|
|
কারামুক্ত হওয়ার পর প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে মির্জা ফখরুল
স্টাফ রিপোর্টার : সরকার মিথ্যা মামলা দিয়ে ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের কারাগারে পাঠিয়ে আন্দোলন সীমিত রাখার চেষ্টা করলেও তা হিতে বিপরীত হয়েছে বলেই মনে করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সরকারের এ ব্যর্থ চেষ্টায় তারা লাভবান হয়নি, বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে এর ফলে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। আমরা আশা করছি, সরকার এসব অপকর্ম বন্ধ করে অবিলম্বে জনগণের দাবি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করবে। কেননা তত্ত্বাবধায়ক সরকার তারাই বাতিল করেছে। তাদেরকেই পুনর্বহাল করতে হবে।
প্রায় এক মাস কারাবাসের পর মুক্তি পেয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে উত্তরায় নিজের বাসায় প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা ফখরুল আরো বলেন, জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের এভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে একসঙ্গে আটকিয়ে রাখা নজিরবিহীন। আটক নেতাদের কাউকে কাউকে মুক্তি দিয়ে আবার অন্য মামলায় গ্রেফতার করা হচ্ছে। সরকারের এই কৌশলের উদ্দেশ্য বিরোধী দলকে হতোৎদ্যম করে দেয়া। কিন্তু সরকারের এই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ভেতরে-বাইরে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হয়ে গেছে।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির লক্ষ্য নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন করা। তারা আশা করছেন, সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে এবং বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার বেঁধে দেয়া দুই মাস সময়ের মধ্যে দাবি মেনে নিয়ে সংলাপে বসবে। তা না হলে ঈদের পর আন্দোলনের কঠোর কর্মসূচি আসবে, বলেন তিনি।
হরতালের একটি মামলায় ফখরুলসহ ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। ওই মামলায় হাইকোর্টে জামিন পাওয়ার চার দিন পর গত বৃহস্পতিবার রাতে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান মির্জা ফখরুল।
কারামুক্ত নেতাকে শুভেচ্ছা জানাতে বিএনপি নেতাকর্মীরা সকাল থেকেই ফুল হাতে তার উত্তরার বাসায় ভিড় জমাতে থাকেন। নিজের ‘ড্রইং রুমে' বসে ২৮ দিনের কারাবাস, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, চলমান আন্দোলনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে সরকার ভুল করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এরকম মিথ্যা মামলা দিয়ে সরকারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জনগণ তাদের অপকৌশল বুঝে গেছে।
সেই দিন দূরে নয় : বিএনপির আন্দোলন সম্পর্কে মির্জা ফখরুল বলেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এমন সব ইস্যু তৈরি করেছে, যাতে আমাদের আন্দোলন করা ছাড়া আর বিকল্প নেই। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি এই সরকারই বাতিল করেছে। তাদেরই আবার তা পুনর্বহাল করতে হবে। তিনি মনে করেন, এখন পর্যন্ত আন্দোলন সঠিক পথেই এগোচ্ছে। গত ১১ জুন নয়া পল্টনের গণসমাবেশ থেকে বেগম খালেদা জিয়া সরকারকে দুই মাসের যে সময় দিয়েছেন, তাকে বিএনপির দুর্বলতা ভাবাও ঠিক হবে না বলে মনে করেন তিনি। বলেন, আমাদের দুই মাসের কর্মসূচি দেখে ভুল বোঝার কোনো অবকাশ নেই। আমরা পিছটান দেইনি, বরং সরকারকে দুই মাস সময় দেয়া হয়েছে, যাতে তাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়। নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে আসতে পারে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসিচব বলেন, সরকার আগে নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার কথা সরাসরি নাকচ করে দিলেও এখন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে আলোচনার কথা বলছে। দেরিতে হলেও সরকার এই জায়গায় এসেছে। যদিও সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে কিছু নেই। আমরা মনে করি, সেই সময় দূরে নয়, যখন সরকার বাধ্য হবে নির্দলীয় সরকারের জায়গায় আসতে। সংলাপে বসার গুরুত্ব সরকার যত দ্রুত অনুধাবন করতে পারবেন, ততোই দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
নাজমুল হুদা প্রসঙ্গ : ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার দলত্যাগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, তিনি বয়স্ক ব্যক্তি। আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমি শুধু বলতে চাই, বিএনপি একটি বিশাল প্রবাহমান নদীর মতো। এতে কিছু খড়-কুটো ভেসে গেলে নদীর কিছু আসবে-যাবে না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল। এখানে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে তাই বলে দল ভাঙার কোনো সুযোগ নেই। দল থেকে কেউ বেরিয়ে যেতে পারেন। যেমন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। কিন্তু এতে দল ভাঙবে না, বিভক্তও হবে না। মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকার সামরিক সরকারের মতো করে দল ভাঙার কাজ করছে বলে প্রচারণা আছে। আমরা আশা করব, আওয়ামী লীগ দল ভাঙার এ রকম কৌশল নেবে না।
সম্প্রতি প্রধামন্ত্রী দেশে এখনো ‘মাইনাস টু ফর্মূলা' বাস্তবায়নের ষড়যন্ত্র চলছে বলে যে মন্তব্য করেছেন, সে সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশে কেউ কখনো ‘মাইনাস টু ফর্মূলা' বাস্তবায়ন করতে পারবে না। তবে এ ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধভাবে ও মিলেমিশে একসঙ্গে কাজ করা উচিত।
২৮ দিনের কারাবাস : মির্জা ফখরুল ইসলাম জানান, কাশিমপুর কারাগারে দিনে ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। তাকে চারটি পত্রিকা পড়তে দেয়া হতো। বিটিভি ছাড়া অন্য কোনো টেলিভিশন চ্যানেল দেখার সুযোগ ছিল না। কাশিমপুর কারাগারের ভেতরের পরিবেশ ‘তুলনামুলক ভালো' বলে মনে হলেও আটকের পর প্রথম দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাদের বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে বলে জানান তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, ১১ জুন গণসমাবেশের আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারিনি, এতে আমি দুঃখ পেয়েছি। তবে এই গণসমাবেশে ১২ মার্চের মতো ব্যাপক মানুষের সমাগম ঘটেছে। এতে আমিসহ কারাগারে আটক নেতারা উজ্জীবিতও হয়েছি।

