|
|
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ৮ম সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দিয়েছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন। গতকাল সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী এডভোকেট আহসানুল হক হেনা আজ মঙ্গলবার তাকে জেরা করবেন। গতকাল প্রতিকী একটি প্রশ্ন করেন এডভোকেট হেনা। গতকাল ভিসি ড. সালেহ উদ্দিন তার দীর্ঘ জবানবন্দীতে উল্লেখ করেছেন যে, সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরীর গুডস হিলের বাড়িতে ধরে নিয়ে পাক আর্মিরা তাকে মশারীর স্ট্যান্ড দিয়ে বেদম প্রহার করে নির্যাতন চালায়। সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী ১৯৭১ সালের ঐ দিনে গুডস হিলে ছিলেন। তার বাম গালে থাপ্পড় মেরেছিলেন সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী। এই অভিযোগ করেন ভিসি। তার জবানবন্দী রেকর্ড করতে সহায়তা করেন সরকার পক্ষের কৌসুলি প্রসিকিউটর জিয়াদ আল মালুম। বিচারপতি নিজামুল হক, বিচারপতি আনোয়ারুল হক এবং এ কে এম জহির আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গতকাল জবানবন্দী দেন ভিসি সালেহ উদ্দিন। তার জবানবন্দীর উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্নরূপ:
আমার নাম সালেহ উদ্দিন। আমার পিতার নাম- মরহুম শামসুদ্দিন। আমার বর্তমান বয়স অনুমান ৬১ বছর। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ১৯ বছর। আমি আন্তর্জাতিক পিএইচডি করেছি। আমি বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করছি।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ক্লাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমি আবার চৌধুরী বাড়িতে চলে যাই। একাত্তরের ২৫ মার্চ পর্যন্ত আমি ঐ বাড়িতেই ছিলাম। পরেও ছিলাম। জুলাই মাসের শেষের দিকে সম্ভবত তৃতীয় সপ্তাহের কোন একদিন সকাল বেলা পার্শ্ববর্তী বুরিশচর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান যিনি কনডেনশন মুসলিম লীগ করতেন এবং ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেবের সমর্থক ছিলেন। ৩ জন লোকসহ চেয়ারম্যান শামসুল মিয়া ঐদিন আমার দরজায় এসে কড়া নাড়ায়। আমি আতঙ্কিত হয়ে দেখলাম তার ডানহাত পাঞ্জাবীর পকেটে এবং সেখানে একটি দেশী অস্ত্র ছিল। তিনি আমাকে তার সাথে বাইরে যেতে বললেন। আমি কাপড় পাল্টাতে চাইলে তিনি বললেন, দরকার নেই। সামান্য সময়ের জন্য এসো। আমার গায়ে ছিল সাদা হাফ শার্ট এবং পরণে ছিল লুঙ্গি। আমি হতবুদ্ধি অবস্থায় তার সাথে রওনা দেই। আনুমানিক ২/৩শ' গজ যাওয়ার পরে আমি লক্ষ্য করি যে একটি মিলিটারি জীপ গাড়ি দাঁড়িযে আছে। কাছাকাছি যেতেই ২ জন পাকিস্তানী সিপাই আমাকে দুই হাত ধরে জীপে তোলে। জীপে তুলেই আমার শরীর তল্লাশী করে। চেয়ারম্যান শামসু মিয়া জীপের সামনের সীটে ড্রাইভারের পাশে বসে। জীপ ছেড়ে দেয় এবং শামসু মিয়ার বাড়ির কাছাকাছি এসে তাকে নামিয়ে দেয়। তারপর সেটি নজু মিয়া হাটের নিকটে কাপ্তাই সড়কে ওঠে। সেখান
থেকে আরাকান রোড হয়ে সোজা গুডস হিলে ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাড়িতে নিয়ে যায়। ফজলুল কাদের চৌধুরীকে আমি একটি চেয়ারে সামনে একটি টি টেবিল এবং তার নিকটে তার জ্যেষ্ঠ সন্তান সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দেখতে পাই। চট্টগ্রামের ভাষায় ফজলুল কাদের চৌধুরী আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি সালেহ উদ্দিন কি না? আমি হ্যাঁ বললে তিনি বলেন, ওকে তক্তা দাও। আর্মির সিপাই দুইজন আমাকে ধরে তার বাসভবনের পাশে গ্যারেজের উপরে নিয়ে যায়। আমি ওখানে দাঁড়ানো অবস্থায় কয়েক মিনিটের মাথায় দুটো ছেলে সেখানে ঢোকে। তাদেরকে আগে থেকেই চিনি হামিদুল কবির ডাক নাম। খোকা, আরেকজন গ্যানা সেকান্দার। খোকা তখন বিখ্যাত ছিল আল সামস বাহিনীর প্রধান হিসেবে লোকে বলাবলি করতো। কোন কথা না বলে ঐ দু'জন আমাকে এলোপাথাড়ি ঘুষি মারতে থাকে। এক সময় তারা জিজ্ঞেস করে তোমার সাথে আর কারা আছে। তারা কোথায় থাকে এবং অস্ত্রগুলো কোথায়? কারো সাথে আমার সম্পৃক্ততা নেই, জানালে তারা আমাকে আরো মারধর করে। এক সময় আমার ঠোঁট এবং মুখমন্ডলের কোন কোন জায়গা ফেটে যায় এবং আমি মাটিতে পড়ে যাই। ঐ রুমের এক পাশে কতকগুলো মশারীর স্ট্যান্ড স্তূপ করা ছিল। এই অবস্থায় আর্মির একজন সিপাহি (যারা আমাকে ধরে আনে তাদের একজন) মশারীর স্ট্যান্ড নিয়ে আমাকে পিটাতে থাকে। একটি ভাংলে আরেকটা এরূপঅন্তত ৩টি স্ট্যান্ড ভেঙ্গে ফেলে। আমি তখন প্রায় অচেতনের মতো হয়ে যাই। এই অবস্থায় তারা বলতে থাকে নাম বলো, অস্ত্রের কথা বলো। তারপর তারা সবাই আমাকে ঐ অবস্থায় মাটিতে ফেলে রেখে নিচে চলে যায়। আমি অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে থাকি কতক্ষণ তা জানি না। তবে আধা ঘণ্টা বা তারও বেশি হতে পারে। তখন সিপাহি ২ জন আমাকে টেনে হেচড়ে কাঠের সিড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে নিয়ে যায়। আমি দাড়াতে পারছিলাম না। আমি দেখতে পাই। সেখানে সিঁড়ির গোড়ায় সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, কি মেরেছিস? চোখে তো কোন পানি আসে নাই। তখন তিনি এগিয়ে এসে আমার বাম গালে সজোরে থাপ্পড় মারেন এবং বলেন, নিয়ে যাও। তখন ২ জন লোক ঠেলে আমাকে নিচ তলার গ্যারেজে নিয়ে যায় এবং হোচ পাইপ দিয়ে অনবরত পিটাতে থাকে। আমার তখন মনে হয়েছিল যে আমি আর বাঁচবো না। থেকে থেকে আমার মনে হতো যে আমি নেই। ঐ জায়গায় আমি অনেকক্ষণ অচেতন অবস্থায় পড়েছিলাম। তবে কতক্ষণ তা বলতে পারবো না। এর মধ্যেই তারা আবার আমাকে সিঁড়ি দিয়ে উপর তলায় নিয়ে যায় যে রুমে মারপিট করে। কিছুক্ষণ পরে একটি ছেলে আসে যে আমার পূর্ব পরিচিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র আমার এক বছরের সিনিয়র ছিল তার নাম নূরুল ইসলাম। সে এনএসএফ করতো। আমি শুনেছি পরবর্তীতে সে পাহাড়তলী কলেজে অধ্যাপনা করেছে। নূরুল ইসলাম আমাকে দেখে বলে আমি কোন কিছু স্বীকার করেছি কি না। আমি তাকে বললাম, আমি কিছুর সাথেই জড়িত নই। স্বীকার করবো কি। তখন সে বললো আমি দেখছি। কেউ যদি আসে এবং জিজ্ঞেস করে তবে কিছুই স্বীকার করবে না। কিছুক্ষণ পর সে আবার ফিরে আসে। আমাকে জিজ্ঞেস করে মুসলিম লীগ পন্থী ইউপি সদস্যসহ বিশিষ্ট কেউ কেউ আমার পক্ষে বলবে। আমি তখন কিছুটা আশান্বিত হই। কারণ আমি ঐ গ্রামে ভীষণ জনপ্রিয় ছিলাম। আমি ঐ গ্রামের ২ জনের নাম বললাম। একজন ফাইজা মিয়া অন্যজন বাদশা মিয়া। দুই জনই আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন যদিও তারা মুসলিম লীগ করতেন। ঐ সময়ে তাদের হাতে কোন মুক্তিযোদ্ধা বা স্বাধীনতাকামী মানুষ নির্যাতিত হয়নি। আমি আমার যে স্কুলে পড়েছি তার সকল শিক্ষককেই সাক্ষী মেনেছি। এমন কি ঐ গ্রামের যেকোন লোককে জিজ্ঞেস করতে বলেছি। এমনকি বলেছিলাম, একজনও যদি বলে যে আমি কারোর সাথে সংশ্লিষ্ট আছি বললেও তারপর আমাকে মেরে ফেললে আমার কোন আপত্তি থাকবে না। নূরুল ইসলাম তখন সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে কথা বলার আশ্বাস দিয়ে চলে যায়। শেষ বিকেলের দিকে ঐ ২ জন সদস্য অর্থাৎ ফাইজ্যা মিয়া, সওদাগর সাহেব এবং আমি যে ছেলেকে পড়াতাম সেই ছেলে অর্থাৎ হারুনুর রশিদ চৌধুরী এই ৩ জনে ওখানে হাজির হয়। তাদের সাথে ওদের কি কথা হয় তা জানি না। তারা যাওয়ার সময় আমার সাথে দেখা করে বলে যান যে তারা সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে বলেছেন এবং তাকে জানিয়েছেন যে সালেহ উদ্দিন একজন ভাল ছাত্র এবং ভাল ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে ঐ এলাকায় আছি এবং আমার সম্পর্কে তাদের খারাপ কিছু জানা নেই। কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যার দিকে আমাকে নিচে নামানো হয়। সেখানে ৭/৮ জন ছিল সালাহ উদ্দিন সাহেব আমাকে বললেন, তোমার সম্পর্কে আমরা আরো তথ্য সংগ্রহ করবো। এখন তোমাকে ফেরত পাঠাবো এবং যেখানে ছিলে সেখানেই থাকবে। অন্য কোথায়ও যাবে না। যে গাড়িতে তুলে আনা হয়েছিল ঐ গাড়িতে করেই আবার ফেরত পাঠানো হয়। আমার গায়ের শার্টটি রক্তাক্ত থাকায় সেটা খুলে আরেকটি শার্ট পরিয়ে দেয়া হয়েছিল যা আমার গায়ে ফিট হতো না। সাইজে আমার চেয়ে বড় ছিল। সন্ধ্যার পরপর মোহনায় পৌঁছলে আমাকে দেখতে অনেক লোক আসে। তাদেরকে আমার সব কথা বলেছি এবং তারা আমার শরীরের রক্তাক্ত জখম দেখেছে। এরপর খানিকটা সুস্থ হওয়া পর্যন্ত আমি কয়েকদিন ঐ বাড়িতেই ছিলাম এবং পরে আমি অন্যত্র পালিয়ে যাই। আমি যখন দ্বিতীয় বার দোতলায় ছিলাম তখন একজন ড্রাইভার ও একটি ছেলেকে দেখতে পাই। আমার মনে হয়েছে যে তার উপরও অত্যাচার করা হয়েছে। (আসামীপক্ষের আপত্তিসহ)। তাকে যখন নিচে নিয়ে যায় তখন ফজলুল কাদের চৌধুরীর এক ড্রাইভার যে উপরে ছিল সে বলেছে যে হয়তো তাকে মেরে ফেলার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঐ ছেলে আমি ওখানে থাকা অবস্থায় আর ফেরত আসেনি। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। আসামী সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে আমি চিনি। তিনি ডকে উপস্থিত আছেন।
প্রশ্ন : ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম সিটি কলেজ সরকারি ছিল না।
উত্তর : জি।

