|
|
সংগ্রাম রিপোর্ট : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর বিশ্ব বরেণ্য মোফাসসিরে কুরআন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে কোন্ সাক্ষী কত দিন ঢাকায় ছিলেন। আবার কবে চলে যান। সরকারি মেহমানখানা সেইফ হাউসে সাক্ষীদেরকে পিরোজপুর থেকে এনে রাখা হয়। এবং সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যাওয়া হয়। পালাক্রমে পুলিশ সেখানে দায়িত্ব পালন করে। আর এর সব বিবরণ একটি সাধারণ ডায়েরী বইতে সময়-তারিখসহ লিখিত থাকে। এই সাধারণ ডায়েরী বুক বা রেজিস্ট্রার খাতা এখন ফেসবুকে পাওয়া যাচ্ছে।
এতে দেখা যায়, গত ২০ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে তালিকাভুক্ত ৪৬ জন সাক্ষীর একটি তালিকা দিয়ে আদালতে দরখাস্ত করে বলা হয় এদের হাজির করা আদৌ সম্ভব নয়।
গত ২৯ মার্চ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য তাদের অনুপস্থিতিতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনাল-১।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ২০ মার্চ দাখিল করা আবেদনে কারণ জানানো হয়েছিল কেন সাক্ষী হাজির করা সম্ভব নয়। পাঁচজনকে হাজির করতে না পারা বিষয়ে বলা হয়েছে তারা নিখোঁজ। ১৪ জনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজ পাঁচ জনের তিনজন গোপনে ভারতে পালিয়ে গেছে বলে বলা হয়। কেউ কেউ অসুস্থ বলেও জানানো হয়।
গত ১২ এপ্রিল সেইফ হাউসের ডায়েরি বইয়ের সূত্র ধরে বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায়। সেইফ হাউসের সাধারণ ডায়েরি সূত্র ধরে আমার দেশ যে অনুসন্ধানী রিপোর্টে বলা হয় যেসব সাক্ষী হাজির করা সম্ভব নয়, নিখোঁজ, পলাতক, সন্ত্রাসীদের ভয়ে বাড়ি ছাড়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রসিকিউশনের আবেদনে তা সঠিক নয়। অনেক সাক্ষীর নাম ধরে ধরে উল্লেখ করা হয় তারা প্রসিকিউশনের হেফাজতে সেইফ হাউসেই ছিল। সাক্ষীদের নাম ধরে ধরে উল্লেখ করা হয় কোন সাক্ষী কবে সেইফ হাউসে এসেছেন, কবে বাড়ি গেছেন। এখন সেই সেফ হাউসের সাক্ষী হাজির এবং অন্যান্য বিবরণ সংবলিত ডায়েরি বই চলে গেছে ইন্টারনেট জগতে।
১২ এপ্রিল সেফ হাউসের রেজিস্ট্রার বই থেকে আমার দেশে প্রকাশিত রিপোর্টের একটি অংশ এখানে তুলে ধরা হল।
‘‘প্রসিকিউশনের আবেদনে বলা হয়েছিল সাক্ষী আশিষ কুমার মন্ডল, সুমতি রানী মন্ডল ও সমর মিস্ত্রি গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ। মাওলানা সাঈদীর মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউটর এডভোকেট রানাদাস গুপ্ত ট্রাইব্যুনালকে জানিয়ে ছিলেন, আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে ২ ফেব্রুয়ারি সেইফ হাউস থেকে তারা বের হয়ে গেছেন। পরে প্রসিকিউশন তাদের আবেদনে জানান, ওই ৩ সাক্ষী গোপনে ভারতে চলে গেছেন। অথচ ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের জন্য তৈরি করা সেইফ হাউসের রেজিস্টার, সাধারণ ডায়েরি ও খাওয়ার হিসাবের খাতা অনুযায়ী আশিষ কুমার মন্ডল, সুমতি রানী মন্ডল ও সমর মিস্ত্রি ১৬ মার্চ পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণেই ছিলেন। সেইফ হাউসের রেজিস্টারের বর্ণনা অনুযায়ী, সাক্ষী আশিষ কুমার মন্ডল ও সমর মিস্ত্রি ও সুমতি রাণী মন্ডল দুই দফায় ৪৭ দিন সেইফ হাউসে ছিলেন। প্রথম দফায় ২০১১ সালের ১১ নবেম্বরে এই তিনজনকে সেইফ হাউসে আনা হয়। সেদিন মোট ৯ সাক্ষী এখানে আনা হয়েছিল। তাদের সেইফ হাউসে রাখা হয় ২২ নবেম্বর পর্যন্ত। এই সময় তাদের কীভাবে সাক্ষী দিতে হবে, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। সমর মিস্ত্রি এবং আশিষ কুমার মন্ডল ছাড়া এ সময় সেইফ হাউসে আনা অন্য সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ মাহাবুবুল আলম, মো. মাহতাব উদ্দিন হাওলাদার, মো. মোস্তফা হাওলাদার, মানিক পসারি, মো. রুহুল আমিন নবী, মো. আলতাফ হাওলাদার ও মোহাম্মদ আবদুল লতিফ হাওলাদার। রেজিস্টারে প্রত্যেক সাক্ষীর মোবাইল নম্বরও উল্লেখ রয়েছে।
সমর মিস্ত্রি ও আশিষ কুমার মন্ডলসহ ৬ জনকে ২২ নবেম্বর পিরোজপুর পাঠানো বিষয়েও বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে সেইফ হাউসের সাধারণ ডায়েরিতে। এতে বলা হয়, ‘তাহাদের নিজ বাড়ি পিরোজপুর জেলার উদ্দেশে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে পৌঁছাইয়া দেয়ার নিমিত্তে রওয়ানা দেয়া গেল।' পরে সমর মিস্ত্রি, সুমতি রাণী মন্ডল ও আশিষ কুমার মন্ডলকে আবারও গত ৩১ জানুয়ারি সেইফ হাউসে আনা হয়। সেইফ হাউসের রেজিস্টার অনুযায়ী তাদের আত্মীয়-স্বজনসহ ১৬ মার্চ পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। একটানা দেড় মাসের বেশি সেইফ হাউসে উপস্থিত রেখেও শিখিয়ে দেয়া মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থিত করা হয়নি। সমর মিস্ত্রি, আশিষ কুমার মন্ডল ও সুমতি রাণী মন্ডলের বিষয়ে ১৬ মার্চ সেইফ হাউসের সাধারণ ডায়েরিতে উল্লেখ রয়েছে, ‘পার্শ্ব লিখিত স্বাক্ষর সাক্ষীদের নিয়া বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেয়া গেল।' অথচ প্রসিকিউশনের আবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী তারা পালিয়ে গেছে।’’
তদন্ত কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত ১৫ সাক্ষীর জবানবন্দী সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের আদেশ পুনরায় বিবেচনার জন্য আসামী পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। এ বিষয়ে গত ২২ মে আসামী পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যুক্তি উপস্থাপন করেন। আমার দেশ এবং দৈনিক নয়া দিগন্ত, ইসলামিক টিভি এবং দিগন্ত টিভিতে প্রকাশিত তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সাক্ষী হাজির করতে না পারা বিষয়ে প্রসিকিউশন যে কারণ দেখিয়েছেন তা মিথ্যা।
ঐদিন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী বলেছিলেন, কোন সাক্ষী কতদিন আমাদের কাছে ছিল, কবে চলে গেছে এসব বিষয়ে যে তথ্য তারা দিয়েছেন তা ঠিক নয়। একটি পত্রিকার রিপোর্ট থেকে তারা এ তথ্য দিয়েছেন। ১৫ দিন, ৪৭ দিন আমাদের হেফাজতে ছিল বলে যে কথা বলা হয়েছে তা সঠিক নয়।

