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া আর উৎখাত করার জন্য বক্তব্য দেয়া এক কথা নয়। তারা কোন ভাবেই এর দায় এড়াতে পারবেন না। কাজেই আমাদের দাখিলকৃত অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে মুজাহিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করার জন্য আবেদন করছি।