Quantcast
ঢাকা, মঙ্গলবার 5 June 2012, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, ১৪ রজব ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ১৪৬৭ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

৩নং সাক্ষীর জেরা বাকী থাকতেই সালাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে জবানবন্দী দিলেন ৪নং সাক্ষী

কাকাকে বিপদে রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া গৌরাঙ্গ এখন নতুন সিংহ হত্যার বিচার চায়

৩নং সাক্ষীর জেরা বাকী থাকতেই সালাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে জবানবন্দী দিলেন ৪নং সাক্ষী

কাকাকে বিপদে রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া গৌরাঙ্গ

এখন নতুন সিংহ হত্যার বিচার চায়

স্টাফ রিপোর্টার : পাকিস্তানী সৈন্যরা গাড়িতে করে আসলো। নিজের কাকাকে রক্ষা না করে নিজে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিলেন সাক্ষী গৌরাঙ্গ সিংহ। তার কাকা কুন্ডেশ্বরী ঔধষালয়ের মালিক নতুন চন্দ্র সিংহের লাশেরও সৎকার না করে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রেখে নিজে জীবন বাঁচাতে অন্যত্র সরে গিয়েছিলেন নিরাপদ জায়গায়। সেই গৌরাঙ্গ সিংহ ৪১ বছর পর এখন ট্রাইব্যুনালে এসেছেন বিচার চাইতে। আর সেই বিচার তিনি হত্যাকারী পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সদস্যদের চাননি। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে তিনি সাক্ষী দিতে এসেছেন।

গতকাল সোমবার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এজলাসে বসলে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিপক্ষের ৪নং সাক্ষী গৌরাঙ্গ সিংহকে হাজির করা হয়। সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী এডভোকেট আহসানুল হক হেনা এবং ব্যারিষ্টার ফখরুল ইসলাম এতে আপত্তি জানিয়ে বলেন, ৩নং সাক্ষীর জেরা অসমাপ্ত রয়েছে। আগে তার জেরা শেষ করার পরে ৪নং সাক্ষীর জবানবন্দী হতে পারে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক বলেন, পরবর্তী দিবসে যদি ৩নং সাক্ষী না আসে তাহলে আইন অনুসারে যা হয় তাই হবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এডভোকেট হেনা বলেন, আমরা ৪নং সাক্ষীকে জেরা করার জন্য প্রস্তুত নই। চেয়ারম্যান বলেন, তাহলে জবানবন্দীটা হোক। জেরার জন্য সময় দিবো। ট্রাইব্যুনালের এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ৪নং সাক্ষী হিসেবে গৌরাঙ্গ সিংহের জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। পরে তাকে একটি প্রশ্ন করেন এডভোকেট হেনা। আগামীকাল বুধবার তার জেরার দিন ধার্য করা হয়েছে।

গৌরাঙ্গ সিংহের জাবনবন্দী নিম্নরূপ:

আমার নাম গৌরাঙ্গ সিংহ, আমার বয়স ৭৩ বছর। আমার পেশা কৃষি কাজ। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিলো ৩২/৩৩ বছর। ১৯৭১ সালে আমি বাড়িতেই থাকতাম। আমার বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানাধীন গহিরা গ্রামের কুন্ডেশ্বরীতে। কাকা নতুন চন্দ্র সিংহ এবং বাবা-মা একান্নবর্তী পরিবারে আমরা বাস করতাম। আমার কাকা নতুন সিংহের সাথে আমি সব সময় থাকতাম। তার কাজে সহযোগিতা করতাম। নতুন চন্দ্র সিংহের কুন্ডেশ্বরী ওধুধের কারখানা ছিলো, প্রাইমারী স্কুল ছিল, মহিলা স্কুল, মহিলা কলেজ ছিল। কৃষিকাজ ছিল। এর বাইরেও তিনি সামাজিক কাজকর্ম করতেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি বাড়িতেই ছিলাম। ৩০ চৈত্র ইংরেজি কত তারিখ ছিলো তা আমার মনে নেই। ঐদিন আমি, ভজহরি কর্মকার, গোপাল দাস, কাকা নতুন চন্দ্র সিংহ কুন্ডেশ্বরীতে ছিলাম। ঐদিন আমার কাকাকে নিরাপত্তার জন্য অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। উনার সাথে কথা বলেছিলাম। হঠাৎ দেখলাম মিলিটারি আসছে। তখন সময় ছিলো ৯টা/সাড়ে ৯টা। গাড়ি থেকে প্রথম সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আমাদের দেশের কয়েকজন লোক নামলেন। সাথে ছিলো পাকিস্তানী আর্মি। দেশীয়দের মেধ্যে আমি মাবুদ চিনতে পারি। তখন আমি, মহাদেব সিংহ, মনোরঞ্জন সিংহ আমরা ৩ জন বাড়ির পাশে দক্ষিণ দিকে জঙ্গলের ভেতরে পালিয়ে যাই। অন্য ২ জন অজয় পাল, গোপাল দাস মন্দিরের পাশে চলে যায়। দোতলায় তখন পাঞ্জাবীরা নতুন চন্দ্র সিংহের সাথে বোধ হয় কথা বলে চলে যায়। ১০ মিনিট পরে আমরা গাড়ির শব্দ পাই। বুঝনলাম তারা আবার আসলো। তারপর গুলীর শব্দ শুনতে পেলাম। বোধ হয় স্টেনগানের গুলী হবে। ২/৩ মিনিটের মধ্যে আবার ৩টি গুলীর শব্দ শুনি। তখন ভাবলাম এখানে থাকা নিরাপদ হবে না। তখন আমরা দক্ষিণ দিকে চলে গেলাম। ফিরে আসলাম। আমাদের বাড়ির পূর্বপাশে একটি মুসলমান বাড়ি আছে। আমাদের বিশ্বস্থ আহমদ বশকে কাকার খবর নিতে পাঠালাম। উনি খবর নিয়ে এসে বললেন, কাকাতো মারা গেছেন। রক্তাক্ত অবস্থায় মন্দিরের সামনে পড়ে আছেন। খবর শুনে আমরা মন্দির থেকে ত্রিপল এনে উনাকে ঢেকে দিলাম এবং আমরা চলে গেলাম। নতুন চন্দ্রের লাশ ঢেকে দেয়ার সময় আমার সাথে ছিলেন হিমাংশু, ভাস্কর বড়ুয়া, বশর। কাকার মাথার বাম পাশে ও বুকের বান পাশে গুলীর আঘাত দেখতে পাই। আমরা লাশ ঢেকে দিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে যাই এবং আমি আমার শ্বশুর বাড়ি বিনাজুরি চলে যাই। পরের দিন আমি শ্বশুর বাড়ি থেকে রামগড় হয়ে ভারতে চলে যাই।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ৮/১০ দিন পরে আমি বাড়িতে ফিরে আসি। আমার ভাইয়ারা ফিরে আসে। আমার সাথে সত্যরদ্ধন সিংহ ছিল। প্রফুল্ল সিংহও এ সময় এসেছিল। পরিবারের নারী, শিশু ও অন্য সদস্যরা ভারতে থেকে যায়। তাদের অবস্থা তখন জানতাম না। আমরা আসার একদিন পরে ব্রজহরি কর্মকার ও গোপাল দাস আমাদের কাছে আসে। তার কাছ থেকে শুনি যে ঘটনার দিনে সে ও গোপাল দাস দোতলায় ছিলো। সেখান থেকে তারা দেখেছে যে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী, সংঙ্গে কিছু বাঙালী ও পাঞ্জাবী সৈন্য বাড়িতে ঢুকে নতুন চন্দ্র সিংহের সাথে কথা বলে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে তারা আবার আসে। তখন মন্দির থেকে কাকাকে টেনে হেঁচড়ে নামিয়ে আনে এবং পাঞ্জাবীরা ব্রাশ ফায়ার করে। তার পর ২ মিনিটের  মধ্যে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে গুলী করে। পরে তারা চলে যায়। নতুন চন্দ্রের লাশ ২/৩ দিন ওভাবেই ছিল। এলাকার চেয়ারম্যান আমানত খা এসে লাশ দেখতে পেয়ে বরুরা পাড়া এবং অন্যান্য স্থান থেকে কয়েকজন লোক ডেকে এনে নিজে উপস্থিত থেকে কাকার লাশের সৎকার করেন। দেশ স্বাধীনের পরে আমাদের পরিবারের সদস্যরা সবাই ফিরে আসার পর সত্যবাবু রাউজান থানায় মামলা করেন। ঐ মামলায় কি হয়েছে আমি জানি না। এখানে যাদের নাম বলা হয়েছে তাদের মধ্যে আমি আর প্রফুল্ল বাবু ছাড়া কেউ জীবিত নেই। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের কাছে আমি কুন্ডেশ্বরীতে জবানবন্দী দিয়েছি। আসামী সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী এখন এখানে উপস্থিত আছেন।

প্রশ্ন ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় সালাহ উদ্দিন  কাদের চৌধুরী ছাড়া আর কেউ নেই?

উত্তর : জি।