Quantcast
ঢাকা, বুধবার 18 July 2012, ৩ শ্রাবণ ১৪১৯, ২৭ শাবান ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ১১৫ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে টেন্ডার বাণিজ্য-শেষ

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ঠিকাদার হত্যার উৎসবে নামে দলীয় ক্যাডাররা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশব্যাপী শুরু হয় দলীয় নেতাদের টেন্ডার বাণিজ্য। একে কেন্দ্র করে সারা দেশে শুরু হয় অস্থির রাজনীতি। জোর যার মুল্লুক তার এমনটাই ভাব দেখান সরকারি দলের নেতারা। টেন্ডার মেতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। যে কোন প্রকারে টেন্ডার তাদের পেতেই হবে। টেন্ডার বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হাতাহাতি ও খুনের ঘটনা যেন নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়। পেশাদার ঠিকাদাররা যেন কাজ না পায় এজন্য ঠিকাদার হত্যার উৎসবে নামে দলীয় ক্যাডাররা। এ যেন বাংলাদেশ থেকে ঠিকাদার নিধন অভিযান। টেন্ডার নিয়ে গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে ৫ শতাধিক সংঘর্ষ হয়েছে। খুন হয়েছেন অর্ধশতাধিক ঠিকাদার। একের পর এক খুনের ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ঠিকাদাররা। অনেকে প্রাণের ভয়ে এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে টেন্ডার কাজে অংশ নেন। ক্ষমতা ব্যবহার করে অল্প দিনে বিত্তবান হওয়ার লালসা এই টেন্ডার-সন্ত্রাসের অন্যতম কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। আর এই লোভকে উস্কে দিয়েছে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট এ্যাক্ট বা সরকারি ক্রয় আইনের পরিবর্তন। বিগত সাড়ে তিন বছরে বেশির ভাগ সংঘর্ষ হয়েছে সরকারি দলের সমর্থক দুই গ্রুপ টেন্ডারবাজদের মধ্যে। তবে কখনো বিরোধী দলের সমর্থকদের সাথে ক্ষমতাসীন, আবার কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের সাথে সাধারণ ঠিকাদারদের সংঘর্ষ ঘটেছে। বর্তমানে সাধারণ ঠিকাদারদের অনেকেই ভয় পান টেন্ডার জমা দিতে। আবার অনেক সময় সরকারি দলের প্রভাবশালী ক্যাডাররা অন্যদের টেন্ডার জমা পর্যন্ত দিতে দেয় না। এক্ষেত্রে অসহায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও। তারা কিছুই বলতে পারছেন না। মাঝে মধ্যে ক্ষমতাসীনদের তুষ্ট করতে অন্যায়কেও সমর্থন দিতে বাধ্য হচ্ছেন টেন্ডার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সর্বনিম্ন দরদাতা হলেই এখন আর কাজ পাওয়া যায় না। সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন দরদাতা বলে এখন এককভাবে নির্ণায়ক কিছু নেই। নেতা, এমপি ও মন্ত্রীদের নাম ভাঙিয়ে দলীয় সমর্থকদের ভাগ্যেই জুটছে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশব্যাপী টেন্ডার নিয়ে পাঁচ শতাধিক সংঘর্ষ এবং অর্ধশতেরও বেশি ঠিকাদার খুন হয়েছেন। রাজধানীর সূত্রাপুরে সন্ত্রাসীদের গুলীতে মো. শহীদ (৩৫) নামে এক ঠিকাদার খুন হয়েছেন। রাত সাড়ে ১১টায় মোটরসাইকেলে শহীদ বাংলাবাজারে বাসায় যাওয়ার সময় লালমোহন দাস স্ট্রিটে পৌঁছলে দুই অস্ত্রধারী তাকে লক্ষ্য করে গুলী ছোঁড়ে। গুলীবিদ্ধ হয়ে শহীদ শহীদকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ঠিকাদারীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর খুলনা অঞ্চলের প্রভাবশালী নেতা ও যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি শহীদ ইকবাল ওরফে বিথার খুন হন। ২০০৯ সালের ১১ জুন রাতে বিথার খুন হওয়ার পর যুবলীগ নেতা মেসবাহ হোসেইন ওরফে বুরুজসহ ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে সবে কাদির নামে এক আসামী ছাড়া সবাই জামিনে মুক্তি পায়। তাদের জবানবন্দী অনুযায়ী মূলত ঠিকাদারী ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতেই পরিকল্পিতভাবে বিথারকে খুন করা হয়। আর এই খুনের পরিকল্পনাকারী হিসেবে নাম এসেছে স্থানীয় চার প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার। খুনের পরিকল্পনাকারী হিসেবে প্রভাবশালী নেতাদের নাম আসায় মামলাটি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ শাখায় পাঠানো হয়। রংপুরে ছাত্রলীগ নেতা ও র‌্যাবের ২ সোর্সসহ ৩ জনকে নৃশংসভাবে খুন করে সন্ত্রাসীরা। এ খুনের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে কোতোয়ালী থানায় পৃথক দু'টি মামলা করা হয়। ছাত্রলীগ নেতা মাসুদ রানার খুনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। রংপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের টেন্ডারের ৯ লাখ টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জের ধরে খুন হন রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক ও ঠিকাদার মাসুদ রানা। ঝিনাইদহের শৈলকূপায় হাটবাজার ইজারার টেন্ডার জমা দেয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে রশিদ নামে একজন নিহত হন। রাজশাহীতে খুন হন ঠিকাদার আবদুল কুদ্দুস। দরপত্র দাখিলকে কেন্দ্র করে পঞ্চগড়ে সরকারি দলের দু'গ্রুপের সংঘর্ষে ফারুক হোসেন নামে এক ঠিকাদার খুন হন। দিনাজপুর গণপূর্ত বিভাগে জেলা কারাগারে কয়েদি ব্যারাক নির্মাণে প্রায় ১৪ কোটি টাকার দরপত্র জমা দেয়াকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষ হয়। সাভারের আশুলিয়ায় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ঠিকাদার রাশেদ মিলন খুন হন। সন্ত্রাসীরা এ ব্যবসায়ীর লাশ আশুলিয়ার পাড়াগ্রাম এলাকার সাদুপাড়া মহল্লার লেকের পাড়ে ড্রেনে ফেলে দেয়।

চট্টগ্রামের হালিশহরে দিনদুপুরে সন্ত্রাসীরা আবদুল মোনাফ (৩১) নামে এক ঠিকাদারকে গুলী করে হত্যা করে। টেন্ডারকে কেন্দ্র করেই এ খুনের ঘটনা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর নূরজাহান রোডে সন্ত্রাসীদের গুলীতে তানজীব হোসেন জনি নামে এক ঠিকাদার খুন হন। তিনি বাংলাদেশ ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মকবুল হোসেন মন্ডলের ছেলে। তাদের বাড়ি মোহাম্মদপুরের ১১০/এ কাটাসুর, নামার বাজারে। রাজধানীর মিরপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলীতে ঠিকাদার শাহজান মিয়া খুন হন। তিনি ৭৮৬/১ পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসায় ভাড়া থাকতেন। তিনি স্থানীয় ১৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের একজন নেতা বলেও জানা গেছে। সিলেটে খুন হন ঠিকাদার রহমত আলী। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের পূর্ব তেজতুরীবাজার এলাকায় বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সন্ত্রাসীদের গুলীতে মাসুম ভূঁইয়া বাবলু (৪২) নামে এক ঠিকাদার খুন হন। তিনি ছিলেন বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের একজন নেতা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে জুমার নামায পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় বিজ্ঞান কলেজের কাছে মাসুমের ওপর গুলী চালানো হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা মাসুমকে মৃত ঘোষণা করেন।

রাজধানীর বাড্ডায় সন্ত্রাসীদের গুলীতে নিহত হন ঠিকাদার নাজিম। রাজধানীর মধ্য বাড্ডার রিং রোডের জমিদার বাড়ির মোড়ে সন্ত্রাসীরা নাজিম ও তার বন্ধু উজ্জ্বলকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলী করে। এতে ঘটনাস্থলেই নাজিম নিহত হন। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কাশিয়ানীতে পীযূষ কান্তি বিশ্বাস (৩৩) নামে এক ঠিকাদারকে হত্যা করা হয়। নওগাঁ সদর উপজেলার পার-বোয়ালিয়া গ্রামে জুবায়ের হোসেন লিটন নামে এক ঠিকাদারকে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। গত বছর ১৫ জুন রাজশাহী মহানগরীর কোর্ট হড়গ্রাম বাজার এলাকায় আবদুল কুদ্দুস নামে এক ঠিকাদারকে খুন করা হয়। একই বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারী ঠিকাদারী নিয়ে বিরোধ, মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার ও দলীয় কোন্দলের কারণেই খুন হন ছাত্রলীগ নেতা এবিএম ফারুক হোসেন আরমান। সবুজবাগের মাদারটেকে ব্যবসায়িক বিরোধের জের ধরে খুন করা হয় ঠিকাদার আল আমিনকে। রংপুরে গত বছর ঈদের আগের দিন টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে এক ঠিকাদারকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ঈদের রাতে শহরের অদূরে পাগলা পীর এলাকায় আরো দুই ব্যবসায়ীকে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়। ব্যবসায়িক দ্বনেদ্বর কারণে চট্টগ্রামের চন্দনাইশে খুন হন ঠিকাদার কালাম। গত বছরের ১৫ নবেম্বর রাতে বরমা ইউনিয়নের চরবরমা গ্রামের বজল আহমদের ছেলে ঠিকাদার আবুল কালামকে (৪২) ডেকে নিয়ে হত্যা করে লাশ পুকুরে ফেলে রাখা হয়। পরদিন সকালে স্থানীয় লোকজন খবর দিলে পুকুর থেকে কালামের লাশ উদ্ধার করে থানা পুলিশ। নিষেধ উপেক্ষা করে টেন্ডার জমা দেয়ায় ছাত্রলীগ-যুবলীগ ক্যাডারদের হাতে প্রাণ দিতে হয় সঞ্জীব দাশকে (৪০)। গত বছরের ৮ এপ্রিল রাতে নগরীর টাইগারপাস এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীরা তাকে লাঠি, হকিস্টিক এবং লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। নিহত সঞ্জীব দাশ কালুরঘাট শিল্প এলাকার হলি জিপার নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। রাজধানীর মহাখালী সেতু ভবন ও বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ঠিকাদারী কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জের ধরে ঢাকা মহানগর (উত্তর) যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার পাশা ওরফে লিটনকে গুলী করে হত্যা করা হয়। গত বছর মহাখালীর একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে সন্ত্রাসীরা আনোয়ার পাশাকে হত্যা করে। নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাসীরা ফজল শেখ (৩৮) নামে এক নির্মাণ ঠিকাদারকে হত্যা করে। নিহত ফজল শহরের মধ্য সৈয়দপুর এলাকার মৃত নেওয়াজ আলী শেখের ছেলে। মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের ঠিকাদারী কাজের বিরোধ নিয়ে খুন হয় ঢাকা (উত্তর) যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন পাশা ওরফে লিটন। গত ১৯ জুলাই ঢাকা (উত্তর) যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক লিটন (৪২) খুন হন। মহাখালী আমতলী এলাকার একটি হোটেলে প্রবেশের মুখে সন্ত্রাসীরা তাকে গুলী করে খুন করে। গত বছর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মাহমুদাবাদ এলাকায় মাইক্রোবাসে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় দুলাল মিয়া (৩০) নামে এক ঠিকাদারকে।

টেন্ডারবাজিতে জড়িতদের ছাড় দেয়া হবে না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুনের ঘোষণার এক ঘণ্টার মাথায় সরকারি দলের ক্যাডারদের হামলায় রাজধানীতে খুন হন যুবলীগ নেতা ইউসুফ আলী সরদার। এরপর টেন্ডারবাজি আর খুনোখুনি তো কমেনি বরং বেড়েই চলেছে পাল্লা দিয়ে। সারা দেশে সরকার দলীয় ক্যাডারদের বেপরোয়া টেন্ডারবাজি ঠেকাতে প্রশাসনও ব্যর্থ হচ্ছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন, শিক্ষাভবন, এলজিইডিই শুধু নয়, এ টেন্ডার সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে মফস্বলেও। ঢাবি, জাবি ও জবিসহ অনেক শিক্ষাঙ্গনেই ছাত্রলীগের একশ্রেণীর নেতা ও ক্যাডার ব্যাপক টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে। এক পর্যায়ে এদের কর্মকান্ড এতটাই মাত্রা ছাড়িয়ে যায় যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত হয়ে তার সাংগঠনিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন ছাত্রলীগের সাথে। মূল দলের সাধারণ সম্পাদক বারবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন এসব কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে। তাতেও টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি কখনোই বন্ধ থাকেনি। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও টেন্ডার নিয়ে সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে।