|
|
মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলনে বক্তারা
গতকাল শনিবার জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলন ২০১২ উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য পেশ করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহম্মেদ বীর বিক্রম এমপি -সংগ্রাম
০ ঢালাওভাবে কোনো দলকে স্বাধীনতা বিরোধী বলা যায়না -কর্নেল অলি ০ '৭১ এ আটকে থাকলে ভুল হবে -জেনারেল ইবরাহিম0
স্টাফ রিপোর্টার : জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের প্রতিনিধি সম্মেলনে বক্তারা বলেছেন, দ্বিধাবিভক্ত জাতি কখনো অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। এজন্য দেশের উন্নয়নের স্বার্থে প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করতে হবে। বক্তারা আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ভারতের বাংলাদেশকে সাহায্য করার পেছনে উদ্দেশ্য ছিলো অখন্ড ভারত গঠন। তারা মুসলিম রাষ্ট্রকে বিভক্ত করতে চেয়েছিলো। সে সময় আমরা বুঝতে না পারলেও এখন তা জাতির কাছে পরিষ্কার। বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশের ৭০ ভাগ লোকের বয়স ৪০ বছরের নীচে। তারা সবাই বাংলাদেশের পক্ষে। তাদের যারা বিভক্ত করতে চায় তারা দেশ ও স্বাধীনতা বিরোধী।
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় প্রতিনিধি সম্মেলন-২০১২ অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্ণেল অব. ড. অলি আহমেদ বীরবিক্রম। পরিষদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম উদ্দিনের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া মোহাম্মদ গোলাম পরওয়ার, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির হামিদুর রহমার আযাদ এমপি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন বেঙ্গল, মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এডভোকেট হান্নান হোসাইন, আবু তাহের খান, আব্দুল ওয়ারেছ, ঢাকা মহানগরী সহকারী মহাসচিব প্রফেসর আব্দুল করিম খান প্রমুখ।
সম্মেলনে পরিষদের মহাসচিব মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইকবাল ৯ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন। এগুলো হলো-১. টিপাইমুখ বাঁধসহ আন্তর্জাতিক ৫৪টি অভিন্ন নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ বন্ধের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে ২. স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন/ তত্ত্বাবধায়ক/ কেয়ারটেকার সরকারের কোনো বিকল্প নেই। এটি এখন জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। এ দাবি মেনে নিতে হবে ৩. বঙ্গবন্ধু কর্তৃক চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানী সেনাদের বিচার বাংলার মাটিতে করতে হবে ৪. সাধারণ নাগরিকদের যুদ্ধাপরাধের আইনে বিচার আন্তর্জাতিক আইন সিদ্ধ নয়, এ আইন সংবিধান পরিপন্থী। এ আইনে সাধারণ নাগরিকদের বিচার বন্ধ করতে হবে ৫. অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ সকল জাতীয় নেতৃবৃন্দের মুক্তি দাবি করছি ৬. সীমান্ত হত্যা, সীমান্ত বাণিজ্য ও ফেনসিডিলের অবাধ প্রবেশ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে ৭. পদ্মা সেতুর কেলেঙ্কারির হোতাদের বিচার করতে হবে ৮. অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারিভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ সম্মানি ভাতা ৫ হাজার টাকা করতে হবে এবং ৯. মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের অবৈতনিক উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
অলি আহমেদ বলেন, ছয় দফার ভিত্তিতে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করে। আওয়ামী লীগ করার জন্য নয়। দেশের সাধারণ জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করেছে, আর আওয়ামী লীগের নেতারা তখন কোলকাতায় হোটেলে আনন্দ ফূর্তি করেছে। তিনি বলেন, ভারত অখন্ড ভারত গড়তে চায়। এজন্য সে সময় তারা পাকিস্তানকে ভাঙতে আমাদের সাহায্য করেছিলো। তারা কখনো চায়নি দুটি মুসলিম দেশ এক থাক। কর্নেল অলি বলেন, এখানে আজ না আসলে বুঝতে পারতাম না জামায়াতে ইসলামীতে এত বেশি মুক্তিযোদ্ধা রয়েছে। আপনারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি শক্তি। কে তালিকায় রাখলো আর কে রাখলো না তাতে যায় আসে না। তিনি বলেন, দ্বিধাবিভক্ত জাতি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনা। এজন্য দেশের উন্নয়নের স্বার্থে প্রতিশোধের রাজনীতি পরিহার করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে যারা জামায়াতে ইসলামী করে '৭১ এ তাদের ৯০ ভাগের বয়স ১৪ বছরের নীচে ছিলো। তাদেরকে স্বাধীনতা বিরোধী বলা যায় না। আমি আশা করি আওয়ামী লীগ এ সত্য স্বীকার করবে। অলি বলেন, ঢালাওভাবে কোনো দলকে স্বাধীনতা বিরোধী বলা যায়না। ব্যক্তিকে বলা যায়। তিনি আরো বলেন, খুন, গুম ও নির্যাতন করে বিরোধী দলের আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। শেখ মুজিবও জোর করে ক্ষমতায় থাকতে পারে নি। হাসিনা সরকারও ক্ষমতায় টিকতে পারবে না। নমরুদের মতো এই সরকারের পতন হবে। বর্তমান সরকার সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে মন্তব্য করে অলি আহমেদ বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা হলে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি সরকার পতন আন্দোলনে মুক্তিযোদ্ধাদের অংশ নেয়ার আহবান জানান।
জেনারেল ইবরাহিম বলেন, '৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী এক পাকিস্তানে বিশ্বাসী ছিলো, এখন তারা এক বাংলাদেশে বিশ্বাস করে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাস সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করলেও মাত্র ১৩ দিন যুদ্ধ করে ভারত আত্মসমর্পণের কৃতিত্ব নিয়ে নেয়। ভারত মুক্তিযুদ্ধকে হাইজ্যাক করে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ভারত সাহায্য করায় তাদের ধন্যবাদ, কিন্তু তারও একটি সীমা আছে। জেনারেল ইবরাহিম বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা ইসলাম বিরোধী নয়। সরকার আজ ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের '৭১ এ আটকে থাকলে ভুল হবে। বর্তমানে দেশের ৭০ ভাগ লোকের বয়স ৪০ বছরের নীচে। তারা সবাই বাংলাদেশের পক্ষে। তাদের যারা বিভক্ত করতে চায় তারা দেশ ও স্বাধীনতা বিরোধী। তিনি মুক্তিযুদ্ধকে বিভক্তের ইস্যু না বানিয়ে ঐক্যের ইস্যু বানানোর জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, ভারতের খপ্পর থেকে দেশকে বাঁচাতে হলে মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আর একটি যুদ্ধ করতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, '৭১ সালে পাকিস্তানের অখন্ডতার পক্ষে রাজনৈতিক ভিন্ন মত ছিলো। কিন্তু সেটা অপরাধ হতে পারে না। তিনি বলেন, স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান চিহ্নিত ১৯৫ জন পাকিস্তানী সেনা যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমরা তাদের বিচার চাই। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে যারা যুদ্ধই করেনি তাদের বিচার জনগণ মেনে নেবে না। তিনি '৭৩ সালের আইন সংশোধনের প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক কারণে যেকোন ব্যক্তির বিচার করার জন্য সরকার ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ২০০৯ সালে আইন সংশোধন করেছে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, একটি পক্ষ '৭১ সালে ভারতের পক্ষ নিতে পারেনি বলে রাজনৈতিক কারণে বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এর সাথে গণহত্যার কোনো সম্পৃক্ততা থাকতে পারে না। ভিন্নমত থাকতেই পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ রকম হয়েছে। কিন্তু তারা স্বাধীনতার পর আবার ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গঠনে কাজ করেছে। কিন্তু এ দেশ যাতে উন্নত না হতে পারে এজন্য ভারতের ইন্ধনে সরকার পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের-বিপক্ষের বিভক্তি তৈরি করে রেখেছে।
রুহুল আমিন গাজী বলেন, গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছে। কিন্তু ৪০ বছর পর যুদ্ধাপরাধী বিচারের নামে নাটক মঞ্চস্থ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, '৯৬ সালে শেখ হাসিনা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর সাথে বসে সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন। সেদিন নিজামী সাহেব যুদ্ধাপরাধী না হলে আজ তাকে কেন বলা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচারক বলেন আমি ন্যায়বিচার করতে বসিনি। তাহলে তিনি কি জোর করে ফাঁসিতে ঝোলাতে চান। তিনি বলেন, সরকার চিরদিন ক্ষমতায় থাকতে চায়, এজন্য কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে।
ইসমাঈল হোসেন বেঙ্গল বলেন, '৭১ সালে শেখ হাসিনা পাকিস্তানীদের রেশন খেয়েছেন আর বেগম খালেদা জিয়া ৯ মাস বন্দি ছিলেন। তিনি বলেন, '৭১ সালে যারা আমাদের সাহায্য করতে এসছিলো তাদেরকে সে সময় আমরা চিনতে পারিনি। এখন ভারতকে আমরা চিনতে পারছি। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী গণমানুষের জন্য রাজনীতি করে। মুক্তিযুদ্ধেও পক্ষ-বিপক্ষ এখন মীমাংসিত বিষয়। শেখ মুজিব নিজেই এটি মীমাংসা করে গেছেন। অথচ এখন শেখ হাসিনা তার পিতার চেতনার বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি তরুণদের দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় আর একটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহবান জানান।

