|
|
মিসরে দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে ড. মোহাম্মদ মুরসি নির্বাচিত হওয়ার পর উল্লসিত সমর্থকদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছেন -ইন্টারনেট
সংগ্রাম ডেস্ক : মিসরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রভাবশালী ও ঐতিহ্যবাহী মুসলিম ব্রাদারহুড প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসী বিজয়ী হয়েছেন বলে দাবি করেছে ব্রাদারহুড। বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত নির্বাচনী ফলাফলে জানা যায়, মুসলিম ব্রাদারহুড প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসী তার প্রতিদ্বনদ্বী হোসনী মোবারক আমলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ শফিকের চেয়ে ১০ লক্ষাধিক ভোট বেশি পেয়ে প্রেসিডেন্ট হবার পথে এগিয়ে রয়েছেন। মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যবেক্ষক কমিটির একজন সদস্য ব্রাদারহুড প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসীর এগিয়ে থাকার কথা নিশ্চিত করেছেন। এদিকে আহমদ শফিকের সমর্থকরা ব্রাদারহুডের দাবি করা ফলাফল মেনে নেবে না বলে জানিয়েছে।
মিসরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মোট ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে মুসলিম ব্রাদারহুড প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসী জয়ী হয়েছেন বলে দাবি করেছে তার দল। এছাড়া বেসরকারিভাবে প্রকাশিত ফলাফলেও তিনি এগিয়ে রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। শনিবার ও রোববার দু'দিনে মিসরে দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সম্পন্ন হয়। বেসরকারিভাবে পাওয়া নির্বাচনী ফলাফলে জানা যায়, মুসলিম ব্রাদারহুড প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসী তার প্রতিদ্বনদ্বী মোবারক আমলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ শফিকের চেয়ে ১০ লক্ষাধিক ভোট বেশি পেয়ে প্রেসিডেন্ট হবার পথে অনেকখানি এগিয়ে রয়েছেন।
গতকাল সোমবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে মুসলিম ব্রাদারহুড নির্বাচনে এখন পর্যন্ত তাদের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসী বেসরকারিভাবে পাওয়া ফলাফলে জয় লাভ করেছেন বলে জানায়। দেশজুড়ে মোট ১৩ হাজার ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১২ হাজার ৯৯৩ টি কেন্দ্রেই তিনি আহমেদ শফিকের চেয়ে বিপুল ভোটে এগিয়ে আছেন। বেসরকারিভাবে পাওয়া এক ফলাফলে জানা যায়, এ পর্যন্ত মুরসী পেয়েছেন মোট এক কোটি ৩২ লাখ ৩৭ হাজার ভোট। অন্যদিকে তার প্রতিদ্বনদ্বী আহমদ শফিক পেয়েছেন এক কোটি ২৩ লাখ ৩৮ হাজার ভোট।
কায়রো থেকে রয়টার্স জানায়, মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যবেক্ষক কমিটির একজন সদস্য সোমবার নিশ্চিত করেছেন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী মুরসী এগিয়ে রয়েছেন। তবে ইতোমধ্যে ব্রাদারহুডের ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি তাদের ওয়েবসাইটে মুরসী জয়ী হয়েছেন বলে দাবি করেছে। ওয়েবসাইটে তারা দাবি করেছে, মুরসী হলেন মিসরের প্রথম সরকারিভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। কায়রোতে ব্রাদারহুড কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মুরসীর প্রচার কর্মকর্তা আহমদ আব্দেল আত্তি জানান, মুরসী ৫২.৫ শতাংশ ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আহমদ শফিক ৪৭.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। আর এটা হলো ৯৮ শতাংশ ভোট কেন্দ্রের ভোট গণনার পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষিত প্রাথমিক ফলাফল। ফলাফল ঘোষণার পর ‘সামরিক শাসনের পতন' বলে চিৎকার করে ওঠে তাদের সমর্থকরা।
সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ মুরসী মিসরের সব মানুষের প্রেসিডেন্ট হওয়ার অঙ্গীকার করে জানান, তিনি কোনো প্রতিশোধ নেবেন না।এদিকে বেসরকারিভাবে পাওয়া ফলাফল জানাজানি হতেই মুরসির সমর্থকরা সকাল থেকে কায়রোসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আনন্দ প্রকাশ করছে। তারা মিছিল করে মুরসির নামে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। এই বিশাল জয়ে মোহাম্মদ মুরসিও তার সমর্থক শুভানুধ্যায়ীদের ধন্যবাদ জানাতে ভুলেননি।
এক প্রতিক্রিয়ায় মুরসি বলেন, আল্লাহকে ধন্যবাদ যে তিনি মিসরের জনগণকে সঠিক, স্বাধীন এবং গণতন্ত্রের পথে যাবার নিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি নির্বাচনে জয়ের পেছনে তার দলের কর্মী, সমর্থক এবং পরিবারের সদস্যদেরও ধন্যবাদ দেন। তিনি একটি গণতান্ত্রিক সাংবিধাকি এবং আধুনিক মিসর গড়তে কাজ করে যাবেন বলে জানান। মুরসি দেশে বিগত সময়ের জন্য কোনো ধরনের প্রতিশোধে না গিয়ে মিসরের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন।
অন্যদিকে নির্বাচনী ফলাফরের ব্যাপারে আরেক প্রার্থী ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক হোসনি মুবারকের আমলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ শফিকের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এদিকে মিসরের নির্বাচন নিয়ে গত দু'দিন সবার মাঝে বেশ উৎকণ্ঠা থাকলেও পরে সেসব কেটে গেছে। দেশটির কোথাও থেকে তেমন কোনো গোলোযোগের সংবাদ পাওয়া যায়নি। জনগণকে গত দু'দিন শান্তিপূর্ণ এবং সুশৃংখলভাবে ভোট দিতে দেখা গেছে। চলতি সপ্তাহের শেষে সরকারিভাবে মিসরে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। এরপর জুলাইয়ের নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাতে বর্তমান সামরিক সরকার ক্ষমতা তুলে দেয়ার কথা রয়েছে।
এর আগে গতমাসে মিসরে প্রথম দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কোনো প্রার্থী একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রথমদফা নির্বাচনেও মোহাম্মদ মুরসি আহমেদ শফিকের চেয়ে ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।
আল জাজিরা জানায়, মুসলিম ব্রাদারহুড মোহাম্মদ মুরসিকে মিসরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দাবি করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উৎফুল্ল জনতা। কায়রোর তাহরির স্কোয়ারে সমবেত হতে থাকে। তাহরির স্কোয়ারে সংঘঠিত তীব্র গণআন্দোলনের ফলে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক পদত্যাগ করতেও বাধ্য হন। কায়রো থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা জানায়, ২১ জুন প্রেসিডেন্ট নির্বচানের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তবে আমরা আগের বহু নির্বাচনে দেখেছি নির্বাচনী কেন্দ্রসমূহে প্রভাবশালী মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিনিধি থাকেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের দেয়া তথ্যই নিখুঁত হয়ে থাকে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর দেয়া তথ্যমতে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে মুসলিম ব্রাদারহুডের মুরসি।
আহমেদ শফিকের সমর্থকরা অবশ্য মুসলিম ব্রাদারহুডের ঘোষিত এ ফলাফল মেনে নেবে না বলে জানিয়েছেন। তারা চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে চায়।
মিসরের খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে মুরসি বলেন, আমি কোন প্রতিশোধ নিতে চাই না। বরং আমি সকল মিসরীয়র জন্য কাজ করার শপথ করছি।
এদিকে গত রোববার নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সংক্রান্ত নতুন সাংবাবিধানিক অধ্যাদেশ জারি করেছে মিসরের সুপ্রিম কাউন্সিল অব দ্যা আর্মড ফোর্সেস (এসসিএএফ)। নতুন এ অধ্যাদেশ অনুসারে প্রেসিডেন্ট এসসিএএফ'র অনুমতি সাপেক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনীকে আহবান করার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে প্রেসিডেন্টকে। তবে খসড়া সংবিধানটির ৫৬ অনুচ্ছেদের প্রথম ধারা অনুসারে নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত দেশের শাসনভার এসসিএএফ'র হাতেই থাকবে। প্রসঙ্গত, সাবেক স্বৈরাচারী শাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর পুরনো সংবিধানকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে নতুন সংবিধান প্রণয়নের চেষ্টা করেও মতৈক্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয় মিসরের রাজনৈতিক দলগুলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত রোববার এসসিএএফ একটি খসড়া সংবিধান প্রকাশ করে। সংবিধান প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করার জন্য পার্লামেন্টে ১শ' জনের একটি দলকে অনুমোদন দেয়া হবে বলে জানা যায়। তবে মুসলিম ব্রাদারহুড তাদের এক তাৎক্ষণিক টুইটার বার্তায় এসসিএএফ'র প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সংক্রান্ত ঘোষণাকে অসাংবিধানিক এবং অকার্যকর বলে অভিহিত করেছে।

