|
|
মো. মাহবুবুর রহমান, পাথরঘাটা (বরগুনা) : চলতি ইলিশ মওসুমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এলাকায় ভারতীয় জেলেদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। আগ্রাসন চালিয়ে বাংলাদেশের পানি সীমায় ইলিশ শিকার, বাংলাদেশী জেলেদের ওপর হামলা ও লুটপাটের প্রতিবাদে গতকাল সোমবার বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নৌবাহিনী প্রধান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটি প্রধান ও কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক বরাবর স্মারকলিপির অনুলিপি প্রদান করা হয়েছে।
বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ইলিশের খরার কারণে বর্তমানে উপকূলীয় জেলেদের দুর্দিন যাচ্ছে। গভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমানায় কিছু ইলিশ ধরা পড়ছে। কিন্তু ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের পানি সীমায় অনুপ্রবেশ করে জোরপূর্বক ইলিশ মাছ শিকার করায় বাংলাদেশী জেলেরা জাল ফেলতে পারছে না। এমনকি পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার সোনার চরের ভিতরে শত শত ভারতীয় ট্রলার ঢুকে অবাধে মাছ শিকার করছে। অতীতে বাংলাদেশী পতাকা ব্যবহার করে ভারতীয় জেলেরা চুরি করে মাছ শিকার করলেও এবার আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে মাইকিং করে বাংলাদেশী জেলেদের ওই এলাকা থেকে সরে যাবার হুমকি দিয়ে তারা মাছ শিকার করছে। এতে গভীর সমুদ্রে উভয় দেশের জেলেদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। গত ১৩ জুলাই শুক্রবার সোনার চর এলাকায় ভারতীয় জেলেদের হামলায় বাংলাদেশী ৭ জন জেলে আহত হয়েছেন। আহত জেলেরা হলেন, পাথরঘাটার আলম মোল্লার এফ বি মহসীন আউলিয়া ট্রলারের মাঝি বাদল মিয়া, এফ বি তারেক ট্রলারের মাঝি আ. ছত্তার, কাউছার ও হাবিব, এফ বি তরিকুল-৪ ট্রলারের মাঝি রফেজ, এফ বি তরিকুল-২ ট্রলারের মাঝি জাকির হোসেন, এফ বি আরিফা ট্রলারের মাঝি জাকির মিয়া জানান, ৩ দিন ধরে ভারতীয় ট্রলার বাংলাদেশের পানি সীমায় প্রবেশ করে বিভিন্নভাবে এ দেশের জেলেদের ওপর অত্যাচার করছে। ভারতীয় জেলেদের অত্যাচারে ক্ষতিগ্রস্ত জেলে হানিফা ও সেলিম জানান, বঙ্গোপসাগরে ভারত ও মিয়ানমারের জেলেদের অবাধ লুটপাটের কারণে বাংলাদেশী জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে পারছেন না। ভারত ও মিয়ানমারের জেলেরা নৌবাহিনীর সামনে অনুপ্রবেশ করে মাছ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে। বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, গত এক সপ্তাহে সোনার চর ও বলেশ্বর আইনের এলাকায় ভারতীয় ট্রলার ঢুকে বাংলাদেশী জেলেদের ওপর অত্যাচার চালায় এবং জাল-মাছ লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় বরগুনা ও পিরোজপুর জেলার পাড়ের হাটের এফ বি সোনার তরী, এফ বি হানিফা, এফ বি সরদার, এফ বি সেলিমসহ ২০ থেকে ২৫টি ট্রলারের মাঝি-মাল্লাকে পাথর মেরে আহত করে।
এভাবে ভারতীয় জেলেদের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমায় ইলিশ লুট চলতে থাকলে জিডিপি ও জাতীয় রফতানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। মৎস্য অধিদফতরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জিডিপিতে ইলিশ মাছের অবদান প্রায় ১.০%। অপরদিকে ফারাক্কাসহ বেশ কিছু অভিন্ন নদীর উজানে ভারতের বাঁধ দেয়ার কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে ইলিশ উৎপাদন কমে গেছে। ইলিশের জন্য বিখ্যাত এক সময়ের পদ্মা, ধলেশ্বরী, গড়াই, চিত্রা ইত্যাদি নদী বর্তমানে ইলিশ শূন্য। এমতাবস্থায় বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সীমানায় অনুপ্রবেশ করে অতি আহরণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ইলিশ শূন্য করার চক্রান্তে মেতে উঠেছে ভারতীয় জেলেরা। এ কাজে প্রচ্ছন্ন প্রটেকশন দিচ্ছে ভারতীয় উপকূল রক্ষীরা। ভারতে ইলিশ মাছের উৎপাদন বিগত দিনের তুলনায় ২.০-২.৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমায় ইলিশ মাছের সহনশীল উৎপাদন বজায় রাখার স্বার্থে ভারতীয় জেলেদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিরোধ করা জরুরি বলে মৎস্যজীবীরা মনে করেন।
বাংলাদেশের সমুদ্র সীমার মধ্যে অবস্থিত মৎস্য ভান্ডার রক্ষাও ছিল ১৯৭৪ সালের টেরিটোরিয়াল ওয়াটার্স এন্ড মেরিটাইমস এ্যাক্টের উদ্দেশ্য। আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নিয়মানুসারে সমুদ্র তীর থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সবকিছুর অধিকার তটবর্তী দেশ সংরক্ষণ করে। সমুদ্র তীর থেকে মহীসোপানের ২০০ নটিক্যাল মাইল এলাকা সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনৈতিক এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কোস্টগার্ডের দক্ষিণ (ভোলা) জোনাল কমান্ডার সেলিম রেজা হারুন সাংবাদিকদের ফোনে বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই, তবে এ মুহূর্তে সাগরে যাবার মত আমাদের যানবাহন নেই। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানাচ্ছি।

