|
|
এইচ এম আকতার : খোলা বাজারে মসুর ডাল প্রতিকেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা। সরকার সেই ডাল বিক্রি করছে ১০৫ টাকা। খেজুরের আমদানি খরচ ৬৭ টাকা আর সরকার বিক্রি করছে ৮০ টাকায়। রমযানের আগে শিল্প মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণাধীন চিনি ও খাদ্য করপোরেশন বাজার থেকে ১০ টাকা বেশি দামে চিনির মূল্য নির্ধারণ করার পর ৫২ টাকার চিনি এখন ৬০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
বাসাবো বাজারের সামনে ট্রাকে টিসিবির পণ্য কিনতে আসা নাহিদ মোস্তাফিজ জানান, ট্রাকের যেসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে এগুলোর মধ্যে ছোলা, ভোজ্যতেল ছাড়া বাকি সব পণ্য বাজারের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রকাশিত ও প্রচারিত পণ্যের আমদানি খরচের চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করছে টিসিবি। তিনি বলেন, এখন সরকারই পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম কমছে। রমযানের আগে বাংলাদেশেও চিনির দাম ছিল সহনীয় পর্যায়ে। ২০ দিন আগেও খোলা বাজারে প্রতিকেজি চিনি বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫২ টাকায়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হলো ৬০ টাকার বেশি দরে চিনি বিক্রি করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
শিল্প মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প করপোরেশন থেকে ৪ জুলাই ঘোষণা দেয়া হল পাইকারী বাজারে চিনির দাম ৫৫ টাকা আর খুচরা পর্যায়ে থাকবে ৬০ টাকা। অথচ সেই সময় বাজারে চিনি বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৫২ টাকায়। এ সুযোগে পরের দিন থেকে ব্যবসায়ীরা চিনির দাম প্রতিকেজিতে ৮ থেকে ১০ টাকা বাড়িয়ে দেয়। সমালোচনার মুখে তারপর শিল্প মন্ত্রণালয় ১৮ জুলাই থেকে প্রতিকেজি চিনি ৫ টাকা কমিয়ে ৫৫ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়।
রমযানের শুরুতে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির হয়ে যাওয়ায় গত রোববার বৈঠকে বসে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব গোলাম হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, টিসিবি, ট্যারিফ কমিশন ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সবকিছুর পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় উদ্বিগ্ন সরকার। তাই জরুরি ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। বৈঠকে কি আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি বাজার গোয়েন্দা বিভাগের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
ট্যারিফ কমিশনের সর্বশেষ জুনের পণ্য আমদানির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত একমাসে রমযানকে সামনে রেখে যেসব পণ্য আমদানি হয়েছে সেগুলোর আমদানি খরচের কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবি এবং ব্যবসায়ীরা। এ সময় আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ আমদানি খরচ ছিল জিরার ২৪২ টাকা কেজি। আর সর্বনিম্ন আমদানি খরচ ছিল পিঁয়াজের ১৪.২৬ টাকা। আমদানি খরচের কয়েকগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে খেজুর, ছোলা, ডাল।
কমিশনের তথ্যানুযায়ী, সরকারি এবং বেসরকারিভাবে গত জুন মাসে পিঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে ৩১ হাজার ৬৭৭ টন। প্রতি মেট্রিক টনের খরচ পড়েছে ১১ হাজা ২ টাকা। এরমধ্যে আমদানি শুল্ক, ট্রান্সপোর্ট খরচ, আমদানিকারকের ১ শতাংশ লাভ, খুচরা বিক্রেতাদের ১ শতাংশ এবং বিক্রেতাদের প্রতি টনে ১০ শতাংশ লাভ হিসাব করে প্রতি কেজি পিঁয়াজের আমদানি খরচ পড়ে ১৪.২৬ টাকা। কিন্তু গতকাল সোমবার বাজারে প্রতি কেজি পিঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা।
রমযান উপলক্ষ্যে মসুর ডালের দাম ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ডাল মূল্য নিয়ন্ত্রণে ডাম আমদানি করছে। ট্রাকে সেই ডাল বিক্রিও করা হচ্ছে। ট্যারিফ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী সব পর্যায়ের মুনাফা যুক্ত হওয়ার পর প্রতি কেজি মসুর ডাল (নেপালী) আমদানি খরচ ৬৯.৮৯ টাকা। কিন্তু বাজারে এই ডাল বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকায়। সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবি নতুন আমদানি ও গুণগত মান ভাল দেখিয়ে প্রতি কেজি মসুর ডাল বিক্রি করছে ১০৫ টাকা। বাজারে বর্তমানে দেশে উৎপাদিত দেশী ডালের কেজি ১১০ থেকে ১১৫ টাকা। কোথাও কোথাও এই ডাল ১২০ টাকা। ট্যারিফ কমিশনের মনিটরিং বিভাগের তথ্য কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, টিসিবি যদি নেপালী মসুর ডালের কেজি ১০৫ টাকায় বিক্রি করে তবে তাদের ডাল কিনতে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
খেজুরের ক্ষেত্রেও বিক্রেতারা প্রতি কেজিতে মান বেধে দুইশ' থেকে আড়াইশ' টাকা লাভ করছে। আমদানি খরচের সঙ্গে আনুষাঙ্গিক খরচ যোগ করে প্রতি কেজি খেজুরের আমদানি খরচ ৬৫.৪২ টাকা। কিন্তু বাজারে এখন সবচেয়ে নিম্নমানের খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা। আর ভালো মানের খেজুরের কেজি পাঁচশ' টাকা। অপরদিকে এবার রমযানে সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবিও ট্রাকে খেজুর বিক্রি করছে। প্রতি কেজি দাম রাখা হচ্ছে ৮০ টাকা। টিসিবির বাজার বিভাগের মজিবুর রহমান জানান, ট্যারিফ কমিশন যে হিসাবই দেখান না কেন, টিসিবি আমদানি খরচের চেয়ে পাঁচ থেকে দশ টাকা লোকসানে ভোক্তাদের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করছে।
এছাড়া সময়ে আমদানিকৃত পণ্যগুলোর মধ্যে শুকনা মরিচের আমদানি খরচ পড়েছে ১২৪ টাকা। বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে দুশ' টাকা কেজি। রসুনের আমদানি খরচ ৬৭ টাকা। বাজারে আমদানিকৃত রসুন বিক্রি হচ্ছে একশ টাকায়। আদার আমদানি খরচ ৪১ টাকা। বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকা কেজি। আর জিরার আমদানি খরচ ২৪২ টাকা, বিক্রি হচ্ছে তিনশ' থেকে সাড়ে তিনশ' টাকা।

