|
|
যাকাতের তাৎপর্য শীর্ষক জামায়াতের আলোচনা
গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী আয়োজিত যাকাতের তাৎপর্য শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য পেশ করেন দলের নায়েবে আমীর অধ্যাপক একেএম নাজির আহমদ -সংগ্রাম
স্টাফ রিপোর্টার : জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ অধ্যাপক এ কে এম নাজির আহমদ বলেছেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় করে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব। দেশে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতি বছর ১৫ হাজার কোটি টাকা যাকাত আদায় করা সম্ভব। তিনি বলেন, ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ মু'মিন জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটিকে আল্লাহ রাববুল আলামীন ঐচ্ছিক ও বাধ্যতামূলক উভয়ভাবেই রেখেছেন। কিন্তু যাকাত হলো বাধ্যতামূলক আর্থিক ইবাদত। আল্লাহ রাববুল আলামীন সাহেবে নিসাবদের ওপর এ ইবাদত ফরজ করে দিয়েছেন। যাকাতকে আল্লাহ রাববুল আলামীন বান্দার কাছ থেকে কর্জে হাসানা হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তাই যাকাত একটি অত্যাবশ্যকীয় আর্থিক ইবাদত। তিনি আর্তমানবতার সেবায় বিত্তবানদের যাকাত প্রদানের আহবান জানান।
গতকাল শনিবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঢাকা মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে যাকাতের তাৎপর্য শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমীর এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এমপি'র সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুল হালিম, মসজিদ মিশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ও শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ যাইনুল আবেদীন, ঢাকা মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, মঞ্জুরুল ইসলাম ভূঁইয়া, মহানগর জামায়াত নেতা ডা. রেদওয়ানুল্লাহ শাহেদী, এডভোকেট মশিউল আলম, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা প্রমুখ।
এ কে এম নাজির আহমদ বলেন, পবিত্র আল কুরআনে একজন মুমীনের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে ইনফাক ফী সাবিলিল্লাহ হিসেবে। অর্থাৎ আল্লাহর পথে দানকে একটি উত্তম চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই দান হচ্ছে ঐচ্ছিক দান। আর ইসলামের পাঁচটি রুকনের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে যাকাত। যাকাত হচ্ছে একজন মুমীনের জন্য বাধ্যতামূলক। তিনি বলেন, নবী করীম সা.-এর সময়কালে একজন বিত্তবান ব্যক্তিকে কখনোই যাকাত দিতে বলতে হতো না। নিজ উদ্যোগেই নিজের মালের পবিত্রতার জন্যই তিনি যাকাত দিতেন। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা)-এর সময়কালে একজন যাকাত দিতে অস্বীকার করার কারণে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কাজেই এর মাধ্যমে বুঝা যায় যাকাতের কত বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান তাদেরও উচিত নিজ উদ্যোগেই যাকাত দিয়ে দেয়া। সমাজ থেকে সুদ দূর করে সেখানে যদি যাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি চালু করা যায় তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করে একটি সুখী সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নাজির আহমদ আরো বলেন, সাহাবায়ে কেরামগণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যাকাত আদায় করতেন। তাদেরকে যাকাত প্রদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হতো না। কারণ, তারা এর গুরুত্ব যথাযথভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই সে সময় একটি শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে যাকাতভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কোনই বিকল্প নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে কোন অর্থনৈতিক সমস্যা থাকবে না। দেশে যথাযথভাবে যাকাত আদায় হলে বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকা যাকাত আদায় হবে। আর তা সুষম বণ্টন করতে পারলে দেশকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব। তিনি মানবতার কল্যাণে ও দারিদ্র্যবিমোচনে যাকাত ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সকলকে শরীক হওয়ার আহবান জানান।
মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, যাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকার পরেও যদি কোন ব্যক্তি সঠিক পদ্ধতিতে যাকাত আদায় না করেন তাহলে এই সম্পদই কেয়ামতের দিনে তার জন্য সাপ হয়ে তাকে দংশন করবে। খলিফা আবু বকর (রা) যাকাত অস্বীকারকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বুঝিয়েছেন যাকাত কত গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই আমাদেরকে নিজেদের সম্পদের পবিত্রতার জন্যই নিজ উদ্যোগে যাকাত আদায় করতে হবে। তিনি বলেন, আল্লাহ যেভাবে আমাদের ওপর নামায ফরজ করে দিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে যাকাতও আমাদের ওপর ফরজ করা হয়েছে। কিন্তু যাকাত থেকে প্রকৃত কল্যাণ লাভ করতে হলে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই। রাসূল (সা.) যাকাত অস্বীকারকারীর জন্য কঠিন শাস্তির কথা তার হাদিসে উল্লেখ করেছেন। তাই দুনিয়াতে শান্তি ও আখেরাতে মুক্তির জন্য আমাদেরকে ইসলামের দিকেই ফিরে আসতে হবে।
অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন বলেন, পবিত্র কালামে হাকীমে যাকাতের যে গুরুত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, আমাদের প্রচলিত সমাজে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় না। আল্লাহ নামাযের সাথে যাকাতকে যুগপৎভাবে ফরজ করে দিয়েছেন। প্রথম খলিফা হযরত আবুবকর (রা.) যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। তাই যাকাতকে কোন মুমিন অস্বীকার করতে পারে না।
ড. মু. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, শোষণ ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু যাকাত থেকে পরিপূর্ণ সুফল পেতে হলে ইসলামকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করার কোন বিকল্প নেই।
মঞ্জুরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আমাদের দেশে যাকাতভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত না থাকার কারণেই এত অশান্তি। এ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যাদের দায়িত্ব তারাই আজ আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।
সভাপতির বক্তব্যে এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ এমপি বলেন, যাকাতভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পশুত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে আত্মাকে শক্তিশালী করতে হবে। আর যাকাতভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের মাধ্যমেই সেই অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব। তিনি ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সকলকে শরীক হওয়ার আহবান জানান।

