|
|
পানিবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ কাগজে কলমে এবং বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : অতিবৃষ্টি সামাল দেয়ার কোনো প্রস্তুতি নেই ঢাকা ওয়াসার। প্রবল বর্ষণ হলে প্রতিবারের ন্যায় এবছরও পানিতে ভাসবে ঢাকার অধিকাংশ এলাকা। প্রতিবছর বর্ষা মওসুম শুরু হওয়ার আগে সরকার ও ঢাকা ওয়াসা পানিবদ্ধতা নিরসনের জন্য নানা প্রতিশ্রুতির কথা শোনায়। মূলত সেইসব উদ্যোগ কাগজে কলমে এবং বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এবারো তার ব্যতিক্রম নয়। তাদের ঘোষণা মত উদ্ধার হয়নি দখলি খাল ও নিচু ভূমিসমূহ, পরিষ্কার করা হয়নি বক্সখালগুলো, বাড়ানো হয়নি খালের নাব্যতাও। পানিবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা ওয়াসা কি প্রদক্ষেপ নিয়েছে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের সোজা জবাব, অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে আমাদের কিছুই করার নেই। স্বাভাবিক বৃষ্টি হলে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। অতিবৃষ্টি সামাল দেয়ার কোন প্রস্তুতিই নেই ঢাকা ওয়াসার। পানিবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসার প্রস্তুতির বিষয়ে এমডি দৈনিক সংগ্রামকে আরো বলেন, চলমান বর্ষা মওসুমে রাজধানীতে পানি জট কমানোর লক্ষ্যে ২৩ কিলোমিটার স্টর্ম ড্রেনেজ লাইন স্থাপন, ১২ কিলোমিটার খাল দখলমুক্ত, ৭ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন এবং ৭ কিলোমিটার খাল উন্নয়ন করা হয়েছে। এছাড়াও বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য স্থায়ী ২টি পাম্প স্টেশন ছাড়াও রামপুরা, সায়েদাবাদ, জনপথ ও অন্যান্য স্থানে ১৪টি অস্থায়ী পাম্প বসানো হয়েছে। বৃষ্টির সময় ম্যানহোলগুলো খুলে দেয়া এবং ক্যাচপিট পরিষ্কার করার জন্য বর্ষাকালীন সময়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে স্ট্রাইকিং ফোর্স কাজ করবে। তিনি বলেন, বর্ষা মওসুমে রাজধানীর পুরো কার্যক্রমকে মনিটরিং করতে ড্রেনেজ সার্কেলে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। ওয়াসার এমডি পানিবদ্ধতা নিরসনের নানা উদ্যোগের কথা বললেও মাত্র ১০ থেকে ১১ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই দুর্ভোগে পড়তে হয় রাজধানীবাসীকে। কয়েক ঘণ্টা টানা বৃষ্টি হলেই রাজধানীর অধিকাংশ এলাকাতেই পানিবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এটি বারবার প্রমাণিত যে, ঢাকা ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো অতিবৃষ্টি সামাল দেয়ার প্রস্তুতির কথা বললেও মূলত সেগুলো শুধুই আইওয়াশ মাত্র। পানিবদ্ধতা মোকাবেলার জন্য প্রতি বছরই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া হয়। কিন্ত সেগুলোর কখনো বাস্তবায়ন হতে দেখেনি নগরবাসী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াসা, ডিসিসিসহ সংশ্লিষ্টদের এসব প্ল্যান শুধুই আইওয়াশ মাত্র। তারা বলছেন, এ বছরও ব্যাপক পানিবদ্ধতার কবলে পড়তে হবে ঢাকাবাসীকে। গত কয়েক বছরের মধ্যে ২০১০ সালে ঢাকায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছিল ৩৬ মিলিমিটার। গত বছর এর কাছাকাছি হয়েছিল। এতে ঢাকার প্রায় অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। ২০০৮ সালে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্যুয়ারেজ লাইন স্থাপন, খাল দখলমুক্ত সহ পানিবদ্ধতা নিরসনে দাতা সংস্থার সহায়তায় ৮শ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প নেয়া হয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দেবে ২৬০ মিলিয়ন ডলার, ডেনমার্কের ড্যানিডা কোম্পানি ওয়াটার ট্রিটমেন্টের জন্য ৯০ মিলিয়ন, এডিবি ১০০ মিলিয়ন ডলার, জাপানের জাইম ও জেবিকা কোম্পানি পর্যায়ক্রমে ৬০০ মিলিয়ন ইয়েন, যুক্তরাজ্যও ডিএফআইডি ২১ মিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। ওয়াসা জানায়, পানিবদ্ধতা মোকাবিলায় বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় ১১৬০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ চলছে। যা ২০১২ সাল নাগাদ শেষ হবে। পানিবদ্ধতা নিরসনে রামপুরা পাম্পিং স্টেশনে ৫৫টি পাম্প বসানো হবে। যার মধ্যে ৩০টি হবে ২৫ কিউসেক ক্ষমতা সম্পন্ন এবং ২৫টি হবে ৫ কিউসেক ক্ষমতার। এ ছাড়া কমলাপুর জনপথ পাম্পিং স্টেশনে আরো ২০টি পাম্প বসানো হবে। প্রকল্পে জলাবদ্ধতা নিরসনে রাজধানীর খালগুলো দখলমুক্ত ও খনন করার কথাও বলা হয়েছে। এভাবে প্রতি বছর পানিবদ্ধতা নিরসনে ব্যাপক প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। কিন্ত বর্ষা এলেই নগরীতে পানিবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
কয়েক বছর আগেও পানিবদ্ধতার জন্য পলিথিনকে দায়ী করা হতো। তবে এটা ছিল একটা নিছক অযুহাত। নগর বিশেষজ্ঞরা পানিবদ্ধতার জন্য যে সব কারণ চিহ্নিত করেছেন সেগুলো হচ্ছে, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নগরীর অভ্যন্তরীণ খাল দখল ও গতিপথ সংকচিতকরণ, নগরীর সলিড ওয়েস্ট অপসারণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, নিচু জলাশয়ে সলিড ওয়েস্ট ডাম্প করা, গৃহস্থালী বর্জ্য ড্রেনেজ নেটওয়ার্কে সরাসরি নিক্ষেপ করা, খালের গতিপথে আড়াআড়ি রাস্তা নির্মাণ, নগরীর অভ্যন্তরে খাল, জলাশয়, ডোবা ভরাট করে ফেলা, রাস্তা মেরামতে ড্রেনেজ লাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া, বহুতল ভবনের বালিসহ কাদামাটি ড্রেনে প্রবেশ, বিভিন্ন সংস্থার ইচ্ছামত ড্রেন সংযোগ, উন্মুক্ত স্থানের ময়লা যথাসময়ে পরিষ্কার না করা, শহর রক্ষা বাঁধের অভ্যন্তরে ক্যাচমেন্ট এলাকায় কম ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্পিং ব্যবস্থা ইত্যাদি। পানিবদ্ধতার এসব কারণের সাথে ওয়াসা, ডিসিসি, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, রেলওয়েসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকলেও পানিবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসা ছাড়া অন্যরা তেমন ভূমিকা পালন করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প আলোর মুখ দেখে না।
ওয়াসা জানায়, রাজধানী ঢাকায় ১৩৬ বর্গ কিলোমিচারের মধ্যে ড্রেনেজ সিস্টেম রয়েছে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ওয়াসা জানায়, পানি নিষ্কাশনের জন্য আরও ১২০ কিলোমিটার ড্রেনেজ সিস্টেম দরকার। এ ছাড়া বক্স কালভার্ট রয়েছে ১২ কি.মি., ওপেন ক্যানেল রয়েছে ৬৫ কি.মি., ৩টি পাম্প স্টেশন এবং বৃষ্টির পানি (স্ট্রম ওয়াটার) নিষ্কাশনের জন্য ওয়াসার লাইন রয়েছে ২৫০ কি.মি. কিন্তু দরকার তারও দ্বিগুণ। উত্তরা, গুলশান, বনানী, বারিধারা এলাকায় ড্রেনেজ সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জানা গেছে, পানিবদ্ধতার জন্য দায়ী পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনেরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি ঢাকা ওয়াসা। প্রতিদিন গড়ে ১২ লাখ ঘনমিটার পয়ঃবর্জ্য উৎপাদন হলেও পরিশোধন হয় মাত্র ৬০-৭০ হাজার। বর্ষা মওসুমে এসব বর্জ্য পানির সাথে মিশে গিয়ে আবাস স্থলে ওঠে এবং এসব বর্জ্য ড্রেনেজ লাইনের সাথে একাকার হয়ে পানি সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এতে করে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ও ঘটে।
অন্যান্য বছরের মত এবারও রাজধানীর রামপুরা, মালিবাগ, মৌচাক, বাসাবো, গোরান, বাড্ডা, গোপীবাগ, মতিঝিল, আরামবাগ, নয়াপল্টন, কাকরাইল, মিরপুর, বকশিবাজার, লালবাগ, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, সায়েদাবাদ এলাকায় প্রবল পানিবদ্ধতা দেখা দিবে। এর মধ্যে মালিবাগ, সায়েদাবাদ, ডেমরা, মিরপুর এলাকায় স্বাভাবিক বৃষ্টি হলেও তলিয়ে যায় অধিকাংশ এলাকা। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য ঢাকা ওয়াসা নগরীর ৪৩টি খালের মধ্যে ১৩টি খাল অবৈধ দখল মুক্ত করার কথা বললেও তা শুধু মাত্র কাগজে কলমেই রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় খাল খনন ও পরিষ্কারের যে ঘোষণা আসে তাও আই ওয়াস মাত্র।
ঢাকা ওয়াসার বয়স ৪৫ বছর। এর মধ্যে নগরীর পানি নিষ্কাশন ওয়াসার আওতায় এসেছে ১৮ বছর আগে। দীর্ঘ দেড় যুগেও দাতা সংস্থার ব্যাপক সহযোগিতার পরও রাজধানীকে পানিবদ্ধতা মুক্ত করতে পারেনি ঢাকা ওয়াসা।

