|
|
শহীদ মিনারে আবেগঘন পরিবেশ ফুল আর অশ্রুতে শেষ শ্রদ্ধা \ লাশ হিমঘরে
গতকাল সোমবার জাতীয় ঈদগাহে কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লাশ সর্বস্তরের জনতার শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আনা হয়। এ সময় কফিনের পাশে হতবিহবল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন মরহুমের বৃদ্ধা মা, পুত্র, কন্যা ও পরিবারের সদস্যরা -সংগ্রাম
স্টাফ রিপোর্টার : কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অগণিত ভক্ত, পাঠক, বন্ধু, সহকর্মী ও স্বজনরা ফুল আর অশ্রুতে হুমায়ূন আহমেদের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছে। কফিন সীলগালা করা থাকায় কেউ শেষ বারের মতো দেখতে পায়নি প্রবাদপ্রতীম কথাসাহিত্যিক ও নন্দিত চলচ্চিত্র নির্মাতার মরা মুখখানি। এরপর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে তার দ্বিতীয় নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সকালে ইন্তিকালের পাঁচ দিনের মাথায় এমিরেটস এয়ার লাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছে প্রজ্ঞাবান এই লেখকের লাশ। এদিকে, কোথায় সমাহিত করা হবে এই নিয়ে পারিবারিক অনৈক্যের কারণে বিলম্বিত হচ্ছে ‘হিমু', ‘মিসির আলী' ও ‘বাকের ভাই' চরিত্রের স্রষ্টার দাফন। পরিবারের সদস্যদের সিদ্ধান্তের জন্য জানাযা শেষে তার লাশ বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়েছে।
সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে নিউইয়র্ক থেকে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে এই লেখকের লাশ দেশে পৌঁছানোর পর ১০টা ২২ মিনিটে তার কফিনবাহী এ্যাম্বুলেন্স শহীদ মিনারে পৌঁছায়। প্রিয় লেখককে শেষবারের মতো দেখতে সকাল ৮টা থেকেই সেখানে ভিড় করে অজস্র মানুষ। বিমানবন্দর থেকে হুমায়ূনের লাশ ধানমন্ডির বাসায় নেয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তার কারণে তা বাতিল করা হয।
হুমায়ূনের কফিন রাখা হয় শহীদ মিনার চত্বরের উত্তর পাশে নির্মিত শোক মঞ্চে। লাল গালিচা দিয়ে হেটে এসে সবার আগে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে লেখকের কফিনে ফুল দেন তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কাজী ফখরুদ্দিন আহমেদ। এরপর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ফুল দেন তার বিশেষ সহকারী (মিডিয়া) মাহবুবুল হক শাকিল এবং প্রধানমন্ত্রীর এপিএস সাইফুজ্জামান শিখর।
শোক মঞ্চের পেছনে হুমায়ূনের প্রথম স্ত্রীর তিন সন্তান নোভা, শীলা ও নুহাশ, লেখকের দুই ভাই আহসান হাবীব ও ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, তাদের দুই বোন, জাফর ইকবালের স্ত্রী ইয়াসমীন হকের মুখে এ সময় ছিল বোবা কষ্ট, চোখে অশ্রু। বেলা ১১টা বাজার কিছুক্ষণ আগে হুমায়ূনের মা আয়েশা ফয়েজ এবং তারপর লেখকের দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন উপস্থিত হন শোক মঞ্চে। এ সময় তরুণ নুহাশকে কফিন জরিয়ে ধরে অঝোর ধারায় কাঁদতে দেখা যায়, যার পরনে ছিল বাবার সৃষ্ট চরিত্র হিমুর সেই হলুদ পাঞ্জাবি। হুমায়ূনের দীর্ঘদিনের বন্ধু প্রবীণ সাংবাদকি সালেহ চৌধুরী ও সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকও কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিষণ্ণ মুখে। একটু দূরে মলিন বদনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন।
আওয়ামী লীগের পক্ষে জাতীয় সংসদের উপনেতা ও দলের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল আলম হানিফ ও জাহাঙ্গীর কবির নানক ফুল দিয়ে হুমায়ূনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দিপু মনিও বাংলা সাহিত্যের এই জ্যোতিষ্কতুল্য লেখকের কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপির পক্ষ থেকে হুমায়ূনের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, দলের ভারপ্রাপ্ত সচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খায়রুল কবির খোকনসহ কয়েকজন নেতা। মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, হুমায়ূনের মৃত্যুতে শুধু বাংলা সাহিত্যে নয়, গোটা জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।
এছাড়া তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, পূর্ত প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শিরিন শারমিন, বুয়েট ভিসি এসএম নজরুল ইসলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আনোয়ার হোসেন, পুলিশের অতিরিক্ত আইজি শহীদুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদ কেন্দুয়ার কুতুবপুরবাসীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও দল এবং নানা শ্রেণী পেশার মানুষ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে থাকেন এই লেখককে। জাসদ, ছাত্র ঐক্য ফোরাম, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, ড. সেলিম অঅল দীন স্মৃতি পরিষদ, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্যজোটও ফুলেল শ্রদ্ধা জানায়।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ছাড়াও বেশ কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন শহীদ মিনার থেকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠান সরাসরি সপ্রচার করে। শহীদ মিনারে খোলা হয় দুটো শোক বই। সকাল ১০টা ২৫ মিনিট থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত আবেগঘন পরিবেশে দলমত-নির্বিশেষে সকল মানুষ হুমাযূনকে শেষ শ্রদ্ধা জানায়।
বৃহদান্তে ক্যান্সারে আক্রান্ত হুমায়ুন ৬৪ বছর বয়সে গত ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বেলভ্যু হাসপাতালে মারা যান। নিউইয়র্কে পরদিন প্রথম নামাযে জানাযার পর গত রোববার হুমায়ূনের কফিন নিয়ে দেশের পথে রওনা হন পরিবারের সদস্যরা। গতকাল সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে তার কফিনবাহী বিমানটি হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সুসজ্জিত একদল পুলিশ সদস্য কাঁধে করে বিমান থেকে তার কফিন নামিয়ে নিয়ে যান ফুলে ফুলে সাজানো একটি অ্যাম্বুলেন্সে।
হুমায়ূনের লাশ নিয়ে একই বিমানে দেশে পৌঁছান তার দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, তাদের দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত, শাওনের মা তহুরা আলী, বোন সেঁজুতি এম আফরোজ এবং পারিবারিক বন্ধু প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম।
বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে লেখকের লাশ গ্রহণ করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক। এ সময় সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, হুমায়ূনের দুই ভাই ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবীব এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (মিডিয়া) মাহবুবুল হক শাকিল।
জানাযা সম্পন্ন
শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের জানাযার নামায সম্পন্ন করা হয়েছে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। বেলা আড়াইটায় অনুষ্ঠিত হয় দেশে প্রথম দফা জানাযা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা সালাহউদ্দিন জানাযা নামাযে ইমামতি করেন। বরেণ্য এই কথাসাহিত্যিকের জানাযায় মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সমাজের সকল
শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন। হুমায়ূন আহমেদের জানাযায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক, পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ শরিক হন। হুমায়ূন আহমেদের জানাযায় কয়েক হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিকের জানাযায় আইনজীবীদের মধ্যে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি এডভোকেট জয়নুল আবেদীন, সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক, সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক মোমতাজ উদ্দিন মেহেদী প্রমুখ।
দাফন আজ !
বিমানের ফ্লাইট জটিলতার পর এবার পরিবারের সদস্যদের বিভক্তি মতের কারণে হুমায়ূন আহমেদের লাশ দাফন বিলম্বিত হচ্ছে। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নুহাশ পল্লীতে গতকালই তাকে সমাহিত করার কথা থাকলেও অনৈক্য দেখা দেয়ায় শেষমেষ তার লাশ রাখা হয় বারডেমের হিমঘরে। সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলে তাকে ঢাকায় কিংবা গাজীপুরে দাফন করা হবে। সন্ধ্যায় তার পরিবারের সদস্যরা বসে কোথায় দাফন করা হবে এর একটি সুরাহা করবেন বলে পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদের ভাইয়েরা এবং আগের ঘরের সন্তানরা চান তাকে বনানী অথবা বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হোক। তাদের যুক্তি, এতে হুমায়ূনের ভক্তরা তাকে সহজেই শ্রদ্ধা জানাতে পারবে। দূরে কোথাও দাফন করা হলে সেটি সম্ভব নয়। তবে নিউইয়র্ক থেকে ঢাকায় ফিরে আগের দিন রোববার হুমায়ূন আহমেদের ভাই ড. জাফর ইকবাল বলেছেন, স্ত্রী শাওন এলেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
গতকাল সকালে স্বামীর লাশ নিয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছেই হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন বলেন, মৃত্যুর আগে তার স্বামী বলে গেছেন তাকে যেন নুহাশ পল্লীতে দাফন করা হয়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কয়েকটি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে শাওন বলেন, ‘‘নুহাশ পল্লীকে তিনি জীবনের চেয়েও ভালোবাসতেন। এখানের গাছগুলো তার নিজ হাতে লাগানো। এগুলোকে তিনি সন্তানের মতো ভালোবাসতেন।’’ তিনি আরো বলেন, ‘‘আপনারা দেখছেন কিছুদিন আগে তিনি দেশে আসেন। তিনি তো তখন ঢাকায় থাকেননি, নুহাশ পল্লীতে চলে গিয়েছেন। নুহাশ পল্লীর ঘাস ও গাছের ভিডিও করে নিয়ে যান, নিউইয়র্কে সময় পেলেই সে ভিডিও দেখতেন।’’ শাওন বলেন, ‘‘তিনি বলেছেন, আমার কিছু হয়ে গেলে সবাই আমাকে নিয়ে টানাটানি করবে। কিন্তু তুমি আমাকে আমার প্রিয় গাছের কাছে নিয়ে যাবে। আমাকে অচেনা জায়গায় রাখলে আমি ভয় পাবো।’’ নুহাশ পল্লীর প্রতি ইঞ্চি মাটি, প্রতিটি গাছ-ঘাস হুমায়ূনের চেনা বলেও উল্লেখ করেন তার দ্বিতীয় পত্নী।
হুমায়ূন আহমেদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি নিয়ে খানিকটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে তারা আশাবাদী এর সুন্দর সমাধান হবে। এদিকে, নুহাশ পল্লীতে সবকিছু প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কোথায় কবর দেয়া হবে সেই জায়গাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন ঢাকা থেকে নির্দেশ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কবর করা শুরু হবে।
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জানান, পরিবারের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত, ঢাকায় দাফন সম্পন্ন করতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

