Quantcast
ঢাকা, রোববার 15 July 2012, ৩১ আষাঢ় ১৪১৯, ২৪ শাবান ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ১৬৩ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে টেন্ডার বাণিজ্য -পাঁচ

সরকারি দলের লোক কাজ না পেলে দরপত্র বাতিল অথবা স্থগিত হয়ে যায়

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : সরকারি দলের লোক কাজ না পেলে টেন্ডারের দরপত্র বাতিল অথবা স্থগিত হয়ে যায়। এতে করে অভিজ্ঞ ঠিকাদারদের কাজ পাওয়ার সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের বিগত সাড়ে ৩ বছরে দলীয় নেতা-কর্মীদের বাইরে কাজ পাওয়ার সুযোগ হয়নি পেশাদার ঠিকাদারদের। যেখানে টেন্ডার হচ্ছে সরকারি দলের নেতারাই ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। আর এ সব কাজে সহযোগিতা করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রকৌশলী কর্মকর্তারা। তাই সরকারি দলের এ নীরব টেন্ডারবাজি ছড়িয়ে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ায় বেড়ে গেছে খুনের ঘটনা। টেন্ডারবাজির ফলে তরুণরা অপরাধ কার্যক্রমের সাথে সহজেই জড়িয়ে পড়ছে। আর এ ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্বে আছে সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপি ও স্থানীয় নেতারা। বিগত সাড়ে ৩ বছরে পানি উন্নয়ন বোর্ডে (পাউবো) কোটি কোটি টাকার টেন্ডার হয়েছে। যার প্রায় সবকটি কাজ পেয়েছে সরকারি দলের নেতারা। প্রতিবাদে ঠিকাদারদের বিক্ষোভ করা ছাড়া আর কোন পথ খোলা ছিল না। বিগত সাড়ে ৩ বছরে আওয়ামী লীগের ঠিকাদাররা ছিল অপ্রতিরোধ্য। তারা সব সরকারি টেন্ডারের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। দলটির শীর্ষনেতারা ১ বছরে কোন কাজ কে করবেন তা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতাদর্শের সাধারণ ঠিকাদাররা স্বাভাবিকভাবে কোনো টেন্ডারে অংশ নিতে পারেননি। টেন্ডারবাজি বন্ধে সরকারের হাকডাকই সার হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড : সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লালমনির হাটে পাউবোর ১৬ কোটি টাকার টেন্ডার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ঠিকাদাররা নির্বাহী প্রকৌশলীর অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ করে। মার্চে ফরিদপুরে পাউবোর ৫৬ কোটি টাকার টেন্ডারকে কেন্দ্র করে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সে সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনে নামে জেলা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। অনিয়ম ও সিন্ডিকেট হোতাদের গ্রেফতারের দাবিতে তারা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। সমাবেশে বলা হয় ফরিদপুরের সিন্ডিকেট চক্রের নেতা মোহতাশেম বাবর সকল দুর্নীতি ও অপকর্মের হোতা। তাকে গ্রেফতারের দাবি করা হয়। আগস্ট মাসে খুলনা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শাখায় ঠিকাদারি কাজ ভাগাভাগি করে নেয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত কেসিসির এক কাউন্সিলর ও তার লোকজন। সেপ্টেম্বরে কিশোরগঞ্জ পাউবোর ২২ কোটি টাকার ভৈরব প্রতিরক্ষা কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নেয় সরকারের মন্ত্রী ও এমপিদের আশ্রিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজরা। অক্টোবরে পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন গাজনার বিল প্রকল্প বাস্তবায়নের ৪৫ কোটি টাকার কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নেয় ক্ষমতাসীন দলের টেন্ডারবাজরা। দলীয় নেতাদের পাওয়া নিশ্চিত করতে শুধুমাত্র একটি স্থানে দরপত্র দাখিলের ব্যবস্থা করা হয়। নিরাপত্তার অভাবে ঠিকাদাররা দরপত্র দাখিল করতে পারেনি। ফলে কাজ পাওয়া তাদের জন্য নির্বিঘ্ন হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে নোয়াখালীর চৌমুহনী পৌরসভায় পানি সরবরাহ প্রকল্পের ৬ কোটি টাকার টেন্ডারের দরপত্র জমা দিতে পারেনি ঠিকাদারি ৫ প্রতিষ্ঠান। সন্ত্রাসীরা তাদের দরপত্র জমাদানে বাধা প্রদান করে। অক্টোবরে ফেনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার টেন্ডার ভাগাভাগি করে নেয় সরকারি দলের লোকজন। টেন্ডার দাখিলের সময় অন্য ঠিকাদারকে সংশ্লিষ্ট অফিসে ঢুকতেই দেয়া হয়নি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল শাখা :  ২০১১ সালের জানুয়ারিতে নাটোরের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল শাখার পানি সরবরাহ প্রকল্পের সোয়া ৭ কোটি টাকার টেন্ডারে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। 

এদিকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীরা টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেও বাস্তবে কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। পুলিশের আইজি ২ দফায় সাংবাদিক সম্মেলন করে চাঁদাবাজি ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকেও এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র সচিবকে চিঠি দেয়া হয়েছে। নানা হাঁকডাক দিলেও মাঠ পর্যায়ের পুলিশ প্রশাসনে এ বিষয়ে কোনো রকম নির্দেশনা না থাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি চলছেই। অধিকাংশ ঘটনার সাথে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা জড়িত থাকায় পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি নিয়ে বহু সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও প্রভাবশালীদের চাপে কোনো মামলা নিতে পারছে না থানা পুলিশ। ব্যাপক হাঁকডাক হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পুলিশকে নীরব দর্শকের ভূমিকায়ই দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। গত বছরের ৪ মে বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের বিবদমান গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। পরদিন ৫ মে পুলিশের আইজি দ্বিতীয় দফা সাংবাদিক সম্মেলন করেন। ওই সম্মেলনে তিনি জানান, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের ঘটনায় এখন থেকে দ্রুত বিচার আইনে মামলা নেয়া হবে। এসব ঘটনায় জড়িতরা রাজনৈতিকভাবে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তাদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। এখন থেকে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির প্রমাণ পেলেই কঠোর ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকেও স্বরাষ্ট্র সচিবকে লেখা চিঠিতে টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ দেয়া হয়।

এত ঢাকঢোল পিটিয়ে টেন্ডার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও এর বাস্তব অগ্রগতি শূন্যের কোঠায়। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযোগ করে বলেছেন, সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্য তারা মিডিয়ার মাধ্যমে জানলেও এ ব্যাপারে প্রশাসনিক কোনো নির্দেশ এখনও পাননি। ক্ষমতাসীন দলের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে গেলে দলীয় নেতা-নেত্রী এবং সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে।