|
|
সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সংকট
শাহেদ মতিউর রহমান : অব্যাহত গ্যাস বিদ্যুতের সংকট আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাংলাদেশে বিনিয়োগের গতিতে খরাভাব কাটছে না। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক তাদের এক রিপোর্টে দেখিয়েছে বাংলাদেশে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগেও এই খরাভাব চলছেই। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শিল্পায়ন আর বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের ভ্রান্ত জ্বালানি নীতি। বিদ্যুৎ আর গ্যাস সংকট সামাল দিতে পারলে এদেশে আরো অনেক বেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হতো বলেও বিশ্বব্যাংক তাদের এই রিপোর্টে উল্লেখ করেছে।
এদিকে বিনিয়োগ বোর্ডের একটি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশী এবং বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বন্দর ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে দেশী-বিদেশী সব বিনিয়োগকারীরা। পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাংকের উচ্চ সুদের হারতো রয়েছেই। আর এসব সামগ্রিক কারণেই দেশের এফডিআই (সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ) প্রবাহও আশঙ্কাজনকহারে কমতে শুরু করেছে। সরকারের ভ্রান্ত জ্বালানি নীতিও বিদেশী বিনিয়োগকে মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহীত করেছে।
সূত্র জানায়, গত কয়েক মাসের গড় হিসেবে এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ এফডিআই এর তুলনামূলক বিশ্লেষণে সারণীর নিম্ন সারিতে অবস্থান করছে। এছাড়া তৈরি পোশাক খাতে বিনিয়োগকারীরা রয়েছে নানা সংকটে। সরকার এ খাতে জরুরিভিত্তিতে নজর না দিলে মহাসংকটে পড়বে পুরো শিল্পখাত। এছাড়া গত সপ্তাহে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম এলাকা আশুলিয়া এবং নাঃগঞ্জের কাঁচপুর এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভের নামে টানা দশ দিন সকল শিল্প কারখানা বন্ধ থাকায় এ খাতের অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে বলেও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দরা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টস এসোসিয়েশন বিজিএমইএ‘র নেতৃবৃন্দ সাংবাদিক সম্মেলন করে তাদের এই ক্ষতির কথা সরকারকে জানিয়েছেন।
এদিকে দেশের অব্যাহত গ্যাস সংকট কাটাতে সরকার কার্যকর কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না বলেও বিনিয়োগকারীরা অনেকে অভিযোগ করেছেন। বর্তমানে দেশে গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প-কারখানায় উৎপাদনের পরিমাণ যেখানে ক্রমেই কমছে এবং এই সংকটের ফলে নতুন কোন শিল্প কারখান স্থাপন করাও সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু গ্যাসের এই সংকটের মধ্যেও নতুন গ্যাস ক্ষেত্রে ৪টি কূপ খননের উদ্যোগ দীর্ঘ দিনেও কাজে আসছে না।
ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ জানান, দেশের অর্থনীতির ক্রমবিকাশে বিদেশী বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিল্পায়ন আর শিল্পনির্ভর অর্থনৈতিক বিকাশে বিনিয়োগ অনেকাংশে নির্ভর করছে। কিন্তু দিন দিন বিদেশী বিনিয়োগ কমছে। বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে ২০১২ সালে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছে ১২২ অথচ ২০১১ সালে এই অবস্থান ছিল ১১৮। বিশ্বব্যাংক তাদের রিপোর্টে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছে গ্যাস সংকট আর বিদ্যুৎ সংযোগ প্রাপ্তিতে সমস্যা। এছাড়া দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাও বিনিয়োগ প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
সূত্র আরো জানায়, বিদ্যুৎ আর গ্যাসের সংকটে নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। আগের স্থাপিত কারাখানাগুলো তাদের নিয়মিত উৎপাদনও এখন আর ধরে রাখতে পারছে না। এতে করে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার পোশাক কারখানা আরো সংকটে পড়বে। বিজিএমইএ'র নেতৃবৃন্দ পোশাক শিল্প আধুনিকায়ন করার জন্য গার্মেন্ট শিল্প পার্ক স্থাপনের ব্যাপারে সরকারের সহায়তাও কামনা করেছেন। সম্প্রতি তারা মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার বাউসিয়ায় ৩শ' একর জমিতে শিল্প পার্ক স্থাপনের প্রকল্পের কথা সরকারকে জানিয়েছেন। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এখনো ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে ইতিবাচক কোন সাড়া দেননি।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, অনেক সংকট পেরিয়ে তারা পোশাক শিল্পকে ধরে রেখেছে। সরকার যদি রফতানি কর, ইটিপি স্থাপনসহ ব্যাংকের সুদের হার কমাতে সহায়তা করে তাহলে এখাতে বিনিয়োগকারীরা একটু স্বস্তি পাবে। অন্যথায় ম্রিয়মাণ কলকারখানাগুলো চালু রাখতে আর কোন বিকল্প পথ পাবে না ব্যবাসায়ীরা।

