|
|
নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের
বিডিনিউজ : ব্যাপক বিচার বহির্ভূত হত্যার অভিযোগ থাকা এলিট বাহিনী র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ভেঙ্গে দিয়ে একটি নতুন বেসামরিক বাহিনী গড়ে তোলা এবং বিডিআর বিদ্রোহের বিচার স্থগিতের সুপারিশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
র্যাবের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় সন্দেহভাজন ও অভিযুক্তদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই আহবান জানানো হয়। গতকাল বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে এই প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে নিউইয়র্কভিত্তিক সংস্থা এইচআরডব্লিউর দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, র্যাব ভেঙ্গে দিয়ে পুলিশের মধ্যে একটি অসামরিক ইউনিট বা নতুন সংস্থা তৈরি করা হোক, যারা অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় এর ভিত্তি হিসাবে মানবাধিকারগুলোকে গুরুত্ব দেবে। র্যাব, ডিজিএফআই এবং অন্যান্য সুরক্ষা বাহিনীগুলোর হাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা ব্যাপক নির্যাতন ও খারাপ আচরণের অভিযোগগুলো বিবেচনা করতে প্রকৃত ও অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করারও আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।
ভয় কখনো আমাকে ছেড়ে যায় না : বাংলাদেশ রাইফেলস-এর ২০০৯ বিদ্রোহের পর অত্যাচার, হেফাজতে থাকাকালীন মৃত্যুগুলো এবং অন্যায্য বিচারগুলো শীর্ষক ৫৭ পাতার প্রতিবেদনে বিডিআর সদস্যরা ন্যায় বিচার পাবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হাজতে থাকার সময় কমপক্ষে ৪৭ জন বিডিআর সদস্য নিহত হয়েছেন। এই মৃত্যুগুলোর কারণ হিসেবে নির্যাতনের প্রমাণ পেয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। বিদ্রোহের পর আটক করা বিডিআর সদস্যরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন, স্বীকারোক্তি আদায়ে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সদস্যরা নির্যাতন চালিয়েছে করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিডিআর সদস্যদের নির্যাতন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রায়ই তাদের হাত ও পায়ের পাতায় পেটানো হতো। কয়েক জন জানিয়েছেন, তাদের ছাদ থেকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হতো। যারা এসব নির্যাতন পরও প্রাণে বেঁচে গেছেন, তাদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাদের অনেকেরই কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে অথবা আংশিক পক্ষাগাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।
অনেক অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে, নির্যাতনের কারণে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ব্রাড অ্যাডামস বলেন, ‘‘র্যাব ও অন্যান্য সংস্থা মানবাধিকার লঙ্ঘন করলেও সরকার সামরিক বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করতে ভয় পাচ্ছে।’’
বাংলাদেশে অনেক ‘অনানুষ্ঠানিক আটক কেন্দ্র' রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘এসব আটক কেন্দ্র বন্ধ করা হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অনেক কমে যাবে।’’ হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৪ সালে র্যাব প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক লোক এই বাহিনীর সঙ্গে কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৩ জন নিহত হন। বাহিনীটির সারা দেশে স্থাপিত বিশেষ আদালতগুলো ওই বিদ্রোহ ও হত্যার পৃথক পৃথক মামলায় কয়েক হাজার বিডিআর সদস্যকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
এইচআরডব্লিউ'র প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়েছে, সংস্থাটি এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন যে, এই বিচারগুলোকে গণবিচার হিসেবে চালানো হচ্ছে যেখানে আটশরও বেশি অভিযুক্তের বিচার একসাথে করা হচ্ছে। সামরিক ট্রাইব্যুনালগুলোতে গণবিচারের মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রায় চারহাজার বিডিআর সদস্যকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বিশেষভাবে গঠিত বেসামরিক আদালতে (বিশেষ আদালত) হত্যা ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগের বিচারে এমনকি ৮৪৭ জন লোকের বিরুদ্ধে একটিমাত্র মামলায় শুনানি করা হয়েছে। যেই মামলাটিতে অন্তর্ভুক্ত অনেক অপরাধে মৃত্যুদন্ডের শাস্তির বিধানও আছে।
অবিলম্বে এই বিচার প্রক্রিয়া স্থগিত দাবি করে বুধবার প্রতিবেদনটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ব্র্যাড অ্যাডামস বললেন, ‘‘বিদ্রোহে নিহত ও নির্যাতিত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারগুলোকে অবশ্যই ন্যায্য বিচার দিতে হবে। কিন্তু পৃথক ও সুনির্দিষ্ট মামলা না করে এভাবে সন্দেহভাজনদের নির্যাতন ও পক্ষপাতদুষ্ট বিচার করলে তা কোনো পক্ষকেই ন্যায়বিচার পেতে সাহায্য করবে না এবং বিদ্রোহ ও হত্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না।’’

