Quantcast
ঢাকা, শনিবার 21 July 2012, ৬ শ্রাবণ ১৪১৯, ১ রমযান ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৬৫৬ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

হুমায়ূন আহমেদের লাশ আগামীকাল আসবে

হুমায়ূন আহমেদ

স্টাফ রিপোর্টার : প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের লাশের অপেক্ষায় রয়েছে শোকার্ত বাংলাদেশ। নন্দিত, প্রজ্ঞাবান এবং ‘হিমু', ‘মিসির আলী' ‘বাকের ভাই' চরিত্রের স্রস্টার লাশ আগামীকাল রোববার দেশে পৌঁছবে। এদিকে গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কের জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে স্থানীয় সময় জুমার পর তার প্রথম জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। আজ শনিবার স্বজনরা তার কফিন নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশী পাঠকদের বইমুখী করার এই জাদুকর কথাশিল্পী ক্যান্সার নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২০ মিনিট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের বেলভ্যু হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এমএ মোমেন বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে টেলিফোনে একটি বার্তা সংস্থাকে বলেন, ‘‘একটু আগেই তাকে (হুমায়ূন) মৃত ঘোষণা করেছেন চিকিৎসকরা।’’

লেখকের দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, ছোট ভাই মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, বন্ধু মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে ড. মোমেনও মৃত্যুর সময় হাসপাতালে ছিলেন। জাফর ইকবাল জানান, এই লেখক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতার প্রথম জানাযা হবে নিউইয়র্কের জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে। শনিবার স্বজনরা তার লাশ নিয়ে দেশের পথে রওনা হবেন, দেশে পৌঁছাবেন রোববার।

গাজীপুরে হুমায়ূনের গড়া নুহাশ পল্লীতে তাকে দাফন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তার ছোট ভাই কার্টুনিস্ট আহসান হাবিব। তিনি বলেন, তার ইচ্ছার কথা নুহাশ পল্লীর ক'জন স্টাফের কাছে বলে গেছেন। এখন আমরা তার লাশের অপেক্ষা করছি।

বৃহদান্ত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কে যান হুমায়ূন আহমেদ। সেখানে মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন তিনি। দুই পর্বে মোট ১২টি কেমো থেরাপি নেয়ার পর গত ১২ জুন বেলভ্যু হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. জেইন এবং ক্যান্সার সার্জন জজ মিলারের নেতৃত্বে হুমায়ূন আহমেদের দেহে অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পর ১৯ জুন বাসায় ফিরেছিলেন এই লেখক। স্ত্রী শাওনসহ সন্তানদের নিয়ে কুইন্সে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকছিলেন তিনি।

বাসায় ফিরলেও অবস্থার অবনতি ঘটলে পুনরায় বেলভ্যু হাসপাতালে নেয়া হয় তাকে। ২১ জুন তার দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার হয়। এরপর গত কয়েক দিন ধরে হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ছিলেন তিনি। অস্ত্রোপচারের আগে পরিবার-আত্মীয় স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে গত ১১ মে মাসে দেশে আসেন হুমায়ূন। দেশে ২০ দিন অবস্থানের পুরোটা সময় গাজীপুরে নিজের গড়া নুহাশ পল্লীতে কাটয়েছিলেন তিনি।

 

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এমএ মোমেন গতকাল জানিয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদের লাশ যত দ্রুত সম্ভব ঢাকায় পাঠানোর চেষ্টা চলছে। সম্ভব হলে প্রথম জানাযার পর বিমানযোগে পাঠানোর সর্বত্মক চেষ্টা করবেন তারা।

জানা গেছে, হুমায়ুন আহমেদের লাশ দেশে আনার জন্য জেট এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে বুকিং দেয়া হয়েছে। বুকিং নিশ্চিত (কনফার্ম) হলে নিউইয়র্কের সময় বিকেল সাড়ে ছয়টায় ফ্লাইটটি মুম্বাইয়ের উদ্দেশে মাত্রা করবে। সবকিছু সময় মতো হলে মুম্বাই থেকে আগামীকাল রোববার দুপুর ১২টায় বরেণ্য এ লেখকের মরদেহ দেশে পৌঁছাবে। একই ফ্লাইটে তার স্ত্রী ও সন্তানদের দেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। জাফল ইকবাল ফিরবেন এমিরেটসের ফ্লাইটে।

ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, হুমায়ূন আহমেদ পূর্ণাঙ্গ জীবনযাপন করে গেছেন। জীবনভর দেশের মানুষকে আনন্দ দিয়ে গেছেন। তার জীবনাবসান ঘটেছে। ভাই হুমায়ূন আহমেদের আত্মার শান্তির জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেন।

প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রী ও সন্তানদের হাসপাতাল থেকে সংবাদ দেয়া হয়েছে। জাফর ইকবালের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত প্রথম সংসারের সদস্যরা হুমায়ূনকে দেখতে আসেননি।

হুমায়ূনের মৃত্যুর খবর বাংলাদেশে পৌঁছা মাত্রই টিভিগুলোর স্ক্রনে ‘ব্রেকিং নিউজ' হিসেবে তা দেখানো হয়। তারপর থকে প্রধান শিরোনাম হিসেবেই স্থান পান ‘মরহুম হুমায়ূন আহমেদ। মধ্যরাতে সংবাদপত্রের পর্যালোচনা অনুষ্ঠানেও ব্যাকরণ ভেঙ্গে আলোচনা হয় হুমায়ূনকে নিয়ে। এ খবর যেন সবারই মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো। বিদেশী গণমাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর খবরটি স্থান পায়।

বর্ণাঢ্য জীবন

হাওড় জেলা নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা সদরের শেখবাড়ি নানার বাড়িতে ১৯৪৮ সালে ১৩ নবেম্বর হুমায়ূন আহমেদের জন্ম। তার বাবা পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন মা আয়েশা ফয়েজ। পিতার নামের সাথে মিলিয়ে তার আসলনাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান আর ডাক নাম কাজল। পরে তিনি নিজেই নাম বদল করে রাখলেন হুমায়ূন আহমেদ। নামের প্রতি তিনি সুবিচার করতে পেরেছেন- এ কথা বলা যায়। সম্রাট হুমায়ূনের মতো তিনি নিজেকে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য অঙ্গনে অধিপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ছাত্রবস্থায় রচিত ‘নন্দিত নরকে' উপন্যাসটিই জনপ্রিয় হয়েছিল এবং তার পর থেকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। উপন্যাস, গল্প, কল্পবিজ্ঞান, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী ও আত্মজীবনীসহ ৩২২টি বই প্রকাশের পাশাপাশি নাটক লেখা ও নির্মাণ, চলচ্চিত্র নির্মাণ, এমনকি গানের সুরও করেছেন তিনি।

হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে লেখাপড়া শেষ করে একই বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু সাহিত্যের কী এক নেশায় অধ্যাপনা তার ভালো লাগেনি। সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদান রাখার জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, বাবসাস পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কারে ভূষিত হন।

হুমায়ূন প্রথম বিয়ে করেন ১৯৭৩ সালে মওলানা আকরম খাঁর নাতনী গুলতেকিনকে। তাদের চার সন্তান হলেন মেয়ে নোভা, শীলা, বিপাশা ও ছেলে নুহাশ। ২০০৫ সালে গুলতেকিনের সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর বিয়ে করেন নিজের হাতে গড়া অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে। এই দম্পতির দু'ছেলে সন্তান নিষাদ ও নিনিত। দাম্পত্য জীবনের এই ছন্দ পতনকে ঘিরে সমালোচনা হলেও তার সাহিত্য চর্চায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি বলেই প্রতীয়মান হয় হুমায়ূন আহমেদ শারীরিকভাবে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেও কর্মের মাধ্যমে তিনি বেঁচে থাকবেন।

সারা দেশে শোকের ছায়া

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের প্রবাদ প্রতীম, প্রজ্ঞাবান ও অসংখ্য ‘বেস্ট সেলার' উপন্যাসের নিপুণ কারিগর হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জনপ্রিয় এই কথা সাহিত্যিকের ইন্তিকালে প্রবাসী বাংলাদেশী হুমায়ূন ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে বিরাজ করছে প্রিয়জন হারানোর বেদনা। গতকাল শুক্রবার রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান, বিরোধী নেতাসহ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পৃথকভাবে শোক বাণী দিয়েছেন।

মৃত্যুর স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই এ খবর বাংলাদেশে পৌঁছলে প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া পৃথক বাণীতে গভীর শোক ও তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। তারা নিজ নিজ বাণীতে এই কিংবদন্তীর লেখক নির্মাতার সৃষ্টিগাঁথাকে স্মরণ করে বলেন, হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে দেশ ও বাংলা সাহিত্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেলো। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমদ পৃথক এক শোক বাণীতে বলেন, ‘‘দেশবরেণ্য কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমদের ইন্তিকালে আমি গভীর শোক প্রকাশ করছি। তার ইন্তিকালে গোটা জাতি শোকে মুহ্যমান। তার ইন্তিকালে বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো। বাংলা সাহিত্যে তার অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার ইন্তিকালে বিরাট এক শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তিনি তার শক্তিশালী লেখনীর মাধ্যমে জাতির বিরাট খেদমত করে গিয়েছেন। আমি তার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও ভক্ত-অনুরক্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি এবং দোয়া করছি আল্লাহ তাদের এ শোক সহ্য করার তাওফিক দান করুন।’’

আরো শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ এডভোকেট, ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলী এবং মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবৃন্দ। এছাড়াও শোকবাণী দিয়েছে বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ ভাসানী), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক দল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী

লীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, সাউন্ড বাংলা, সেলিম আল দীন স্মৃতি পরিষদ, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি, বাংলাদেশ পোশাক উৎপাদন ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠান।

নেত্রকোনা সংবাদদাতা : জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে গতকাল শুক্রবার তার নিজ জেলা নেত্রকোনায় শোক র‌্যালি ও শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা শহরের বিভিন্ন সাহিত্য ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন সম্মিলিতভাবে এ উদ্যোগ গ্রহণ করে। জেলা শহরের মোক্তারপাড়া থেকে র‌্যালিটি বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শিল্পকলা একাডেমীতে গিয়ে শেষ হয়।

  পরে শিল্পকলা একাডেমীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় শোকসভা। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. রুহুল আমিন, মো. ইউসুফ আলী, অধ্যাপক মতীন্দ্র সরকার, শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক সানাওয়ার হোসেন ভূঁইয়া, ডায়াবেটিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক বাচ্চু, উদীচীর সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান, লোক গবেষক গোলাম এরশাদুর রহমান, নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজের সভাপতি অধ্যাপক কামরুজ্জামান চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল্লাহ এমরান, দুর্বার গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক হাসান কামরুল, খালেকদাদ চৌধুরী স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক তানভীর জাহান চৌধুরী, বাতিঘরের সভাপতি সঞ্জয় সরকার ও সাধারণ সম্পাদক আলমগীরসহ আরো অনেকে যোগ দেন র‌্যালি ও শোকসভায়।

উল্লেখ্য, জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জন্ম নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী শেখ বাড়িতে। সেখানে তার নানার বাড়ি। অন্যদিকে তার পৈত্রিক নিবাস নেত্রকোনার কেন্দুয়ার উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে।

শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রতিক্রিয়া

‘হুমায়ূন আহমেদের

মৃত্যু সবচেয়ে

শোকের

স্টাফ রিপোর্টার : বরেণ্য লেখক-নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর খবরে বাংলাদেশের সাহিত্যিক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মীদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, এই কথাশিল্পীর মৃত্যু তাদের জীবদ্দশায় দেখা সবচেয়ে শোকের, সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাগুলোর একটি।

হুমায়ূনকে শরৎচন্দ্র উত্তর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ‘বড় লেখক' অভিহিত করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ‘‘অনেক বড় মাপের লেখক অনেক সময় জনপ্রিয়তা পান না। কিন্তু হুমায়ূন ভাইয়ের উপন্যাস যেমন জনপ্রিয়, তেমনি গভীর জীবনবোধে আচ্ছন্ন। মানুষের চরিত্রকে এতো ভালোভাবে বুঝতে তার মতে আর কাউকে দেখিনি।’’ হুমায়ূনের অসুস্থ হওয়ার আগের দিনগুলোর কথা মনে করে বাচ্চু বলেন, তার মৃত্যু আমাদের জীবদ্দশায় সবচেয়ে শোকের, সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাগুলোর একটি।

হুমায়ূনের বন্ধু, ‘বাকের ভাই' খ্যাত অভিনেতা ও সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘‘আমার কিছু বলার ভাষা নেই। খুব আশা করেছিলাম সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক।’’

লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘‘হুমায়ূন নেই তা ভাবতে পারছি না। একটা গভীর শূন্যতা তৈরি হলো। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান ছিল অনেক। হুমায়ূন ছিল একজন খাঁটি মানুষ।’’ ভারতীয় লেখকদের একচেটিয়া বাজার হুমায়ূন আহমেদ একাই রুখে দিয়েছেন বলেও তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে উল্লেখ করেন।

হুমায়ূনের বহু নাটকের অভিনেতা আলী যাকেরের ভাষায়, যে কয়জন লেখক সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের একেবারে কাছাকাছি নিয়ে যেতে পেরেছেন তাদের মধ্যে হুমায়ূন একজন। ‘‘হুমায়ূন পৃথিবীতে এসেছিলেন অসম্ভব ক্ষমতা নিয়ে। তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা সব সময়ই ছিল আনন্দের।’’

ঊনিশশ আশি ও নববইয়ের দশকে টেলিভিশনে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের নাটকগুলো এতোটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে তার সৃষ্টি করা চরিত্রগুলোর বিপদে সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নেমে মিছিল করতেও দেখা গেছে। তার ‘এইসব দিনরাত্রী' নাটকের কথা স্মরণ করে অভিনেত্রী ডলি জহুর বলেন, ‘‘হুমায়ূন আহমেদের ওই একটি নাটকে অভিনয় করে যে পরিচিতি আমি পেয়েছি, তার তুলনা হয় না। এখনো অনেকে আমাকে ‘নিলু ভাবী' বলে চেনে।’’

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান লেখক আনিসুল হক বলেন, কবি কাজী নজরুলের পর হুমায়ূন আহমেদ এমন ব্যক্তি জীবদ্দশায়ই যিনি কি-না ব্যাপক জনপ্রিয় ও বহুল পঠিত ছিলেন।

 

বিবিসিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

জনপ্রিয়তায় শরৎচন্দ্রকেও ছাড়িয়ে গেছেন হুমায়ূন আহমেদ

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর খবরে স্তম্ভিত পশ্চিমবঙ্গের নন্দিত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তার মতে, বাংলাদেশে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেও ছাড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন হুমায়ূন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটন বেলভ্যু হাসপতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ সময় গত বৃহস্পতিবার রাতে মারা যান একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ। গত বছরের শেষ দিক থেকে তিনি ওরাল ক্যান্সারে ভুগছিলেন।

তার মৃত্যুর খবরে পশ্চিমবঙ্গের লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বিবিসি বাংলাকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘‘যদিও সে আমার থেকে অনেক ছোট, কিন্তু তার বুদ্ধিমত্তা, তার পড়াশোনা, আর লেখার মধ্যে যে হিউমার জ্ঞান- এই সব দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি।

তিনি বলেন, ‘‘আর মানুষ হুমায়ূন তো আমার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। কত জায়গায় আমরা এক সঙ্গে বেড়াতে গেছি। আমি সত্যি কথা বলছি তোমাদের, আমি খুবই শকড্ হয়েছি। হুমায়ূনকে আমি খুবই ভালোবাসতাম। বড্ডই কষ্ট হচ্ছে যে হুমায়ূন আর নেই।’’ দুই বাংলার এই দুই জনপ্রিয় লেখকের মধ্যে বয়সের পার্থক্য থাকলেও বন্ধুত্বের নৈকট্য তৈরি হয়েছিল তাদের মধ্যে। বাংলাদেশে এসে সুনীল গাজীপুরে হুমায়ূনের গড়া নুহাশ পল্লীতেও বেড়াতে গেছেন।

সুনীল বলেন, ‘‘আমি ওর বইগুলো পড়েছি, তার মধ্যে এমন এটা রসজ্ঞান আছে, তেমনি অনেক বিষয়ে ওর গভীর যে পড়াশোনা ছিল, সেটাও জানতে পারা যায়। হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা কতো ছিল তার সবই আমি জানি। আমাদের দেশে এক সময় শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তা ছিল। তাকেও হুমায়ূন ছাড়িয়ে গেছে।’’ হুমায়ূনের মতো ‘রসসিক্ত' লেখা বাংলা ভাষায় ‘খুব একটা কেউ' পারেন না বলেও মন্তব্য করেন কলকাতার জনপ্রিয় এই সাহিত্যিক।

বিবিসি বাংলার এক প্রশ্নের জবাবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বাংলা সাহিত্যে আমি হুমায়ূনকে বেশ একটা উঁচু জায়গায় রাখব। আশা করব, ভবিষ্যতের পাঠক এবং গবেষকরাও তার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারবে।