|
|
পথে পথে দলীয় ক্যাডারদের চাঁদাবাজি \ অসহায় ব্যবসায়ীরা
মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : ট্রাক ভর্তি পণ্য ঢাকায় আনতে পথে পথে চলছে চাঁদাবাজি। চাঁদার টাকা পরিশোধ না করলে ঢুকতে দেয়া হয় না সবজি বোঝাই ট্রাক কিংবা কোন বাহন। কোন জেলা শহর থেকে রাজধানীতে পণ্যের গাড়ি আনতে ১৮ থেকে ২০ জায়গায় পরিশোধ করতে হয় চাঁদার টাকা। এর ফলে রাজধানীতে এনে যে কোন পণ্যের দাম মূল জায়গার তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বৃদ্ধি করে বিক্রি করতে হয়। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ পথে পথে চাঁদা দেয়ার কারণেই পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারি দলের বিভিন্ন নেতার নামে তোলা হচ্ছে এসব চাঁদা। পথের চাঁদাবাজি বন্ধ হলে কমে আসবে নিত্যপণ্যের দাম। কিন্তু এসব চাঁদাবাজি ঠেকাতে সরকারের কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও সরকার এ ব্যাপারে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে সরকারের মৌনসমর্থন থাকায় সরকার এর বিরুদ্ধে কার্যত কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর নাটের গুরু হলো সরকার। উদ্দেশ্য আগামী নির্বাচনের ব্যয় সামলানো।
এ বারের রমযানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না বলে ঘোষণা দেয় সরকার। সরকারের এ ঘোষণার পর থেকে রমযানের আগে দফায় দফায় বৃদ্ধি পেতে থাকে দ্রব্যমূল্য যা এখনো অব্যাহত আছে। দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়া যখন লাগামহীনভাবে ছুটছে তখন সরকার ভুলে গেলো তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতির কথা। লাগাম টেনে ধরতে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বৃদ্ধি করলেও সরকারকে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। ব্যবসায়ীরা মিটিংয়ে সরকারকে দাম বৃদ্ধি করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও সেখান থেকে এসেই দাম বাড়ানো শুরু করলেন। জনগণের সাথে এ এক ডিজিটাল প্রতারণা। কথা এক কাজ তার উল্টা। এ যেন ব্যবসায়ীদের কাছে সরকারের এক অসহায় আত্মসমর্পণ। দাম বাড়ানোর কাজটি এখন শুধু ব্যবসায়ীরা করছেন এমনটি নয়, বরং সরকার নিজে পণ্যের দাম বৃদ্ধি করে ব্যবসায়ীদের উৎসাহ যোগাচ্ছে। রোজার আগে সরকার নিজেই বাড়িয়ে দেয় চিনির দাম। এছাড়া টিসিবি তালিকাতেও বাড়ানো হয়েছে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য। বাজারে যখন প্রতি কেজি চিনি ৫২ থেকে ৫৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল তখন শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) চিনি বিক্রি শুরু করে প্রতি কেজি ৬০ টাকা। এ কারণে পাইকারি বাজারে চিনির দাম বাড়ে কেজিতে ২ টাকা। বেশি দামে চিনি বিক্রির ব্যাপারে বিএসএফআইসি জানান আমাদের চিনির উৎপাদন ব্যয় কেজিতে ৮০ টাকা। এই চিনি ৬০ টাকাও যদি বিক্রি না করি তাহলে অনেক লোকসান হবে। তাদের এ যুক্তি হালে পানি পায়নি। জনরোষের মুখে চিনির দাম কমাতে বাধ্য হয় সরকার। গত ১৮ জুলাই শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া এক জরুরি সাংবাদিক সম্মেলনে চিনির দাম পুন:নির্ধারণের কথা জানিয়ে বলেন, রমযান উপলক্ষে চিনির মূল্য পুন:নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআই)। নতুন মূল্য অনুযায়ী প্রতি কেজি চিনির পাইকারি মূল্য ৫০ টাকা ও খুচরা মূল্য ৫৫ টাকা পুন:নির্ধারণ করা হয়েছে।
টিসিবি রাজধানীর ২৫টি স্থানে খোলা ট্রাকে করে সয়াবিন তেল, চিনি, ছোলা ও মসুর ডাল বিক্রি করছে। টিসিবির এ চার পণ্যের মধ্যে কেবল চিনিই বাজারে কম দামে বিক্রি করা হয়। টিসিবি তার ডিলারদের চিনি দিচ্ছে ৫০ টাকা কেজি দরে। অন্য পণ্যগুলো বাজারের ন্যায় চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে। এর ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবি কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না। গত রমযানে ছোলার দাম কয়েক দফা বৃদ্ধি করে ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। এ বছর দাম বাড়ানোর সব নিয়ম বদলে গেছে। রমযান না আসতেই ৬০ টাকার ছোলা একবাবে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৭৫ টাকায় বিক্রি হতে থাকে। আরও এক দফা কেজিতে ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৮৫ টাকা হয়। টিসিবির তথ্যে এখনো ৮০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু বাজারে তার উল্টো চিত্র। খুচরা বাজারে ১০০ টাকা কেজি দরে ছোলা বিক্রি হচ্ছে। রমযানের ইফতারির আরেক প্রয়োজনীয় পণ্য পিঁয়াজের দাম কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বশেষ গত চার দিন আগেও প্রতিকেজি পিঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২৮ থেকে ৩০ টাকায়। বর্তমানে তা কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। নিত্যপণ্যের দাম প্রতিদিন বাড়লেও সরকারের কার্যত কোনো তদারকি নেই। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজার অভিযান আর ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠক এই দুই কৌশলই জানা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। বাজার তদারকির জন্য ১৪টি টিম করেই মন্ত্রণালয় মনে করছে দাম নিয়ন্ত্রণ হয়ে যাবে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থাই কার্যকর হচ্ছে না।
রোজার আগেই নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কথা স্বীকার করে বাণিজ্যমন্ত্রী জি এম কাদের বলেন, রোজা আসলে চাহিদা বেড়ে যায় এ জন্য পণ্যের দামও কিছুটা বেড়ে যায়। কিন্তু রোজা আসার আগেই কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। এটা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে আমরা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ট্যারিফ কমিশনের হিসাবের চেয়ে বেশি দামে পিঁয়াজ-রসুন বিক্রি হচ্ছে। বাজার তদারকির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়া শুরু হলেও এখনই তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা ছাড়া বাজার তদারকি সম্ভব নয়। তিনি ব্যবসায়ীদের পক্ষ নিয়ে বলেন, শুধু ক্রেতাদের কথা চিন্তা করলেই হবে না। বিক্রেতার কথাও ভাবতে হবে। তা না হলে ব্যবসায়ীরা সব লোকসান দিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যাবেন। তিনি বলেন, টিসিবির মাধ্যমে কম দামে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে বাজারে হস্তক্ষেপ করা যায়। তবে টিসিবিকে শক্তিশালী করা না গেলে এটি রাখার কোনো মানে নেই। নিত্যপণ্যের দাম সব সময় সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা সম্ভব নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি এক ব্যবসায়ীর কাছে পণ্যের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি জবাব দেন সরকার ইতোমধ্যে আগামী নির্বাচন উপলক্ষে অর্থ সংগ্রহে নেমেছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকার বাইরে থেকে আসা পণ্যবাহী পরিবহনগুলো থেকেও সরকারী দলের বিভিন্ন নেতার নামে চাঁদা উঠানো হচ্ছে। তিনি বলেন, এ চাঁদার টাকা উঠানো হচ্ছে বলেই সরকারও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ফলে পথে পথে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে অবাধে চাঁদাবাজি করছে দলীয় ক্যাডাররা। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে সরকারের মৌন সমর্থন থাকায় সরকার এর বিরুদ্ধে কার্যত কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এমতাবস্থায় বলা যায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর নাটের গুরু হলো সরকার।
পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, টাকার মান হ্রাস পাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহনে চাঁদাবাজি, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিসহ সব ব্যবস্থাপনা ও অব্যবস্থাপনার চাপ পণ্যের দামের ওপর গিয়ে পড়ে। তিনি বলেন, দেশে তিন কোটি ব্যবসায়ী রয়েছেন। বাজারে সরকারের তদারকি আরও জোরদার করতে হবে।
রাজধানীর কাওরান বাজারে ট্রাকে করে নিয়মিত বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসেন ব্যবসায়ী হারুন-অর-রশিদ। কথা হয় তার সাথে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই ট্রাকে করে মাল আনছি রাজশাহী থেকে। রাস্তায় কম করে হলে ১৮ থেকে ২০ টি পয়েন্টে চাঁদা দিতে হয়েছে। কোন কোন পয়েন্ট এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান তিনি। তিনি বলেন, চাঁদার টাকা পরিশোধ না করলে ট্রাক ঢুকতে বাধা দেয় তারা। কোন উপায় না দেখে তাদের দাবি অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করে দিয়েছি। এভাবে মোটা অংকের চাঁদার টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে এখানে এসে যে দামে কিনেছি তার কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি না করলে পুঁজি হারাতে হবে। পথে পথে চাঁদাবাজি বন্ধ হলে পণ্যের দামও কমে আসবে। এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগই মুখ্য বলে মনে করেন তিনি। তার এ মতের সাথে একত্মতা প্রকাশ করেন অনেক ব্যবসায়ী।

