Quantcast
ঢাকা, মঙ্গলবার 17 July 2012, ২ শ্রাবণ ১৪১৯, ২৬ শাবান ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৪১৬ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

রাষ্ট্রপক্ষের ৭নং সাক্ষী বললেন

কুন্ডেশ্বরী ঊনসত্তরপাড়া জগৎমল্ল এলাকায় হত্যাকান্ডের সময় আমি সালাহউদ্দিনকে দেখি নাই

শহীদুল ইসলাম : ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামের রাউজান এলাকার কুন্ডেশ্বরী ঊনসত্তরপাড়া, জগৎমল্ল পাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে বহু হত্যাকান্ড, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ অনেক মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের ৭ নম্বর সাক্ষী পূর্ব গুজারা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আববাস উদ্দিন আহমেদ সাক্ষ্যদানকালে বললেন যে তিনি এসব ঘটনার সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দেখেননি। তিনি লোকমুখে তার নাম শুনেছেন বলে জানিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ৬০/৭০ জনের লাশ দেখেছেন যা পাকিস্তান আর্মি হত্যা করেছিল। তবে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতার কোন কথা তিনি বলতে পারেননি।

গতকাল সোমবার বিকেল সোয়া ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত মাত্র ৪৫ মিনিটেই শেষ হয় রাষ্ট্রপক্ষের ৭ নম্বর সাক্ষী আববাস উদ্দিন আহমেদের জবানবন্দী। তিনি প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বেশ কতকগুলো ঘটনার বর্ণনা দিলেও তাতে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা না থাকায় তার প্রধান কৌঁসূলী এডভোকেট আহসানুল হক হেনা কার্যত জেরা করেননি। নিয়ম রক্ষার জন্য মাত্র ২টি প্রতীকী প্রশ্ন করেন তিনি। এর মাধ্যমেই তার জেরা পর্ব শেষ করা হয়। আগামী সোমবার পরবর্তী সাক্ষীর জন্য দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বিচারপতি নিজামুল হক, বিচারপতি আনোয়ারুল হক ও এ কে এম জহির আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গতকাল সোমবার সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে সাক্ষ্য দেন ইউপি চেয়ারম্যান আববাস।

৭নং সাক্ষী আববাস উদ্দিনের জবানবন্দী ও জেরার বিবরণ নিম্নরূপ:

আমার নাম আববাস উদ্দিন আহমেদ। আমার পিতার নাম আলহাজ্জ বকশি মিয়া। আমার বয়স ৬২ বছর। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ২০ বছর। আমি বিএসসি পাস করেছি ১৯৭৭ সালে। আমি বর্তমানে ছোট খাটো ব্যবসা করি এবং রাউজান থানার ১০নং পূর্ব গুজারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেন তখন আমি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলাম। আমি ঊনসত্তরপাড়ার গ্রামের বাড়িতেই থাকতাম। আমার মুরুবিব যারা ছিলেন তাদের সাথে একত্রিত হয়ে গ্রামে চাঁদা তুলে রসদ জোগাড় করে চট্টগ্রাম শহরে যারা মুক্তিযুদ্ধ করতো তাদের জন্য খিচুড়ি রান্না করে পাঠাতাম। ঊনসত্তরপাড়া গ্রামের দক্ষিণ পাশে একটি বটগাছ ছিল। সেখানে বেরিকেড দিয়ে আমরা গাড়ি চেক করতাম। এভাবেই আমাদের কার্যক্রম চলতে থাকে। ঊনসত্তরপাড়া গ্রামটি একটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা মাত্র ৫/৬টি পরিবার ছিলাম। হিন্দুদের সাথে সমন্বয় করে চলাফেরা করতাম। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঐ গ্রামের প্রতিটি মানুষ আবাল-বৃদ্ধ বণিতা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রত্যক্ষ ভূমিকায় ছিল। এপ্রিল মাসের ১১ তারিখ অনুমান ৩টার সময় তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান মুসলিম লীগের প্রধান ফজলুল কাদের চৌধুরী তার পরিবারসহ একটি গাড়িতে করে যাচ্ছিলেন। যেহেতু সেখানে বেরিকেড ও চেকপোস্ট ছিল স্বাভাবিক কারণে উনাদেরকে সেখানে নামতে হয়েছিল। নামতে বলায় উনারা খুব উত্তেজিত হন। গাড়িতে উনার ছেলে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অন্যান্যরা খুব ডাক-চিৎকার করে চলে যায়। ঐদিন সন্ধ্যায় ইঞ্জিয়ারিং কলেজে পাঞ্জাবীরা এসে দখল নেয়। ফলে সাধারণ মানুষ ঐ এলাকা ছেড়ে চলে যায়। পরের দিন ১২ এপ্রিল সকালে পাহাড়তলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উনসত্তরপাড়া গ্রামে এনে ডা. নিরঞ্জন দত্ত গুপ্তকে বলেন, আপনার এলাকায় হিন্দু যারা বাইরে চলে গেছে তাদেরকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনুন। নিরঞ্জন দত্ত গুপ্তের সাথে পারিবারিক সম্পর্ক থাকায় এই ঘটনা আমরা জানতে পারি। উনি বাড়িতে ফিরে আসার জন্য সব হিন্দুকে খবর দেন। হিন্দুরা বাড়িতে ফিরে আসার পরের দিন বিকেল ৪টার দিকে আসরের নামাজের পর মকতুল হোসেন, বার্মা ইউসুফ এসে বলে, আপনারা সবাই এক জায়গায় আসুন। আমাদের নেতা কথা বলবে। এর মধ্যে বাবুল মালিক দৌড়ে এসে আমাকে খবর দেয় যে, পাঞ্জাবীরা এসেছে। সব হিন্দুকে নিয়ে খিতিশ মহাজনের বাড়িতে যেতে বলেছে। সব হিন্দুরা সেদিকে যাচ্ছিল। আমি তখন বেরিয়ে উনসত্তরপাড়া স্কুলের পাশে আসি। উত্তর দিক থেকে ২/৩টি পাঞ্জাবী গাড়ি তখন দক্ষিণ দিকে যাচ্ছিল। আমি ও বাবুল মালিক স্কুলের দিকে দৌড়াচ্ছিলাম। আমি তাকে বললাম, তুমি তোমার বাড়িতে যাও। আমি আমার বাড়িতে চলে যাচ্ছি। আনুমানিক ২শ গজ যাওয়ার পর বিকট একটি গুলীর শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখি বাবুল মালিক রাস্তার ওপর পড়ে গেলো। তার পরই ঝড়ের মতো দক্ষিণ দিক ব্রাশফায়ারের শব্দ আসতে থাকলো। তখন আমি দৌড়ে আমার বাড়ির দিকে চলে যাই। গ্রামের অনেক লোক তখন ঐ রাস্তা দিয়ে পশ্চিম দিকে দৌড়াচ্ছিল। আমি বাড়িতে গিয়ে বলি যে, আমার মনে হয় উনসত্তর পাড়ায় অনেক মানুষকে মেরে ফেলেছে। পরের দিন ১০টার সময় আমরা জানতে পারি যে, ডা. নিরঞ্জন দত্ত গুপ্ত, আত্মহত্যা করেছে। কারণ হিসেবে জানতে পারি যে, উনার কথা মতো সব হিন্দু গ্রামে ফিরে আসে/পরে  সবাইকে হত্যা করা হয়। এই গ্লানিতে তিনি আত্মহত্যা করেন। পরের দিন ১০ এপ্রিল উনসত্তরপাড়ায় ২/১ বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ফিরে আসি, সর্বপ্রথম আমি আমার বন্ধু বাবুল মালিকের লাশ দেখতে পাই ছড়ার মধ্যে। এর ১শ গজের মতো দূরে তার বাবার লাশও পড়ে ছিল। এর পর আমার গ্রামের কিছু যুবক ভাইদের নিয়ে গ্রামের খিতিশ মহাজনের বাড়িতে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি, বিভিন্ন বয়সী কমকরে হলেও ৬০/৭০টি লাশ পড়ে আছে। আমরা খিতিশ মহাজনের বাড়ির ভিতরে আরো লাশ আছে কিনা তা খোঁজ করি। সেখানে গিয়ে দেখেছি ২ জন গর্ভবতী মায়ের লাশ পড়ে আছে এবং পেটের বাচ্চা অর্ধেক বের হয়ে আছে। আমরা তখন পাশে একটি গর্তে সবাইকে ফেলে মাটি চাপা দেই।

উনসত্তরপাড়ার ঘটনা পিয়ারু, বার্মা ইউসুফ ও মকতুর হোসেন সবাইকে ডেকে এনে দেখিয়েছে এবং বলেছিল, নেতা ডেকেছে। কোন নেতা তা বলেনি। পাঞ্জাবীদের সাথে সিভিল ড্রেসে ২ জন লোক আমি দেখেছি। তারা কারা দূর থেকে আমি চিনতে পারি নাই। মানষ বলছিল যে, বিভিন্ন জায়গায় গতকাল একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়। যার মধ্যে জগৎ মল্লপাড়া, কুন্ডেশ্বরী ইত্যাদি এলাকা উল্লেখযোগ্য। আমাদের এলাকায় এই কথা বলাবলি হতো যে, এসব ঘটনার সাথে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী জড়িত আছে। তবে আমি তাকে নিজে দেখি নাই।

এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী আজ আদালতে উপস্থিত আছে।

জবানবন্দী শেষ হওয়ার পর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী এডভোকেট আহসানুল হক হেনা মাত্র ২টি প্রশ্ন করেই প্রতিকীভাবে জেরা শেষ করেন। যার বিবরণ নিম্নরূপ :

প্রশ্ন : আপনাদের বেরিকেড বা চেকপোস্ট দিয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব ও তার পরিবারের যাওয়াটা সত্য নয়।

উত্তর : সত্য।

প্রশ্ন : জগৎ মল্লপাড়ায় হত্যাকান্ড বিষয় লোকে বলাবলি করা ও আপনার শোনা কথা সত্য নয়?

উত্তর : সত্য।