|
|
সরকার পক্ষের উপস্থাপনায় না থাকলেও স্ব-উদ্যোগে বিবেচনায় নেয়ায় আইনজীবীর প্রতিবাদ
শহীদুল ইসলাম : বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের নেতৃত্বে গঠিত ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ৭ম বারের মতো খারিজ করে দিয়েছেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জামিন আবেদন। যথাযথভাবেই মাওলানা সাঈদীর চিকিৎসা হচ্ছে বিধায় বর্তমানে তার কোন ফ্যামেলি কেয়ার প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলা হয়, এম এ আলীমকে জামিন দেয়া হলেও তার মামলা আর এটা ভিন্ন বিষয়। সরকার পক্ষের যুক্তিতর্কের মধ্যে উল্লেখ না থাকলেও ট্রাইব্যুনাল তার আদেশে স্বপ্রণোদিত হয়ে ২টি বিষয় উল্লেখ করেছেন জামিন আবেদন খারিজ করার যুক্তি হিসেবে। এর একটিতে বলা হয়, প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তিনি ছেলের জানাযার আগে আইন-শৃক্মখলা বাহিনীর বাধা উপেক্ষা করে ১০ মিনিট বক্তৃতা করেছেন। এতে তিনি প্যারোলের শর্ত ভঙ্গ করেছেন। এছাড়াও পিরোজপুরে সরকার পক্ষের একজন সাক্ষীর ছেলের সাথে স্থানীয় পর্যায়ে সংঘটিত একটি ঘটনাকে মাওলানা সাঈদীর জামিন আবেদন খারিজের যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। ওদিকে গতকালও মাওলানা সাঈদীর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনের জেরা হয়েছে।
মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী এডভোকেট তাজুল ইসলাম আদেশের পর এই দুইটি ঘটনাকে জামিন আবেদন নাকচ করার যুক্তি হিসেবে নেয়া বেআইনি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রসিকিউশন যা বলেনি তা আদেশের মধ্যে আনা আইনসম্মত হয়নি। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, আমরা খবরের কাগজ পড়ি না, আমরা টিভি দেখি না। তাজুল ইসলাম বলেন, আপনারা যাই দেখেন সেটা যুক্তি নয়। আপনি আদেশ দিবেন প্রসিকিউশন আর ডিফেন্সের সাবমিশনের ওপর সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেল দেখে নয়। পরে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যন বলেন, আদেশ প্রদান সম্পন্ন হয়েছে। তবে আপনি এই ২টি বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন এই দুইটি থাকবে না।
পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, মাওলানা সাঈদী যখন জীবন মৃত্যুর মাঝামাঝি অবস্থান করছেন তখন জীবনের শেষ ক'টা দিন তার প্রয়োজন ছিল ফ্যামেলি কেয়ার। এজন্য আমরা মানবিক কারণে যে কোন শর্তে জামিন আবেদন করেছিলাম। বিধিতে উল্লেখ আছে যে, ট্রাইব্যুনাল যেকোন স্টেইজে জামিন দিতে পারে। বর্তমানে সাঈদী সাহেব যে অবস্থানে আছেন তাতেও যদি জামিন দেয়া না হয় তাহলে এই জামিনের বিধান রাখার দরকার কি ছিল। এই বিধি তো ট্রাইব্যুনালই তৈরি করেছেন। আব্দুল আলীমকে যে গ্রাউন্ডে শর্ত সাপেক্ষে জামিন দেয়া হয়েছে বর্তমানে মাওলানা সাঈদীর জামিনের গ্রাউন্ড তার চেয়ে অনেক শক্তিশালী। তারপরেও জামিন নাকচ করার আদেশ দেয়া হয়েছে। এটা সঠিক হয়নি। তিনি বলেন, একজন সাক্ষীর ছেলের গাঁজা খাওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি হয়েছে তার দোষও মাওলানা সাঈদীর সমর্থকদের ওপর চাপিয়ে তার জামিন আবেদন খারিজের পেছনে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। কোন সংবাদপত্রে দেখেছেন তিনি যে এর সাথে সাঈদীর সমর্থকরা জড়িত। এটা একটা ডাহা মিথ্যা খবর।
তাজুল ইসলাম বলেন, প্যারোলে মুক্তি পেয়ে ছেলের জানাযার আগে দোয়া করেছেন, কিছু কথা বলেছেন। এটা নাকি প্যারোলের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্যারোলে মুক্তি পেয়েই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তাহলে তিনি কি প্যারোলের শর্ত ভঙ্গ করেছেন।
সরকার পক্ষের আইনজীবী সৈয়দ হায়দার আলী বলেন, যেহেতু সাঈদী সাহেবের সুচিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে সেহেতু তার জামিনের দরকার নেই। তাই আদালত যথাযথভাবেই জামিন আবেনদ খারিজ করে দিয়েছেন। এর আগে গত বছর ২৩ আগস্ট ৬ষ্ঠ বারের মতো মাওলানা সাঈদীর জামিন আবেদন নাকচ করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই বিচারক হলেন, বিচারপতি আনোয়ারুল হক এবং এ কে এম জাহির আহমেদ।
গত বৃহস্পতিবার মাওলানা সাঈদীর জামিন আবেদনের ওপর শুনানি হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আদেশের জন্য গতকাল রোববার দিন ধার্য করেছিলেন। গতকাল দুপুরে এই জামিন আবেদন নাকচ করে প্রদত্ত আদেশের পূর্বে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত ১৯৭১ সালের কার্যত মানবতাবিরোধী অভিযোগের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনকে সোয়া ১ ঘণ্টা জেরা করা হয়। আদালতের প্রদর্শিত পিরোজপুরের বিভিন্ন ঘটনাস্থলের স্থির ও ভিডিও চিত্রের সত্যতা যাচাই বাছাইয়ের মধ্যেই সীমিত ছিল। জেরায় দেখা যায় যে, কথিত ৫ তহবিলের দোকান বোঝাতে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ছবি এবং মাখন সাহার দোকানের নামে যে ঘর দেখানো হয় সেটা তারই লিখিত ক্যাপশনে দেয়া যায় সেটা বিপদ সাহার ঘর। ঘরের বেড়া এবং দরজারও মিল নেই।
গতকাল তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। তাকে সহায়তা করেন এডভোকেট মনজুর আহমেদ আনসারী ও আবু বকর সিদ্দিক।
গতকালের জেরার উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্নরূপ :
প্রশ্ন- যেসব স্থির চিত্র আপনি আদালতে দাখিল করেছেন তা কি সব আপনি পিও (ঘটনাস্থল) থেকে তুলেছেন? না অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করেছেন?
উত্তর- জি।
প্রশ্ন- বস্তু প্রদর্শনীতে উল্লেখিত পিও-৫ এ কটি ছবি আছে। কি বুঝিয়েছেন?
উত্তর- ৫টি। পিও বলতে আমি পিরোজপুর হাসপাতাল ও বলেশ্বর নদীর ঘাট বুঝিয়েছি।
প্রশ্ন- হাসপাতাল থেকে বলেশ্বর নদীর ঘাট কোন দিকে কত দূরে?
উত্তর- অনুমান দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে।
প্রশ্ন : মার্ক-১ এ পিও-৫ এর ছবি বলছে শুধু পিরোজপুর হাসপাতাল বুঝিয়েছেন।
উত্তর : মার্ক-১ এ পিরোজপুর হাসপাতালের ছবি দেখানো হয়েছে। যেহেতু
প্রশ্ন- মার্ক-১ এ কতটি ঘটনাস্থলের ছবি আছে?
উত্তর- ১৮টি ঘটনাস্থলের ২০টি ছবি আছে।
প্রশ্ন- বস্তু প্রদর্শনী-১২ এবং ৫ নং পিও'র মুভি ফাইলে কোনো ডেট টেকেন নেই?
উত্তর- জি।
প্রশ্ন- বস্তু প্রদর্শনী-১২ ও ১৩-এর কোনো মুভি ফাইলের ডেট টেকেন নেই?
উত্তর- জি।
প্রশ্ন- বস্তু প্রদর্শনী-১২তে ৪টি মুভি ফাইল আছে। এর মোডিফাই ডেট বলুন?
উত্তর- ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১২ রাত ৮টা ৪১ মি. ১০ সেকেন্ড। তবে কোন একটি তারিখ সঠিক নয়।
প্রশ্ন- প্রদর্শনী-১২-এর পিও'তে ক'টি স্থিরচিত্র আছে?
উত্তর- ৩টি।
প্রশ্ন- ৩টি ছবির টেকেন বলুন?
উত্তর- প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ছবির ডেট টেকেন যথাক্রমে ১/৪/২০১০ রাত ১২টা, ২২/৯/২০১০ ও ২২/৯/২০১০।
প্রশ্ন- বস্তু প্রদর্শনী-১২, পিও ৬ হিসেবে কোন কোন ঘটনাস্থলের ছবি?
উত্তর- সবই পারেরহাট বন্দর বাজারের ছবি।
প্রশ্ন- এখানে ভিডিও চিত্রের মডিফাইড ডেট কত?
উত্তর- ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১২।
প্রশ্ন- ভিডিওতে কি পুরো পারেরহাট বাজার না আংশিক?
উত্তর- আংশিক।
প্রশ্ন- একটি ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করা হয় কার দোকান?
উত্তর- আই ও বলেন, মাখন সাহার, পরে দেখে বলেন, মদন সাহার দোকান।
প্রশ্ন- এটি একটি দোতলা স্থাপনা?
উত্তর- জি।
প্রশ্ন- উপর তলাটি নীচতলার দেয়ালের ওপর অবস্থিত?
উত্তর- জি।
প্রশ্ন- ২ নং স্থির চিত্রে কি লেখা আছে?
উত্তর- ৫ তহবিল।
প্রশ্ন- এটা আপনি লিখেছেন?
উত্তর- জি।
প্রশ্ন- এই ঘরের দরজা কাটের ফ্রেমের ওপর টিনের দরজা?
উত্তর- জি।
প্রশ্ন- পরবর্তী স্থির চিত্রে লেখা আছে কি?
উত্তর- দেখা যায় ৫ তহবিল। সেটার দরজা কাঠের।
প্রশ্ন- ৫টি মুভি ফাইল এডিট করে আপনি একটি মুভি ফাইল করেছেন?
উত্তর- ৫টি কি না তা আমার মনে নেই। তবে কয়েকটি মুভি ফাইল একত্র করা হয়েছে।
আজ সোমবার পুনরায় জেরা করা হবে তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনকে।

