|
|
আমার দেশ-এর কণ্ঠ রোধ চেষ্টার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে রাজনীতিক পেশাজীবী ব্যক্তিবর্গ
গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা অয়োজিত আক্রান্ত গণমাধ্যম বিপন্ন বাক-স্বাধীনতা শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য পেশ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ -সংগ্রাম
স্টাফ রিপোর্টার : দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে শীর্ষ রাজনীতিক ও পেশাজীবী ব্যক্তিবর্গ বলেছেন, বর্তমান সরকার ফ্যাসিস্ট সরকার। তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। শেখ মুজিব শাসনামলের মতো বর্তমান সরকারের আমলেও সংবাদমাধ্যমের ওপর আগ্রাসন চালানো হচ্ছে। বাক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় এই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে দৈনিক আমার দেশ কর্তৃপক্ষ আয়োজিত উক্ত অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনেরা এ কথা বলেন। আমার দেশ বন্ধের সরকারি অপচেষ্টা ও পত্রিকাটির সম্পাদক মাহবুবুর রহমানকে ন্যষ্কারজনকভাবে গ্রেফতারের বার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি, এম কে আনোয়ার এমপি, প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক, ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, বিবিসিখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদ, বিশিষ্ট কলামিস্ট প্রাবন্ধিক ফরহাদ মযহার, বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমীর এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এমপি, সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, বর্তমান সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদীন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি আব্দুস শহিদ। কবি আবদুল হাই শিকদারের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান মিঞা, সাবেক প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. ইউসুফ হায়দার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সাবেক সভাপতি ও কলা অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. সদরুল আমীন,বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ এবং বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মো. মাহফুজ উল্লাহ। আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন আমার দেশ পত্রিকার কারানির্যাতিত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। অনুসন্ধানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমসহ আরো অনেক বরেণ্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, বাংলাদেশ পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সরকার ফ্যাসিবাদী চিন্তা-চেতনায় ডুবে আছে। এই দলটি সংবিধান ক্ষত-বিক্ষত করেছে। মানবাধিকার ভূ-লুণ্ঠিত করেছে। আওয়ামী লীগ অসহনশীল। তারা সমালোচনা পছন্দ করে না। একারণেই তারা বাকশাল করেছিলো। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কখনো ক্ষুণ্ণ হতে দিতে পারি না। আসুন দল-মত নির্বিশেষে এ ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হই। তিনি আমার দেশ সম্পাদকের ওপর কারা নির্যাতন প্রসঙ্গে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহ্য মানবাধিকার, বাক স্বাধীনাত রক্ষা করা। কিন্তু মাহমুদুর রহামনকে জেলে পাঠিয়ে সে ঐতিহ্য ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ন এম কে আনোয়ার বলেন, বর্তমান সরকার ফ্যাসিস্ট সরকার। তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। সরকারের মন্ত্রীরা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর কথা বলেছেন। সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে সরকারের আগ্রাসনের প্রথম শিকার মাহমুদুর রহমান ও আমার দেশ। তা অব্যাহতও রয়েছে। সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, পুলিম ঠ্যাঙ্গারে বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনে চরমভাবে দলীয়করণ হচ্ছে। সাংবাদিকরা ঘরে বাইরে খুন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় প্রয়োজনে ঐকবদ্ধ সংগ্রামের কোনো বিকল্প নেই।
প্রবীণ আইনবিদ ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক বলেন, সরকারের ব্যাপারে কিছু বলবো না। সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে কিভাবে সুপ্রীম কোর্ট খর্ব করেছে তার প্রমাণ ‘আমার দেশ'। আদালতের মাধ্যমে এভাবে ভিক্টিমাইজ হওয়ায় আমি লজ্জিত। আমরা চেষ্টা করবো ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে। ভাষা সৈনিক আবদুল মতিনও বর্তমান সরকারে কর্মকান্ডে খুশি নন। তিনি বলেন, যা চলছে চারদিকে তাতে কি মনে হয় সরকার আছে? দেশ কোথায় যাচ্ছে? কি হবে দেশ?
সাংবাদিক নেতা রুহুল আমিন গাজী বলেন, এমন এক সময়ে এ অনুষ্ঠান হচ্ছে যখন গোটা দেশে সাংবাদিক নির্যাতন চলছে। বাংলাদেশের সৃষ্টিই যেন হয়েছিল গণমাধ্যম দলন ও সাংবাদিক নির্যাতনের জন্য। দেশের মানুষ আজ কোথাও নিরাপদ নেই। সাংবাদিক রাজনীতিবিদসহ সকল নির্যাতিত মানুষকে এই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান তিনি।
স্বনামখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদ বলেন, সাংবাদিক নির্মূল করার ব্যানার দেখে মনে হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শাসনামলের মতো এ সরকারও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে লেগেছে। সরকারের মন্ত্রীরা দেশে গৃহযুদ্ধ লাগাতে চাচ্ছে।
ফরহাদ মযহার বলেন, এর আগেও ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিলো শেখ মুজিবের মাধ্যমে সেটা টিকেনি। তার কন্যার মাধ্যমে যা হচ্ছে তাও বেশি দিন টিকবে না। দ্বিতীয় ফ্যাসিবাদের শাসন চলছে। ফ্যাসিবাদকে চিরতরে নির্মূল করতে সকলকে নীতিগত সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
জয়নুল আবদিন ফারুক এমপি বলেন, সরকার ‘লম্বা হাত' দিযে সাংবাদিক ও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। কিন্তু সীমান্তে হত্যা বন্ধ করতে পারছে না।
জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ এমপি বলেন, আজকে বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিপন্ন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা লন্ড ভন্ড। সংবাদপত্রের ওপর আঘাত মানে গণতন্ত্রের প্রতিটি ইউনিটের ওপর আঘাত। এর পরিণতি ভালো হবে না। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবতা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার্থে এই ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে।
এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ এবং বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা একসাথে চলতে পারে না। আজকে উচ্চ আদালতে সরকার আক্রমণ চালিয়েছে। এ দুঃশাসনের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে সকল পেশাজীবীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান তিনি।
জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ বলেন, আমার দেশের পর গণমাধ্যম অব্যাহতভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। সাংবাদিক হত্যার ঘটনা ঘটছে। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা চরমভাবে হুমকির সম্মুখীন। সাংবাদিকদের সাথে সকল মানুষকে গণতন্ত্রবিরোধী, ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে শামিল হওয়ার আহবান জানান তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আমরা এগুনোর পরিবর্তে পিছিয়ে পড়েছি। শুধু আমার দেশ পত্রিকা নয় গোটা গণমাধ্যম আজ টার্গেটে পরিণত হয়েছে। জনপ্রিয়তা হ্রাস, ফ্যাসিবাদী মানসিকতায় আক্রান্ত ও নির্বাচনী অঙ্গীকার পালনের ব্যর্থতা প্রকাশে গণমাধ্যমে ভীতির সঞ্চার করা এই তিন কারণে বর্তমান সরকার অতিমাত্রায় অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছে। নির্বাহী বিভাগ, সংসদ এবং বিচার বিভাগও আজ সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারকে মোকাবিলা করতে হবে।
আলোচনা সভার আগে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন ও ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। এরপর সাংবাদিক নির্যাতনের ওপর একটি প্রামাণ্য তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক পরিচালিত দোয়া মুনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে।

