|
|
বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর লাঠি সোটা নিয়ে প্রতিরোধ
বুড়িগঙ্গা নদীর ফতুল্লার চরবক্তাবলী এলাকায় ড্রেজার দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে তীরবর্তী গ্রামে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে
কামাল উদ্দিন সুমন, বক্তাবলী থেকে ফিরে : অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের কারণে বুড়িগঙ্গা নদীর ফতুল্লার চরবক্তাবলী এলাকার প্রায় ৩০টি গ্রাম হুমকির মুখে পাশাপাশি বিলীন হয়ে যাচ্ছে তীরের ইটভাটা। আর এতে করে গতিপথ হারাচ্ছে বুড়িগঙ্গা নদী। চরবক্তাবলী এলাকার কয়েক হাজার মানুষ নদী ভাঙ্গনের শিকার হতে পারে এমন আশঙ্কায় আতঙ্কিত।
প্রায় প্রতিদিনিই বালু উত্তোলনকারীদের সাথে এলাকাবাসীর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এবং বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারী কয়েকটি ড্রেজারকে কয়েক দফায় ধাওয়া দিয়েছে। ধাওয়া খেয়ে ড্রেজার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কয়েকঘণ্টা পর আবারো বালু উত্তোলন শুরু করে। গত ২২ মে এলাকাবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে লাঠি-সোটা নিয়ে ড্রেজারে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করেছিল। স্থানীয় আওয়ামী লীগ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে জোরপূর্বক বালু উত্তোলন করছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
তারা জানায়, ক্ষমতাসীন দলের একটি সিন্ডিকেট ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণে বক্তাবলী ইউনিয়নের প্রায় ৩০টি গ্রাম ও ইটভাটা হুমকির মুখে পড়েছে। অনিয়মতান্ত্রিক বালু কাটার কারণেই এমনটা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের সঙ্গে জেলা পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে ম্যানেজ প্রক্রিয়া থাকার কারণেই বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী তেমনভাবে কিছু করতে পারছে না।
এ বিষয়ে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন জানান, যে এলাকায় ১০/১২টি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে তার সঙ্গেই তার একটি ইটভাটা রয়েছে। তিনি বালু উত্তোলনকারীদের বালু উত্তোলন করতে একাধিকবার বারণ করেছিলেন। কিন্তু তারা শোনেনি। বক্তাবলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, থানা যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেলকে তিনি অসংখ্যবার অনুরোধ জানালেও তারা তা শোনেনি। তারা প্রতিদিন ১০/১২ টি ড্রেজার দিয়ে ৩ লাখ ঘনফুট বালু নিয়ে যাচ্ছে। এতে করে নদীর তীরবর্তী বক্তাবলী এলাকায় ভাঙ্গন দেখা দিচ্ছে। বালু উত্তোলনের ফলে তার মালিকানাধীন আলহাজ্জ নাসিরউদ্দিন এন্ড সন্স (এএনএস) নামক ইটভাটাটি দেবে গেছে। পার্শ্ববর্তী সালাউদ্দিনের মালিকানাধীন ইটভাটাও আংশিক দেবে গেছে বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় তিনি একটি লিখিত অভিযোগ দিলেও পুলিশ অদ্যাবধি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে তিনি জানান।
বক্তাবলী গ্রামের লোকজন জানান, ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদীবেষ্টিত বক্তাবলী ইউনিয়নের গ্রামগুলো মূলত কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। নদীর গতিপথ ও পলিমাটি ভরাটের মতো প্রকৃতির খামখেয়ালী আচরণে ভাগ্যের নিয়তি মেনে গ্রামবাসীকে নদীর আচরণের দিকে চেয়ে থাকতে হয়। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ক্ষমতাসীন দলের একটি গ্রুপ সিন্ডিকেট করে বুড়িগঙ্গা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। এতে করে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলো দিন দিন ভাঙ্গনের কবলে পড়ে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। কৃষি জমি হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। এলাকার কৃষিকাজে নির্ভর পরিবারগুলো কাটাচ্ছে চরম দুর্বিষহ আর আতঙ্কিত জীবন। তাছাড়া নদীর তীরে থাকা ইটভাটাগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।
এর আগেও বক্তাবলী ও আলীরটেক এলাকার বালু উত্তোলন নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছে। এলাকাবাসী কয়েকবার বালু উত্তোলনকারী ড্রেজারের ওপর হামলাও চালায়। ঘাটের পাশে নদীর তীর ঘেঁষে ডজন খানেক ড্রেজার দিয়ে মাটি কাটায় নদী ভাঙ্গনের ঝুঁকি রয়েছে। নদীর তীর ঘেঁষে ইট খোলা, বসত বাড়ি, ফসলী জমি রয়েছে। এলাকাবাসীর বরাত দিয়ে তিনি আরো জানান, ইটখোলা মালিক ও এলাকাবাসীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে লাঠি-সোঠা নিয়ে ধাওয়া করে ড্রেজারগুলো নদী থেকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়।
জানা গেছে, আগে আসলাম শিকদার নামের এক ব্যক্তি বালু উত্তোলন করেছিল। কিন্তু গত ২৭ মার্চ এলাকাবাসী ওই বালু উত্তোলনকারীদের ধাওয়া দেয়। পরে থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এহসানুল হক নিপু, ফতুল্লা থানার যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেল, থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শরীফ মোহাম্মদ প্রমুখ মিলে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে সেখানে ১২-১৫টি ড্রেজার দিয়ে প্রতিদিন বালু উত্তোলন করছে।
এ ব্যাপারে বালু উত্তোলনকারী সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেলের দাবি, ফতুল্লা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শরীফ মোহাম্মদের প্রতিষ্ঠান প্রশাসন থেকে বৈধ ইজারা নিয়ে বালু উত্তোলন করছে। পুরো বিষয়টি বৈধ। নিয়ম মেনে নিয়েই বালু কাটা হচ্ছে।
ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মতিন জানান, বালু উত্তোলনকারীদের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। শরীফ বালু উত্তোলনে অনুমতি পেয়েছে। তবে কতটুকু পরিমাণ জায়গায় বালু উত্তোলন করতে পারবে তা আমাদের জানা নেই। এ বিষয়টি দেখার দায়িত্ব এসি ল্যান্ডের। ওই এলাকায় চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিনের ইটভাটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগে এলাকাবাসী ড্রেজার বন্ধ করে দিয়েছে বলে জানতে পেরেছি।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ হোসেন পনির জানান, বালুমহাল ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন। তাই বৈধতার বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। তবে ওই এলাকায় বালু উত্তোলন নিয়ে কিছুদিন ধরেই বিক্ষোভ চলছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।

