Quantcast
ঢাকা, মঙ্গলবার 24 July 2012, ৯ শ্রাবণ ১৪১৯, ৪ রমযান ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৯৭ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা কর্মসংস্থানের অভাবে বাড়ছে বেকারত্ব

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : চলতি অর্থবছরের প্রথমা©র্ধ (জুলাই-ডিসেম্বর) তৃতীয়বারের মতো আবারও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ মুদ্রানীতির ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাবে। ইতোমধ্যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এর ফলে কমে এসেছে কর্মসংস্থান। কর্মসংস্থানের অভাবে বাড়ছে বেকারত্ব ও বেকারের সংখ্যা। এজন্য বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের হার পরিমিত রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে মুদ্রানীতিতে। দলীয় বিবেচনায় ব্যাংক দেয়ায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কোন কাজে আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সাথে এ মুদ্রানীতি দিয়ে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়ে আশংকা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে মূল্যস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি সমান্তরালভাবে কার্যকর করতে হবে।

গত ১৮ জুলাই চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য সংযত মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী ছয় মাসে রিজার্ভ মুদ্রার বৃদ্ধি সাড়ে ১৪ শতাংশ এবং ব্যাপক মুদ্রার তথা মুদ্রা সরবরাহের বৃদ্ধি ১৬ শতাংশ ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ১৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছর শেষে অর্থাৎ আগামী জুনে রিজার্ভ মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ঠিক করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ব্যাপক মুদ্রা বাড়বে সাড়ে ১৬ শতাংশ এবং বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির হার হবে ১৮ শতাংশ। জাতীয় বাজেটে প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অর্থপ্রবাহের এই হার পর্যাপ্ত হবে দাবি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে মুদ্রানীতিতে সরকারের সরাসরি ঋণ ও সরকারি খাতের ঋণ নেয়ার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আলাদাভাবে দেখানো হয়নি। মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে সরকারের ঋণ যাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তারল্য কমিয়ে না দেয় সেদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষভাবে নজর রাখবে। এছাড়া বিদেশী মুদ্রা বিনিময় হারের অতি অস্থিরতা রোধে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে গবর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ২০১১-এর মাঝামাঝি থেকেই দেশে গড় বার্ষিক মূল্যস্ফীতি অস্বস্তিকর দুই অংকের ঘরে গিয়ে দাঁড়ায় যা প্রলম্বিত হলে নিম্নবিত্ত জনসাধারণের দুর্ভোগের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির জন্যও হুমকি হতো। এজন্য বিগত অর্থবছর থেকেই আমরা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছি। যার সুফলও আমরা পেয়েছি। এজন্য গত বছরের মতো এবারও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি বলেন, গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো দুই অংকের ঘরে রয়েছে। বাজেটে চলতি অর্থবছর মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এটা মুদ্রানীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এবারও অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নিরুৎসাহিত করা হবে। তবে উৎপাদনশীল খাতে মুদ্রা ও ঋণনীতি অব্যাহত থাকবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাবের ফলে মিশ্র পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে আমাদের অর্থনীতি যদি কিছুটা ঝুঁকিতে পড়ে তা হলে আমি অবাক হব না। তিনি আরও বলেন, প্রাচ্যের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি মোটামুটি গতিশীল থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র মন্দা কাটিয়ে খুবই মন্থর উত্তরণ পর্বে প্রবেশ করেছে। ইউরোপের অনেক দেশেই সৃষ্টি হয়েছে তীব্র ঋণসংকট। ভারত ও চীনের মতো দুই বৃহৎ উত্থানমুখী অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও কিছুটা ভাটা পড়েছে। বহির্জগতের এই দুর্বল ও মিশ্র পরিণতি আমাদের পণ্য ও জনশক্তি রফতানির প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকিতে ফেলেছে। এতে জাতীয় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও প্রভাবিত হতে পারে।

ঘোষিত মুদ্রানীতির ব্যাপারে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেকটা গতানুগতিকই হয়েছে নতুন মুদ্রানীতি। মুদ্রানীতি আরেকটু বেসরকারি খাতবান্ধব হওয়া উচিত ছিল। তাহলে মানুষের কর্মসংস্থান বেড়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়তো। তিনি বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। বিনিয়োগ বাড়াতে বেশি পরিমাণ অর্থ ছাড়ের প্রয়োজন। ব্যাংকগুলোর চরম তারল্য সঙ্কট ও অর্থনীতির সামষ্টিক পরিস্থিতির বিচারে সংকুলানমূলক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। পরপর তিনবার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। উৎপাদন বাড়ায় কর্মসংস্থানের অভাবে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১৮ শতাংশ  প্রবৃদ্ধি করা ইতিবাচক। তিনি আরও বলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় ফান্ড অন্য খাতে চলে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠিনভাবে তা মনিটরিং করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় দেশের রফতানিতে ভাটা পড়েছে। তারল্য সংকটে বেসরকারি খাত ঋণ পাচ্ছে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ মিলছে না। এ অবস্থায় মুদ্রার সরবরাহ সংযত করলে বাজেটের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে না। তিনি বলেন, দলীয় বিবেচনায় ৯টি ব্যাংক দেয়ায় মূল্যস্ফীতি কমাতে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি কাজে আসবে না। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের আকার অস্বাভাবিক হাবে বাড়ানো হচ্ছে। অথচ সরকারের উচিত ছিল ব্যয় কমানো। আর অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিচ্ছে। সরকারের নীতি যেখানে সম্প্রসারিত সেখানে ব্যাংকের নীতি সংযত। এটা মূল্যস্ফীতি কমাবে না। তিনি বলেন, মুল্যস্ফীতি কমাতে হলে দেশের এক লাখ ৬৪ হাজার মাল্টি পারপাস কো-অপারেটিভ সোসইটি কোম্পানি, ৬০টির উপরে এলএলএম কোম্পানি এবং অসংখ্য ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে টাকা উঠোনোর ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মূল্যস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি সমান্তরালভাবে কার্যকর করতে হবে। তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে আর সরকার নীরব থাকছে। এর অর্থ হলো সরকারেরও দাম বাড়ানোর পক্ষে সমর্থন আছে। অতএব এমতাবস্থায় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি হালে পানি পাবে না।

এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দেশে তারল্য সংকটের ইংগিত দেয়। এ নীতির কারণে প্রাইভেট খাতে ঋণ প্রবাহ কমে গেছে। ভবিষ্যতে আরও যাবে। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন বিনিয়োগ না থাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। বাড়ছে বেকারত্বে চাপ। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ গ্যাসের অভাবে বর্তমানে সব সেক্টরেই নেগেটিভ গ্রোথ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কমেছে রফতানি। অথচ মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে বেসরকারী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।  বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১৮ শতাংশ করলেও খুব বেশি প্রভাব পড়বে না। প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে হবে। সংযত মুদ্রানীতির পরও দেশের মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নেই। এ মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের উন্নয়নে ভাটা পড়বে। ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে নতুন উদ্যোক্তারা।