|
|
জনস্বার্থে আইনগত ব্যবস্থা নেবে ক্যাব
গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য পেশ করেন ড. এম শামসুল আলম -সংগ্রাম
0তৌফিক-ই-এলাহী জনগণের স্বার্থ তসরুপ করে নিজের স্বার্থ আদায় করছেন0
0 জ্বালানি অপরাধীদের বিচার এ দেশে হবেই হবে0
স্টাফ রিপোর্টার : ভোক্তা অধিকারের অগ্রপথিক সংগঠন কনজুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলেছে, বিশ্বব্যাংকের তল্পিবাহক জ্বালানি উপদেষ্টার চাপে বিইআরসি ঘন ঘন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করছে। বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে এ পর্যন্ত পাঁচবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। ভোক্তা তথা জনস্বার্থকে বিপন্ন করে দিয়ে আবারও বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। বিদ্যুতের দুরবস্থা ও মূল্যস্ফীতির প্রভাবে দিশেহারা জনগণকে পাশ কাটিয়ে বিদ্যুতের মূল্য আরেক দফা বৃদ্ধি ন্যায়সঙ্গত হবে না। সংগঠনটি এও বলেছে, বিদ্যুৎ মূল্য পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে সে অবস্থায় জনগণের পক্ষে ক্যাব অবশ্যই আইনগত পদক্ষেপসহ যে কোনো দৃঢ় ব্যবস্থা নেবে।
গতকাল শনিবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কর্তৃক বিদ্যুতের পাইকারী মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরী কমিশনে (বিইআরসি) অনুষ্ঠিত গণশুনানির প্রেক্ষিতে আয়োজিত সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় ক্যাব কর্মকর্তারা এসব কথা বলেন। এতে বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও গ্রাহক সাধারণের ভোগান্তি তুলে ধরে মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা ও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. এম শামছুল আলম। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ক্যাব সভাপতি কাজী ফারুক, সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট হুমায়ূন কবীর ভূঁইয়া প্রমুখ।
লিখিত নিবন্ধে বিদ্যুতের মূল্য আবারও বৃদ্ধি ন্যায়সঙ্গত হবে না উল্লেখ করে বলা হয়, বিইআরসি'তে গত ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে ১ জুলাই থেকে বিদ্যমান বিদ্যুতের গড় পাইকারী মূল্যহার ৪ টাকা ২ পয়সা থেকে ৬ টাকা ৮৭ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব পিডিবি পেশ করে। জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীর চাপে কমিশন ঘন ঘন বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করতে বাধ্য হচ্ছে। তাতে ভোক্তাদের স্বার্থ বিপন্ন হচ্ছে। কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় ভোক্তাদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। ঘন ঘন মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ২ অংকে পৌঁছেছে। বর্তমান বাজেটে তা ৭ শতাংশ নামিয়ে আনার অঙ্গীকার থাকলেও পুনরায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও বাস্তবায়ন কঠিন হবে। বর্তমানে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং এর প্রভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আবারও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে দেশের মানুষ এখন দিশেহারা। এ অবস্থায় বিদ্যুতের মূল্য আর না বাড়ানোর আহবান জানিয়েছে ক্যাব।
পিডিবি ও বিইআরসির মূল্যায়ন কমিটির হিসাবকে অযৌক্তিক, অসঙ্গতিপূর্ণ, বিভ্রান্তিকর ও বাস্তবসম্মত নয় মন্তব্য করে ক্যাব আরো বলেছে, ২০১২-১৩ সালে ৪৫ দশমিক ২৭ বিলিয়ন একক বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বলে ধরা হয়েছে। তাতে প্রবৃদ্ধি হবে ৩৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। কমিশনের মূল্যায়ন কমিটির হিসাবে ধরা হয়েছে ৪১ দশমিক ৭০ বিলিয়ন একক। তাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ২৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এই হিসাবের ভিত্তিতে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত হবে না।
ক্যাব আরো মনে করে, গত বছর কমিশনের সুপারিশ মতে বিদ্যুৎ খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ছিল। সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে পিডিবি এ বছর বিদ্যুতের মূল্য ২ টাকা ০১ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে এবং সেই সাথে ৩ হাজার ৭শ' কোটি টাকা ভর্তুকির প্রস্তাব করেছে। এ ভর্তুকি না পেলে বিদ্যুতের মূল্য আরো অতিরিক্ত ৮৪ পয়সা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি কার্যকর না করে নতুনভাবে ভর্তুকির প্রস্তাব অযৌক্তিক।
সকল কুইক রেন্টাল প্লান্টের চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি বা নবায়ন না করার জন্য কমিশনের আদেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার প্রস্তাব করে ক্যাব বলেছে, রেন্টাল প্লান্ট বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক। বিদ্যুৎ উৎপাদন হোক বা না হোক ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদ বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। এসব প্লান্টের চুক্তির মেয়াদ যেন না বাড়ে সে ব্যাপারে ভোক্তা, পিডিবি এবং কমিশনের মূল্যায়ন কমিটি একমত হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলায় কেবল বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিকে একমাত্র কৌশল হিসেবে ব্যবহার করায়ও ক্যাব উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. এম শামছুল আলম বলেন, বিশ্বব্যাংকের তল্পিবাহক প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহীর একক সিদ্ধান্তে চলছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়। তিনি জনগণের স্বার্থ তসরুপ করে নিজের স্বার্থ আদায় করছেন। উপদেষ্টা মিটিংয়ে কারো কথা শুনতে চান না। তিনি যা বলেন তাই বাস্তবায়ন করতে হয়।
শামছুল আলম এ বক্তব্য তার নয় মন্তব্য করে বলেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও প্লানিং কমিশনের কর্মকর্তারাই তাকে এ তথ্য জানিয়েছেন। কর্মকর্তারা তাকে জানিয়েছেন, মিটিংয়ে কোনো বিষয়ে তাদের মতামত নেয়া হয় না।
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য আরো বলেন, জ্বালানি উপদেষ্টার ভুল পরিকল্পনার কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাত চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও সামাল দেয়া যাচ্ছে না। জ্বালানি উপদেষ্টা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাতেও তিনি তার নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। দেশের ভালো মন্দ না দেখে তিনি ব্যক্তি স্বার্থ সংরক্ষণ করছেন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই কনকো ফিলিপসকে সাগরের গ্যাস ব্লক দিতে উঠে-পড়ে লেগেছিলেন জ্বালানি উপদেষ্টা। এর কারণ কি? কয়লা বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন। সম্প্রতি যমুনা রিসোর্টে ৪ দিন বৈঠক করেছেন। তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে এ কাজ করতে পারেন না বলেও মন্তব্য করেন শামছুল আলম।
ক্যাবের উপদেষ্টা আরো বলেন, তৌফিক-ই-এলাহীসহ সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টাদের যারা ক্ষমতায় বসিয়েছেন, ওই উপদেষ্টারা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। যে কারণে জ্বালানি খাতকে ব্যক্তিমালিকানায় তুলে দেয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে বিদ্যুতের এ দুরবস্থা বলে মনে করেন তিনি। কারো নাম উল্লেখ না করে শামছুল আলম বলেন, ৪০ বছর পরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছে জনগণ। একইভাবে জ্বালানি অপরাধীদের বিচারও এ দেশে হবেই হবে।
ক্যাবের সভাপতি কাজী ফারুক বলেন, এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো বেআইনী। প্রয়োজনে এর বিরুদ্ধে জনস্বার্থে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার পরিকল্পনা ভুল আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, অনেক বিকল্প ব্যবস্থা আছে। সরকার সেদিকেও যেতে পারে। তারা তা না করে দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে জনগণের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে এখন পর্যন্ত ৫ দফা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে গ্রাহক সাধারণ নাকাল হয়ে পড়েছেন।

