|
|
ভিসি ও প্রো-ভিসির পদত্যাগের দাবিতে বুয়েটের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে -সংগ্রাম
মোস্তফা মানিক : অচল প্রায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটে ছাত্র শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারী আজ ঐক্যবদ্ধ। বর্তমান ভিসি অধ্যাপক ড. এস এম নজরুল ইসলামের পদত্যাগই তাদের সবার এক দফা এক দাবি। বুয়েটের ইতিহাসে এতো দীর্ঘ আন্দোলন এটাই প্রথম। দলীয়করণের সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করায় বুয়েটে এ রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করছে শিক্ষক সমিতি।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, মেধাবীদের অবমূল্যায়ন, দলের লোকদের পদায়ন, সমর্থন বৃদ্ধির জন্য পদসৃষ্টি, বিশেষ কিছু লোককে সুবিধা দেয়া, ছাত্রলীগ কর্মীদের বিশেষ সুবিধা প্রদান করার কারণেই আজ বুয়েটের এ অবস্থা। বুয়েট শিক্ষক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহতাসিম জানান, অনিয়ম আর দুর্নীতির সর্বোচ্চ সীমায় অতিক্রম করেছেন ভিসি। তাই নিয়মতান্ত্রিক এ আন্দোলনের সঙ্গে সবাই একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। এর আগে ভিসির নানা অনিয়মের কারণে দু'বছর আলোচনা অব্যাহত রেখেছিল শিক্ষক সমিতি। তবে আলোচনার পরই ভিসি সব কথা ভুলে যান বলে সমিতি অভিযোগ করেছে। শিক্ষক সমিতি আরো জানায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বুয়েটকে কোনো ধরনের অপ-রাজনীতি গ্রাস করতে পারেনি। দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য অন্য কোনো ভিসিই বর্তমান ভিসির মতো অনিয়ম করেনি। ট্রাডিসনালি এ প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলছিল। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। এতো কিছুর পরও সরকারকে বিব্রত অবস্থায় ফেলতে চায়নি শিক্ষক সমিতি। তাই তারা এতো দিন আন্দোলন করেননি। ভিসিকে তারা বলেছিলেন, আপনি শুধু নিয়মানুযায়ী চলেন। আমরা আর কিছুই চাই না। তবে ভিসির নীল নকশা আগেই তৈরি ছিল বলে অনেক শিক্ষক অভিযোগ করছেন। তাই তিনি দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। পরিণতিতে বুয়েটের অবস্থা বর্তমানে অচলপ্রায়। শিক্ষকদের অভিযোগ, বর্তমান ভিসি ও প্রো-ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দলীয় রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। গোপালগঞ্জের বাড়ী এই ভিসিকে রাষ্ট্রপতি ২০১০ সালের ৩১ আগস্ট ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেন। আর নিয়োগের পর থেকেই তিনি অনিয়ম আর দুর্নীতি করে বুয়েটের সুনাম নষ্ট করছেন। এর আগে ২০০৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ৫৯ জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে ডিঙিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সভাপতি ও পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম হাবিবুর রহমানকে প্রো-ভিসি নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। এই উভয় নিয়োগেই বুয়েটের ঐতিহ্য এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ভঙ্গ হয়েছে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। প্রথমে প্রো-ভিসি হিসেবে অধ্যাপক হাবিবুর রহমানকে নিয়োগ দেয়ার পরই শিক্ষকদের অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ পায়। এ নিয়োগের বিরোধিতা করে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়েছিল। বুয়েট শিক্ষকদের দাবি, অতীতে প্রো-ভিসি পদটি ছিল না। তাই এখনো এতো ছোট একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রো-ভিসি পদের প্রয়োজন নেই। তাছাড়া জ্যেষ্ঠতার তালিকায় এতো পেছনে থাকা একজন অধ্যাপককে সামনে টেনে আনার বিষয়টি কেউ সমর্থন করেননি। ভিসি ও প্রো-ভিসির বিরুদ্ধে দলীয় ভিত্তিতে নিয়োগ, পদায়ন, পদ সৃষ্টি, সুবিধা প্রদান, শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মসহ ১৬টি অভিযোগ আনে শিক্ষক সমিতি। এ সব অভিযোগের ভিত্তিতেই ভিসির সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় বর্তমানে বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ৩১ আগস্ট নিয়োগ পাওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার জসিম উদ্দিন আকন্দকে সরিয়ে দেন। পরে দলীয় বিবেচনায় ওই পদে দায়িত্ব দেয়া হয় ডেপুটি রেজিস্ট্রার কামাল আহম্মদকে। তবে শিক্ষকদের বাধার কারণে কামাল আহম্মদকে স্থায়ী নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, কামাল আহম্মদকে ১৯৯৪ সালে প্রশাসনিক অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি পান ২০০৫ সালে। ২০০৯ সালে ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদোন্নতি পান। রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতির জন্য অন্তত ৫ বছর ডেপুটি রেজিস্ট্রারের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কিন্তু কামাল আহম্মদের তা ছিল না। অভিযোগে বলা হয়, ভিসি ও প্রো-ভিসি যোগদানের পর থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতির জন্য গঠিত বিভিন্ন কমিটি আগের রীতি ভঙ্গ করে বিশেষ উদ্দেশে নিজেদের পছন্দসই ব্যক্তিদের সমন্বয়ে পুনর্গঠন করা হয়। এমনকি কর্মচারী নিয়োগে টাকা লেনদেনের ও অভিযোগ করা হয়েছে। প্রায় ১৭ জন সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগে বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। গত দু'বছর ধরে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিম্ন যোগ্যতার প্রার্থীকে নিয়োগের একের পর এক ন্যক্কারজনক ঘটনা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটছে। একাডেমিক কাউন্সিলকে পাশ কাটিয়ে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় চরম অরাজকতা তৈরি করা হয়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রো-ভিসিকে সিলেকশন গ্রেড প্রদান এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন পদে পদোন্নতি, সিলেকশন গ্রেড, টাইমস্কেল প্রদানের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদানেরও অভিযোগ তুলে শিক্ষক সমিতি। এ ছাড়া ছাত্রলীগের দুই কর্মীর পরীক্ষার ফলাফল পরিবর্তন বুয়েটের ইতিহাসে নজিরবিহীন ও নিয়মবহির্ভূত ঘটনা। এমনকি দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে নিয়মবহির্ভূতভাবে আবাসিক হলের প্রভোস্ট নিয়োগ, সদস্য মনোনয়নে বুয়েট অ্যালামনাই ফেডারেশনের কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন করে সংগঠনকে বিতর্কিত করা হয়েছে। এদিকে ভিসির ছত্রছায়ায় ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। ছাত্রদের টাকা-পয়সা লুট, ল্যাপটপ হাতিয়ে নেয়া, টেন্ডারবাজি, ক্যান্টিনে ফাও খাওয়াসহ নানারকম অপকর্ম ছাত্রলীগ করছে। এ ছাড়া সাধারণ ছাত্রদের মারধর, হাত-পা ভেঙে দেয়া, সিনিয়রদের অসম্মান, শিক্ষকদের সঙ্গে বেয়াদবি, হুমকি, চাঁদাবাজি ইত্যাদিও তারা করছে। এসব কারণে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংগঠন বুয়েট শাখার কমিটি ভেঙে দেয়া হয়। ছাত্রলীগের এসব নৈরাজ্য নিয়ে ভিসির কাছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত বিচার দিলেও তিনি বিচার করেননি। বরং এক ছাত্রলীগ নেতাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পরীক্ষার ফল তৈরি এবং দুই ছাত্রের ফল পরিবর্তনে ভিসি ন্যক্কারজনকভাবে অনুমতি পর্যন্ত দিয়েছেন ভিসি। তবে সবচেয়ে দৃষ্টিকটূর বিষয় হচ্ছে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেপরোয়া আচরণ। বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙিয়ে কতিপয় তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীরা শিক্ষকদের নানাভাবে হয়রানি করতো। শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ বন্ধ করে দিতো। এমনকি শিক্ষকদের কটূক্তি করে ও তাদের বিরুদ্ধে মিছিল বের করতো। অথচ প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে শৃক্মখলা ভঙ্গের দায়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, আমরা তাদের শুধরানোর জন্য বারবার সময় দিয়েছি। কিন্তু তারা আমাদের হতাশ করেছেন। এখন তাদের পদত্যাগ ছাড়া আমরা মাঠ ছাড়বো না।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৬ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ পান অধ্যাপক ড. এস এম নজরুল ইসলাম। সেখানেও শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, পদোন্নতি ও কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। শেষ পর্যন্ত টিকতে না পেরে ২০০১ সালে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ৭ দিন আগেই তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দায়িত্ব ছেড়ে চলে আসেন।

