|
|
স্টাফ রিপোর্টার : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ সংশোধন করে ‘ব্যক্তি' ও ‘ব্যক্তিবর্গ' শব্দ যুক্ত করার বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদনে বিভক্ত আদেশের পর এবার হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ রিট আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি মোয়াজ্জেম হোসেন এই খারিজ আদেশ দেন। আদেশে বলা হয় জনস্বার্থে এই রিট আবেদন চলতে পারে না। রিট আবেদনকারীর লুকাস্ট্যান্ডি নেই তা করার। এর আগে গত ১৩ মে হাইকোর্টেও ডিভিশন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফরিদ আহাম্মদ রুল জারি করলেও কনিষ্ঠ বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন। বিভক্ত আদেশের প্রেক্ষিতে রিট আবেদনটি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিত্তির জন্য তৃতীয় বেঞ্চ হিসেবে বিচারপতি মোয়াজ্জেম হোসেনকে দায়িত্ব দেন। জনস্বার্থে চট্টগ্রামের আইনজীবী মোরশেদুর রহমান চৌধুরী হাইকোর্টে রিটটি দায়ের করেছিলেন।
রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন দেশের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী টিএইচ খান। তার সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম। সরকার পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
পরে এটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩ (২) ধারা সংশোধনীর বৈধতা প্রশ্নে রিটটি করা হয়েছিলো। আদালত খারিজ করে দিয়েছেন। এর আগেও এ সংক্রান্ত আরো চারটি মামলার নিত্তি করেছেন হাইকোর্ট। ১৯৭৩ সালের আইনে সশস্ত্র বাহিনী এবং সহায়ক বাহিনীর সদস্যদের বিচারের জন্য আইনটি করা হয়েছিলো। ২০০৯ সালে এর সঙ্গে ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিচার করার বিধান যুক্ত করা হয়।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে এ সংশোধনী করা হয়েছে। এখানে মূল আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি। আর এখানে মৌলিক অধিকারের দোহাই দেয়া যাবে না। এছাড়াও এ আইনে বিচার ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।
২০০৯ সালের ১৪ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ সংশোধন করে ‘ব্যক্তি' ও ‘ব্যক্তিবর্গ' শব্দ যুক্ত করে। এরপর জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও সাবেক মন্ত্রী বিএনপি নেতা আবদুল আলীমকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনে। এই সংশোধনীর বলেই এখন তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করছে সরকার। আইন সংশোধনের আগে ১৯৭৩ সালে করা আইন শুধুমাত্র ১৯৭১ সালে চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা সদস্যের জন্য করা হয়েছিল।
গত ১৩ মে দেয়া বিভক্ত আদেশে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ সংশোধন করে ‘ব্যক্তি' ও ‘ব্যক্তিবর্গ' যুক্ত করা সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না এবং পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ১৯ ধারা অনুসারে সংবিধানের ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদে ‘কোন ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গ বা সংগঠন যুক্ত করা কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না- রুলে তা জানতে চান। সরকারের আইন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিবকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। কনিষ্ঠ বিচারপতি জনস্বার্থে রিট আবেদনকারীর ‘লুকাস্ট্যান্ডি' নেই বলে রিট আবেদন খারিজ করেন।
ওইদিন আদেশের পর বিচারপতি টিএইচ খান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মহাজোট সরকারের আমলে অহরহ হাইকোর্টে বিভক্ত আদেশ দেয়া হচ্ছে। মনে হচ্ছে হাইকোর্টে দ্বিমতের বিস্ফোরণ ঘটেছে। পত্রিকা খুললেই দ্বিমত, দ্বিমত, দ্বিমত। আমার ৬০ বছরের আইন পেশায় রুল, জামিন নিয়ে দ্বিমতের এমন ঘটনা আগে দেখিনি। দেশের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, আদালত মানুষের আশা-ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল। আদালতেও যখন মানুষ বিচার পায় না তখন আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় থাকে না। তিনি বলেন, আমরা কিছু সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলাম। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেছেন, হাইকোর্টই সাংবিধানিক প্রশ্ন সুরাহার সর্বোচ্চ আদালত। এজন্য বিষয়টি পরীক্ষার জন্য তিনি রুল জারি করেছেন। এর আগে আদেশের পর টিএইচ খান দু'বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আল্লাহ আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার তাওফিক দিন (যে, আল্লাহ ব্লেস আস টু সেন্স অব জাস্টিস)।
এই রিট আবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক আপরাধ আইন ২০০৯ সংশোধন করা হয়। ওই সংশোধনী আইনের ধারা ৩ (১) ও ৬ (২) পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৫ জন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য সংবিধানের প্রথম সংশোধনী আনা হয় এবং ওই সংশোধনীর আলোকে ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্ট ১৯৭৩ করা হয়। '৭৩ সালের ওই আইনের ৩ (১) ধারায় তিন শ্রেণীর মানুষের যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচারের আওতায় আনার বিধান ছিল। এই তিন শ্রেণী হল সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং সহায়ক বাহিনী।
কিন্তু ২০০৯ এর সংশোধনী আইনের ৩ (১) ধারায় বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের যুদ্ধাপরাধের বিচারের আওতায় আনার উদ্দেশে দেশের নাগরিকদের মধ্য থেকে পৃথক কোন ব্যক্তি এবং ব্যক্তিবর্গকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা ১৯৭৩ সালের আইনে ছিল না। যা সংবিধানের প্রথম সংশোধনী এবং সংবিধানের ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদে ছিল না।

