Quantcast
ঢাকা, সোমবার 9 July 2012, ২৫ আষাঢ় ১৪১৯, ১৮ শাবান ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৪১৩ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

ডুবে যাওয়া ২০ জাহাজে বিপজ্জনক চিটাগং বন্দর চ্যানেল

ভালো জাহাজ পাঠানো বন্ধ করছে বিদেশীরা

ওমর ফারুক, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে ডুবে আছে ছোট বড় ২০টি জাহাজ। এর মধ্যে কোস্টার ও ট্যাংকারও রয়েছে। ডুবে থাকা জাহাজগুলো উদ্ধার না হওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বন্দর চ্যানেলে। ডুবে থাকা পানামার পতাকাবাহী ‘এমভি ট্রে্ানাডো' জাহাজের ওপর সার বোঝাই একটি জাহাজ ৬ জুলাই উঠে গেলে আটকা পড়ে জাহাজটি। তা এখনও উদ্ধার হয়নি। গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই -এর প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে বন্দর চ্যানেলে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে বন্দর চ্যানেল। তাই আগ্রহ হারাচ্ছে বিদেশী জাহাজের মালিকরা। খাদ্যশস্যসহ সাধারণ পণ্য নিয়ে নতুন, ভাল জাহাজ (বাল্ক কার্গো) পাঠানো বন্ধ করে দিচ্ছেন বিদেশীরা। 

খবর নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ২০১১ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ১৮ মাসে বন্দরের বহির্নোঙ্গরে ছোট-বড় ২৯টি দূর্ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৯টি দুর্ঘটনার খবর পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে। সর্বশেষ ২১ জুন রাতে চট্টগ্রাম বন্দরের বহিনোঙ্গরে চিটাগাং ট্রেড এজেন্সির মালিকানাধীন ‘‘এমভি চট্টগ্রাম’’ নামে একটি লাইটার জাহাজ ডুবে যায়। ৬ জুলাই পানামার পতাকাবাহী ডুবে যাওয়া একটি জাহাজের ওপর উঠে যায় সার বোঝাই জাহাজ। বন্দরের বহির্নোঙ্গরে দুর্ঘটনা ঠেকাতে আজ পর্যন্ত নেয়া হয়নি ব্যাপকভিত্তিক কোন পরিকল্পনা। অথচ বাংলাদেশের আমদানি বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশ এবং রপ্তানি বাণিজ্যের ৮০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। জাহাজ ডুবির কারণে বন্দর চ্যানেল ঝঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিগগিরই জাহাজ ডুবির ঘটনা না কমলে ভবিষ্যতে বন্দর চ্যানেল বেশি গভীরতার জাহাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা।

জানা গেছে, চ্যানেলের মতো স্পর্শকাতর স্থান নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব মহলের এমন উদাসীনতা বাড়িয়ে দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের ঝুঁকি। কারণ ডুবে যাওয়া এসব নৌযান বন্দরে দেশী-বিদেশী জাহাজ ঢুকতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। আবার জাহাজের আশপাশে পলি জমে কমছে নদীর নাব্যতা।

নৌবাণিজ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বন্দরে প্রতিটি বাল্ক কার্গোকে বার্থিং, লোডিং-আনলোডিংসহ ১৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত অবস্থান করতে হয়। অথচ সেগুলো এক সপ্তাহের কথা বলে শিপিং এজেন্টরা ভাড়া করেন। অতিরিক্ত অবস্থানের জন্য তারা জরিমানা দেয়। বন্দরের বহির্নোঙ্গরে পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে সাগরে পাচ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত যেসব জাহাজ অবস্থান করছে তা অর্ধেকই পুরানো। এর মধ্যে ৩৩ বছরের পুরনো এমভি বঙ্গলংকা যেমন আছে, তেমনি আছে ২৮ বছরের পুরনো এমভি সুইফট ক্রো। গত এপ্রিল মাসে ছোট-বড় তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার পর নৌবাণিজ্য অধিদফতরের দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনে অধিকাংশ দুর্ঘটনার জন্য লক্করঝক্কর মার্কা পুরনো জাহাজকে দায়ী করেছে। সূত্র জানায়, পুরনো বাল্ক কার্গোতে দুর্ঘটনার পাশাপাশি অধিকাংশ সময়ই ‘ব্যালেন্সড ওয়াটার' ফুটো হয়ে ভিজে নষ্ট হয়ে যায় বিভিন্ন কার্গো। চাল, গম, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে নষ্ট হওয়ার পরিমাণ  প্রতিটি জাহাজে প্রায় দুশ' মেট্টিক টনের মত।

বন্দর ব্যবহারকারীদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে বন্দর অচল হয়ে পড়ে। চ্যানেলের ঝুঁকি কমাতে দুর্ঘটনা বন্ধ করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আইন সংশোধন করতে হবে। অবৈধ নৌযান নিয়ে চ্যানেলকে যারা হুমকির মুখে ফেলছে তাদের ব্যাপারেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে মন্ত্রণালয়কে। বন্দরে জাহাজ আসা-যাওয়ার একমাত্র পথে চলছে অনুমোদনহীন শতাধিক জাহাজ। অবৈধ এসব নৌযান একের পর এক চ্যানেলে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে।

বন্দর চ্যানেলে এখনো ডুবে থাকা জাহাজের খতিয়ান থেকে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ২০ আগস্ট এমভি হ্যাংজাউ জাহাজের সাথে ধাক্কা লেগে ডুবে যায় শ্রীলংকার পতাকাবাহী জাহাজ এমভি ভাদুলী ভ্যালী। একই দিন ৬০০ টন সার নিয়ে চ্যানেল সংলগ্ন বহির্নোঙ্গরে ডুবে যায় লাইটারেজ জাহাজ এমভি হাবিবুর রহমান। ১২ সেপ্টেম্বর ডুবে যায় সার বোঝাই কোস্টাল জাহাজ এমভি বেঙ্গল ব্রিজ। ২০০৯ সালের ২৩ জানুয়ারি ৯০০ টন গম নিয়ে ডুবে যায় এমভি প্রিন্স অব মধুর খোলা-২ নামের জাহাজ। ২১ এপ্রিল ডুবে যায় এমভি সেভেন সার্কেল-২৫ নামের অপর একটি জাহাজ। ৭ মে সিমেন্ট ক্লিংকার নিয়ে ডুবে যায় এমভি টিটু-৯ নামের আরেকটি জাহাজ। ১১ জুলাই বন্দরের ড্রেজার খনকের সাথে ধাক্কা লেগে এক হাজার টন জিপসাম নিয়ে ডুবে যায় অভ্যন্তরীণ নৌযান এমভি মডার্ন। গত ২১ জুন বন্দরের বহির্নোঙ্গরে জিপসাম নিয়ে ডুবে যায় লাইটারেজ এমভি চট্টগ্রাম। বন্দর চ্যানেল ও সংলগ্ন এলাকায় এর আগে ডুবে যাওয়া আরো জাহাজের মধ্যে আছে, এমভি সুরমা, এমভি কাদের, এমভি থেটিক, এমভি ফরচুন, এমভি বিশ্বকুসুম, এসবি ক্রিস্টাল-৯, কোস্টার সি-১০৬৩, এমভি ফিরোজ ফারজানা ও এমভি হ্যাংগ্যাঙসহ আরো কয়েকটি জাহাজ।

জানা গেছে, বন্দরে বছরে যেসব বাল্ক কার্গো আসে সেগুলোর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ পুরনো জাহাজ। এর মধ্যে ৩০-৩৫ বছরের পুরনো জাহাজও আছে। তারা আরও জানান, এসব জাহাজ ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, রাশিয়ার বন্দরে যেতে পারে না। চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইউক্রেন, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকার বিভিন্ন বন্দর থেকে পণ্য নিয়ে এসব জাহাজ আসে।

সূত্র জানায়, পুরনো বাল্ক কার্গোতে দুর্ঘটনার পাশাপাশি অধিকাংশ সময় ব্যালেন্সড ওয়াটার ফুটো হয়ে ভিজে নষ্ট হয়ে যায় বিভিন্ন কার্গো। চাল, গম, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে নষ্ট হওয়ার পরিমাণ প্রতিটি জাহাজে প্রায় ২০০ টনের মতো। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশক ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন জাহাজ আসার পরিমাণ কমছে। বন্দরে গড়ে প্রতি বছর জাহাজ আসে প্রায় দুই হাজার। এর মধ্যে বাল্ক কার্গো আছে প্রায় ৮০০। এসব বাল্ক কার্গো বছরে প্রায় দুই মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য পরিবহন করে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সূত্রে জানা গেছে, আমদানিকারকের চাহিদা অনুযায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা বিদেশী ভাল জাহাজগুলো বুকিং দিতে চাইলেও মালিকরা চট্টগ্রাম বন্দরের নাম শুনলে পিছিয়ে যান। তাদের মতে, বন্দরের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার সুরাহা না হলে ২০-৩০ বছর পর নতুন কোনো বিদেশী জাহাজ এখানে আসবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বন্দর চ্যানেলে ডুবন্ত জাহাজ নানা সমস্যা তৈরি করলেও এসব উদ্ধারে বন্দর কর্তৃপক্ষের তেমন কোন উদ্যোগ নেই। ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারে স্যালভেস প্রতিষ্ঠানকে প্রচুর অর্থ দিতে হয় মালিকদের। এ জন্য ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধারে তেমন কোন তৎপরতা থাকে না। আইনী সীমাবদ্ধতার কারণে বন্দর কর্তৃপক্ষ মালিকদের এসব ডুবো জাহাজ উদ্ধারে বাধ্য করতে পারে না। জানা গেছে, বন্দর চ্যানেলে ডুবন্ত জাহাজের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে কয়েকটি জাহাজ অপসারণ করার চেষ্টা করেন। জাহাজ উঠানোর কার্যক্রম ব্যয়বহুল হওয়ায় দরপত্রে কেবল দুটি শর্ত জুড়ে দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এগুলো হচ্ছে, কার্যাদেশ পাওয়ার এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট স্যালভেস প্রতিষ্ঠানকে উদ্ধার কাজ সম্পন্ন করা ও বন্দর তহবিলে নিরাপত্তা জামানত হিসেবে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে দুই লাখ টাকা রাখা।