Quantcast
ঢাকা, শনিবার 2 June 2012, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, ১১ রজব ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ২৫৩৬ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

৯৪ সালে ভোরের কাগজের ‘মুক্ত চিন্তা'র তোফায়েল আহমদ

কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রয়োজন

তোফায়েল আহমদ

সাম্প্রতিককালে আমরা নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে রাজপথে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আছি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন যে, নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভিত্তি সংবিধানে নেই। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল তো এ কথা অহরহ বলেই চলেছে। ১৯৯০-এর ১৯ নবেম্বর আমরা যে ঐতিহাসিক ঘোষণা জাতির সামনে দিয়েছিলাম, যাকে বলা হয় ১৯৯০-এর নবেম্বরের রাজনৈতিক জোটের যৌথ ঘোষণা, নিশ্চয়ই আমরা সে ঘোষণার কথা ভুলে যাইনি। আমি সম্প্রতি জাতীয় সংসদের লাইব্রেরিতে গিয়েছিলাম সেই '৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি, কেনো আমরা '৯০-তে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করলাম, সে সময় বিভিন্ন জোটের নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে জাতীয় নেত্রী আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা, বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া, ৫ দলের নেতৃবৃন্দ কি বক্তব্য রেখেছিলেন, সে সব সংগ্রহ করার জন্য। হঠাৎ ১৯৮৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ইত্তেফাকের একটি হেডলাইন পড়ে আমি খুব আলোড়িত হয়ে উঠি। যাতে লেখা ছিল, ‘এই সরকারের আমলে অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না- খালেদা জিয়া।' আমি ভাবলাম যে কি অপূর্ব মিল, ১৯৯০ তে আমরা যে কথা বিগত সরকারের বিরুদ্ধে, স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে বলেছিলাম, বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আজকে একই কথা আমরা বলে চলেছি।

১৯ নবেম্বরের ঐতিহাসিক ঘোষণা যা ২০ নবেম্বর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, ওই দিনের ইত্তেফাক পত্রিকা পড়ে আমি একটি অপূর্ব মিল খুঁজে পেলাম। আমরা যখন আন্দোলনরত তখন সেই ১৯ তারিখেই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল এরশাদ বক্তৃতা দিচ্ছেন টঙ্গিতে, ‘‘ধ্বংস ও নৈরাজ্যের রাজনীতি প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ হোন।’’ সেকথা আজকে একই ভাষায় বর্তমান সরকার প্রধান বেগম খালেদা জিয়া বলছেন। অথচ সেই '৯০-এর ১৯ নবেম্বর বেগম খালেদা জিয়া ঢাকায় একটি জনসভায় (ওই দিন জনসভা থেকে আমরাও অভিন্ন রূপরেখা ঘোষণা করেছি) বলেছিলেন, এই সরকারের আমলে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না এবং আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত করুন। জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, নিরপেক্ষ সরকারের মাধ্যমে সংসদ নির্বাচন দিন। আমার প্রশ্ন, ১৯৯০-তে আমরা যে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিলাম বা ৩ জোটের যে অভিন্ন রূপরেখা আমরা প্রণয়ন করেছিলাম তার মূল লক্ষ্য ছিল একটি অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন। আজকে যখন সরকারি দল এবং তার প্রধানমন্ত্রী বারবার বলছেন যে, পৃথিবীর কোথাও নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো নজির নাই, তখন বিস্মিত হই যে, নজির আমরা ১৯৯০-এ নিজেরাই স্থাপন করেছিলাম। ৩ জোট যার একটি ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন, এর রূপরেখার মধ্যে আমরা যেখানে নিরপেক্ষ নির্দলীয়  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলেছিলাম সেখানে আজকে ক্ষমতাসীন হয়ে কিভাবে বিএনপি বলে, পৃথিবীর কোথাও এর নজির নেই। অথচ আমাদের সংবিধানেই একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আমরা সেটাকে সন্নিবেশিত করেছি।

১৯৯১ সালের ২৪ নং আইন অর্থাৎ যাকে আমরা বলি সংবিধানের একাদশ সংশোধনী আইন, যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ তফসিল সংশোধনকল্পে প্রণীত হয়েছিল, সেখানে আমরা বলেছিলাম যে, দলমত নির্বিশেষে, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, কর্মচারী, পেশাজীবী সংগঠন, প্রধান রাজনৈতিক জোট ও দল সর্বস্তরের জনগণের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর ৩টি প্রধান রাজনৈতিক জোট ও দল প্রধান বিচারপতি জনাব সাহাবুদ্দিন আহমেদকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আহবান জানায়। সুতরাং প্রধান বিচারপতি জনাব সাহাবুদ্দিন আহমেদ ছিলেন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান।

আজকে সরকারি দলের অনেকেই বলে থাকেন বিশেষ করে সরকারি দলের মহাসচিব তো প্রায়ই বলেন যে, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেব ছিলেন সংবিধানের রাষ্ট্রপ্রধান অর্থাৎ সংবিধান অনুসারেই তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। স্মরণীয় যে, সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রেখে সংবিধানের ৫১ ও ৫৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্দলীয় সরকার গঠিত হবে এটা আমাদের ৩ জোটের অঙ্গীকার ছিল। সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের ৩ ধারা অনুসারে সরকার প্রধানসহ তৎকালীন সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করে স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী আন্দোলনরত ৩ জোটের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ- এই ছিল দাবি। তখন ৩ জোটের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন। কিন্তু সবারই মনে রাখা উচিত বিচারপতি সাহাবুদ্দিন ছিলেন প্রধান বিচারপতি। সংবিধানের কোথাও প্রধান বিচারপতি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হতে পারেন এমন কোনো বিধান কিন্তু ছিল না। যার জন্যে বাধ্য হয়ে সংবিধানে ছিল না বলেই পরবর্তীকালে আমরা এ লেখাটির খসড়া আমি তৈরি করেছিলাম কিছুদিন আগে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিসহ এ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গত ক'মাস ধরেই আমাদের সমালোচকরা নানা প্রশ্ন, যুক্তি দিয়ে আসছেন, সেসব যুক্তিকে বিচার-বিশ্লেষণ করাই এ লেখাটির উদ্দেশ্য। লেখাটি চূড়ান্ত করতে কিছুটা সময় চলে যায়। ইতোমধ্যে গত বৃহস্পতিবার থেকে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সংলাপও শুরু হয়েছে। তারপরও আমাদের দাবির পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথা, প্রশ্ন বিতর্ক এখনো রয়েছে। সেজন্য কিছুটা বিলম্ব হলেও রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তার কথা ভেবেই লেখাটি প্রকাশ করতে দিয়েছি। -লেখক (২৩/১০/৯৪)

একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটাকে বৈধ করে নিয়েছি। এই সাহাবুদ্দিন সাহেব যে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হয়েছেন সেটাকে বৈধ করার জন্যই কিন্তু একাদশ সংশোধনীর প্রয়োজন ছিল। আমি এতোগুলো কথা বললাম এই কারণে, আজকে প্রায়ই দু'টো কথা বলা হয়ে থাকে ‘দুনিয়ার কোথাও নজির নাই' আর ‘সংবিধানে নাই'। কিন্তু সবারই মনে রাখা উচিত বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের সেই উক্তিটি। তিনি বলেছিলেন যে, ৩ জোটের রূপরেখার যদিও সাংবিধানিক ভিত্তি নেই কিন্তু তার রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।

এখানে আরেকটি কথা মনে রাখা প্রয়োজন। আমরা বিগত সরকারের আমলে ৯ বছর সংগ্রাম করেছি। প্রথমে আমরা ৫ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলাম। সেই ৫ দফার কোথাও কিন্তু নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা ছিল না। কারণ, এরশাদের আমলে যখন নির্বাচন শুরু হলো, ইউনিয়ন কাউন্সিলের নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন তারপর ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচন এবং ৮৭-তে সেই সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে ৮৮-তে আবার নির্বাচন। তখন কিন্তু আমরা দাবি তুললাম যে, আমরা এরশাদ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো না। সমগ্র অভিজ্ঞতার আলোকেই উত্থাপিত হয়েছিল এই দাবি। আজকে যখন বিএনপির নেতা এবং মন্ত্রী সালাম তালুকদার বলেন যে, দ্বাদশ সংশোধনী বিল যখন আমরা তৈরি করি জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটিতে, তখন কোনো কোনো সদস্য নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাব দিলেও আওয়ামী লীগ তার বিরোধিতা করেছিল। কথাটি ঠিক। এখানে আওয়ামী লীগের আন্তরিকতা এবং সততার রূপটি বাংলার জনগণ খুঁজে পাবে। আমরা যদি একটি সরকারকে বেকায়দায় ফেলবার জন্য বা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করবার জন্য নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইতাম তাহলে কিন্তু আমরা দ্বাদশ সংশোধনী বিল তৈরি করার সময়ই চাইতে পারতাম। কিন্তু আমরা মনে করেছিলাম জিয়াউর রহমান বা এরশাদ সাহেবের আমলে যে ভোট ডাকাতি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়েছে, '৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে প্রতিষ্ঠিত সরকারের অধীনে তার পুনরাবৃত্তি হবে না। এই উপলব্ধি থেকেই কিন্তু আমরা তখন নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা তুলিনি। কিন্তু প্রথম যখন ভোলায় উপ-নির্বাচন হলো, তারপরেই ধানমন্ডির উপ-নির্বাচন হলো (যেখানে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলী ছোঁড়া হলো), তারপর মিরপুরে উপ-নির্বাচন হলো, বিভিন্ন পৌরসভার নির্বাচন হলো, তারপরে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের দিন যখন দুইজনকে গুলী করে হত্যা করা হলো, বহুজনকে বুলেট দ্বারা আহত করা হলো এবং ২৮টি কেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত করা হলো (যেটা ছিল স্থানীয় সরকারের নির্বাচন, যে নির্বাচনে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে না, সেই নির্বাচনেই যখন এ অবস্থাটা হলো) এবং বিএনপির মহাসচিব যখন নির্বাচনের পরের দিন বিবৃতির মাধ্যমে বললেন, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হয় নাই এবং নির্বাচনের পরে যখন লালবাগে ৬ জনকে জীবন দিতে হলো, তারপর মাগুরার উপ-নির্বাচনে যখন সরকার ব্যালট বাক্স ছিনতাই করতে অস্ত্রধারীদের নিয়োগ করে সেই নির্বাচনের ফলাফল তাদের পক্ষে কেড়ে নিয়ে গেলো, তখনই কিন্তু আমরা উপলব্ধি করলাম, না- এই সরকারের অধীনে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না। যে সরকার স্থানীয় নির্বাচনে পরাজিত হতে চায় না, কলেজ নির্বাচনে পরাজিত হতে চায় না, এমনকি বিভিন্ন সংস্থার নির্বাচনেও যখন পরাজিত হতে চায় না, তখন সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রশ্ন যখন উঠবে তখন তাদের

অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে কেমন করে? এরশাদ সরকার সম্পর্কে যেমন আমরা অভিজ্ঞতার আলোকে উপলব্ধি করেছিলাম যে, ওই সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি আজ আমরা উপলব্ধি করেছি, কেবল খালেদা জিয়ার সরকার নয় এই দেশে কোনো রাজনৈতিক দলের অধীনেই নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না। আর সে কারণেই আমরা বর্তমানে নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে আন্দোলন করছি।

আজকে যদি দেশ ও জাতির স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে আমরা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী ৩/৪/৫টা নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটা সাংবিধানিক ভিত্তি দাঁড় করাই তাহলে আমার মনে হয়, আমরা একটা সিস্টেমে যেতে পারবো। অর্থাৎ আমাদের এই আন্দোলন হচ্ছে সাংবিধানিক একটি ভিত্তি দাঁড় করানোর জন্য। আজকাল যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসেন তারা দ্বিতীয়বার কিভাবে বিজয়ী হবেন, তৃতীয়বার কিভাবে বিজয়ী হবেন, চতুর্থবার কিভাবে ক্ষমতায় থাকবেন, সেই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে প্রশাসনকে দলীয়করণ করেন। তারা দলকে দুর্নীতির মধ্যে নিমজ্জিত করেন। দলীয়করণের মাধ্যমে প্রশাসনকে নষ্ট করেন। দলতত্ত্ব কায়েম করতে গিয়ে এমনভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নেন সরকার তখন আর জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে চান না। অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কথা ‘জবাবদিহিতা'। আজকে পার্লামেন্টে আমরা যখন দুর্নীতির প্রশ্ন তুলি, অন্যান্য প্রশ্ন উত্থাপন করি, কিন্তু তার কোনো অর্থবহ আলোচনা হয় না। সেখানে কোনো জবাবদিহিতা নেই। কারণ এ সরকার মনে করে, আগামী নির্বাচন যেহেতু তাদের অধীনে হবে, সেহেতু বাংলাদেশের মানুষ তাকে প্রশ্ন করবে না- ক্ষমতায় গিয়ে ভালো করেছে কি করেনি, ওয়াদা রক্ষা করেছে কি করেনি। কিন্তু কোনো সরকার যদি দেখে, নির্বাচনে ৯০ দিন আগে একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে তাকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, তাহলে অবশ্যই তিনি জনগণের কল্যাণের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করবেন। কারণ, তখন সরকার দুর্নীতির আশ্রয় নিতে, নিজের পরিবার-পরিজনকে বিত্তশালী করতে, প্রশাসনকে দলীয়করণ করতে ভয় পাবেন এবং এমন কতগুলো কাজ সরকার করবেন যা ভালো কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে। যার ফলে জনগণ তাকে ভোট দেবে। এই লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই আজকে নিরপেক্ষ, নির্দলীয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্ন আমরা তুলেছি।

আজ বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছে, আগামী নির্বাচনে, বিএনপি যদি ক্ষমতায় না আসে, যে ক্ষমতায় আসবে সে আওয়ামী লীগই হোক আর যেই হোক, একই অবস্থার সৃষ্টি হবে। সে কারণে বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন যে, আওয়ামী লীগও যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যায় তাহলেও আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। অর্থাৎ, সাংবিধানিক একটা স্থায়ী সিদ্ধান্ত আমরা নিতে চাই। অনেকেই প্রশ্ন করেন বা সরকারও বলে থাকেন যে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটা নির্বাচিত সরকারের বিকল্প হতে পারে না। বিকল্প এ কথাটা কিন্তু কেউ বলছেন না। এটা কেবল একটা অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধু ৯০ দিনের জন্য। পাকিস্তানের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে আনা যায়। নওয়াজ শরীফও তো নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, গোলাম ইসহাক খান তো সিনেট দ্বারা নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কিন্তু দেশের মধ্যে যখন প্রশ্ন উঠলো, বেনজির ভুট্টো যখন বললেন যে, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো না।- তখন সে দেশের সকল  শ্রেণীর মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এবং আন্তর্জাতিক দাতারা থেকে  শুরু করে সবাই একটা সিদ্ধান্ত নিলেন, যার ফলে নেওয়াজ শরীফ পদত্যাগ করলেন। নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে মঈন কোরেশি সকলের সহযোগিতা নিয়ে একটি নির্বাচন করলেন। ১৯৭০ সালেও এ দেশে নির্বাচন হয়েছিল। অরাজনৈতিক ব্যক্তির অধীনে। জেনারেল ইয়াহিয়া ছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। সেই নির্বাচন  নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। ১৯৭৩-এ যে নির্বাচন  হয়েছে সেই নির্বাচন অবাধ এবং নিরপেক্ষ হলেও সেই নির্বাচনেরও কোনো কোনো আসন নিয়ে প্রশ্ন কেউ কেউ তুলেছেন। জিয়াউর রহমানের আমেলে হ্যাঁ-না গণভোট  থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন , সংসদ নির্বাচন সবটাই বিতর্কিত ছিল। এরশাদ সাহেবের আমলে ৮৬, ৮৮, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, হ্যাঁ-না  ভোট বিতর্কিত ছিল। কিন্তু বিতর্কিত হয়নি ৯১-এর নির্বাচন। ঠিক তেমনিভাবে ৭০-এর পরে  ৯৩-এ মঈন  কোরেশির নেতৃত্বাধীন নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার-এর অধীনে যে নির্বাচন হয়েছে এই দু'টি  নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানেও কোনো প্রশ্ন নেই। বাংলাদেশেও ৭০ এবং ৯১-এর নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন নেই। অভিজ্ঞতায় বারবার দেখা গেছে, নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকে, প্রশাসন পছন্দ মতো প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার মনোনীত করে এবং জনগণ অবাধ এবং নিরপেক্ষভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে। প্রসঙ্গত একটি কথা বলি, নির্বাচন কমিশনকে অধিকতর শক্তিশালী করার জন্য জাতীয় সংসদে বিল আনা হয়েছে। এই নির্বাচন কমিশনের বর্তমান  যে ক্ষমতা, এই ক্ষমতা রেখেই কিন্তু ১৯৯১-এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই ক্ষমতাবলে যদি ১৯৯১-এর মতো একটি সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে হতে পারে, তাহলে একটি  ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অধীনে মাগুরার মতো বা সিটি করপোরেশনের মতো বা মিরপুর বা ভোলার মতো স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে না  কেন? কারণ বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের সরকার ছিল নিরপেক্ষ, আর এখন নির্বাহী ক্ষমতা একজন রাজনৈতিক প্রধানমন্ত্রীর হাতে। সুতরাং নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে রেখে নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা সম্ভব নয়। সেজন্য আজ নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করলে হবে না। যতো ক্ষমতাই আমরা নির্বাচন কমিশনকে দিই না কেন,  কোনো রাজনৈতিক দল যদি ক্ষমতায় থাকে তবে অবাধ ও নিরপেক্ষ নিবার্চন  হবে না। অথচ, নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার হলে এই ক্ষমতাবলেই কিন্তু একটা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে। সেজন্যই আজকে আমরা একটি স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে যাতে জনগণের কল্যাণের জন্য মানুষ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে কাজ করতে পারে সে চেষ্টা করছি। আজকে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার অন্যত্র কোথাও নেই। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বাজেটের টাকা খরচ করতে পারেন পৃথিবীর কোথাও কিন্তু সে নিয়ম নেই। পৃথিবীর কোথাও কিন্তু এভাবে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয় না। এভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদেরকে হয়রানি করা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়। সেজন্য বাংলাদেশের অবস্থার প্রেক্ষিতে একটি সিস্টেমের জন্য, মানুষকে অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটদানের জন্য কয়েকটা নির্বাচন নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া উচিত।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে আমরা মনে করি, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার বলছেন, তারা উন্নয়নে দেশ ভরে দিয়েছেন। তাহলে নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে তাদের আপত্তি কেন? জনগণ যদি তাদেরকে ভালোবাসে, পছন্দ করে তবে নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে তাদের আপত্তি থাকার কথা নয়। গণতন্ত্রের প্রাথমিক শব্দ হলো একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু রাজনৈতিক সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। জোর করে  সে নির্বাচন  হলে পরে আবার অস্থিতিপশীলতা  দেখা দেবে। অর্থাৎ এই অস্থিতিশীলতা চলতেই থাকবে। সেজন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের একটি বিল সরকারের আনা উচিত। এভাবেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাজনিত সমস্যার সমাধান হতে পারে। কিস্তু সরকার যদি উদ্যোগ না নেয়, তাহলে বিরোধী দলের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে  রাজনৈতিক সঙ্কট চলতেই থাকবে। কিন্তু আমাদের মতো একটা অনুন্নত গরিব দেশে যেখানে জনসংখ্যা এতো বেশি, যেখানে শিক্ষার এতো অভাব, যেখানে লাখ লাখ কোটি কোটি  তরুণ শিক্ষিত ছেলে বেকার, কলকারখানা গড়ে উঠছে না, অথচ বিশ্ব এগিয়ে চলছে অর্থনৈতিকভাবে সেখানে রাজনৈতিক পদ্ধতিতে একটা স্থিতিশীলতা যদি না আনতে পারি তাহলে অর্থনৈতিকভাবেও আমরা উন্নয়নের পথে এগুতে পারবো না। (অসমাপ্ত)