|
|
সরকারকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
বার্তা২৪ : বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় ‘পক্ষপাত' ও সন্দেহভাজনদের ওপর ‘প্রচন্ড নির্যাতন'-এর উল্লেখ করে বুধবার প্রকাশিত নিজেদের গবেষণা প্রতিবেদনের যে কোনো একটি অভিযোগকে খন্ডন করতে সরকার ও র্যাবের (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন) প্রতি আহবান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
বার্তা২৪'র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সংস্থাটির ঢাকা সফররত কর্মকর্তা ব্রাড অ্যাডামস বুধবার রাতে বললেন, ‘বিডিআর বিদ্রোহে সন্দেহভাজনদের যে র্যাবের হেফাজতে প্রচন্ড নির্যাতন হয়েছে সে বিষয়ে অনেক নির্যাতিত ব্যক্তির আলাদা আলাদা তথ্য-প্রমাণভিত্তিক দৃষ্টান্ত দেয়া আছে আমাদের গবেষণা প্রতিবেদনে। আমরা তাদের প্রতি আহবান জানাবো, পারলে এর যেকোনো একটা খন্ডন বা অপ্রমাণ করে দেখান।
এর আগে বুধবার সকালে ঢাকায় ‘ভয় আমাকে ছাড়ে না': ২০০৯'র বিডিআর বিদ্রোহের পর হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতন ও পক্ষপাতদুষ্ট বিচার' শীর্ষক প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে এইচআরডব্লিউ প্রকাশ করলে বিকেলে নিজেদের সদর দফতরে এক ব্রিফিংয়ে র্যাব মুখপাত্র কমান্ডার এম সোহায়েল একে ‘মনগড়া' ও ‘সম্পূর্ণ অসত্য', ‘বানোয়াট' আখ্যা করেন। র্যাব মুখপাত্র বলেন, ‘দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এবং অপরাধী ও জঙ্গিবাদ উৎসাহিত করতে দেশের কিছু মানবাধিকার সংগঠনের সহায়তায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।' তিনি বলেন, এসব মামলায় আটকরা কখনোই র্যাবের হেফাজতে ছিল না।
সাক্ষাৎকারে এইচআরডব্লিউ'র এশিয়া বিভাগের পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বললেন, ‘গতানুগতিক ঢালাওভাবে এ প্রতিবেদন অস্বীকার করলে তো হবে না, প্রতিবেদনের সাক্ষ্য-প্রমাণ খন্ডন করে কর্তৃপক্ষকেই নিজেদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা নির্যাতনে জড়িত নয়।'
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সন্দেহভাজন আটককৃতদের যে র্যাব হেফাজতে নির্যাতন করা হয়েছিল সেরকম অনেকের ও তাদের পরিবারের সদস্য-স্বজনদের কথা তো বিস্তারিত দেয়া আছে গবেষণা প্রতিবেদনে।
আপনারা সাংবাদিকরা র্যাবকে ওসব পৃথক ও সুর্নিদিষ্ট কেস-স্টাডির ব্যাপারে প্রশ্ন করেননি?'
ব্রাড অ্যাডামস বলেন, ‘এত বড় একটা হত্যাকান্ড ও বিদ্রোহ, এতে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার দিতে হলে বিচার প্রক্রিয়া পক্ষপাতমুক্ত করতে হবে। আমরা প্রতিবেদনে দেখিয়েছি যে, যেভাবে গণহারে বিচার করা হচ্ছে তা ন্যায় ও নিরপেক্ষ বিচারের মানদন্ডে পড়ে না। এতে কোনো পক্ষকেই ন্যায়বিচার দেয়া যাবে না, বিদ্রোহ ও হত্যার প্রকৃত কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না।'
তিনি বলেন, ‘ঢাকায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকাস্থ দূতাবাস আমাকে বলেছে, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে র্যাব কখনোই কার্যকর সংস্থা ছিল না।'
তিনি জানান, ‘আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ আমাদের বলেছেন তারা র্যাবকে কোনো ধরনের কারিগরি, কৌশলগত বা প্রশিক্ষণমূলক সহায়তা দিচ্ছেন না। বরং র্যাব যাতে নিজেদের সদস্য কর্তৃক নির্যাতন ও আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করতে পারে সেজন্য একটি অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার শাখা খুলতে তারা সাহায্য করছে। তাছাড়া বৃটিশ কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ও অবিরাম রেকর্ডের কারণে তারা আর এই বাহিনীটিকে প্রশিক্ষণ সহায়তা দিচ্ছে না।'
তার মতে, ‘পুলিশের মধ্যে হলেও কার্যত সামরিক বা অন্তত আধাসামরিক বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত র্যাব শুরু থেকেই বাংলাদেশীদের হত্যা করে আসছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি এখন এই বাহিনীতে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কাজেই প্রতিষ্ঠান হিসেবে একে সংস্কার করার আর কোনো উপায় নেই। একে বিলুপ্ত করতে হবে।'
বিদ্রোহ ও হত্যার বিচার এবং সন্দেহভাজন বিডিআর সদস্যদের ওপর নির্যাতন তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বদলে পৃথক তদন্ত সংস্থা গঠনের সুপারিশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের এ ধরনের সামর্থ্য ও সক্ষমতা নেই যে তারা এত বড় একটা সহিংস বিদ্রোহ ও হত্যার এবং এত ব্যাপক নির্যাতনের তদন্তের কাজ করতে পারে।'
মানবাধিকার সংস্থাটির নিজস্ব গবেষক দলের করা ৫৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটিতে বিদ্রোহের একটি বিস্তারিত বর্ণনাসহ সন্দেহভাজন বিদ্রোহীদের ওপর সরকারি বাহিনীর নির্যাতনের ঘটনাগুলো প্রামাণ্য আকারে তুলে ধরা হয়েছে। নির্যাতিত ও নিহতদের পরিবার সদস্য, দুই পক্ষের আইনজীবী ও সাংবাদিকসহ মোট ৬৫ জনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। নির্যাতিতদের ‘হাতের ও পায়ের পাতায় মারা', ‘বৈদ্যুতিক শক দেয়া' ও ‘সিলিং থেকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা'সহ নানা ধরনের নির্যাতনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এতে। যাতে কমপক্ষে ৪৭ জন মারা গেছেন।
বিশেষ ‘সামরিক ট্রাইব্যুনাল'-এ এই বিদ্রোহ ও হত্যার বিচারকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট গণবিচার' হিসেবে দেখিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কুখ্যাত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এই নির্যাতনগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।' অবিলম্বে এই বিচার প্রক্রিয়া স্থগিত ও পক্ষপাতমুক্ত বিচার করার দাবি করেছে এইচআরডব্লিউ।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৩ জন নিহত হন। বাহিনীটির সারা দেশে স্থাপিত বিশেষ আদালতগুলো ওই বিদ্রোহ ও হত্যার পৃথক পৃথক মামলায় কয়েক হাজার বিডিআর সদস্যকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।

