|
|
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে প্রতিবাদী আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা
গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় মিলনায়তনে তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয় -সংগ্রাম
স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকায় এক প্রতিবাদী আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাপেক্সের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কূপ ইজারা দিয়ে বিদেশী কোম্পানির কাছ থেকে উচ্চ মূল্যে গ্যাস কিনছে সরকার। বেসরকারিকরণের নামে বিদ্যুৎখাত বিদেশী পুঁজির হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। শেখ হাসিনার সরকার বিদেশী প্রভু বিশেষ করে ভারতকে খুশি করার জন্য যা ইচ্ছে তাই করছে। তারা আরো বলেন, রেন্টাল বিদ্যুৎ দেশ ধ্বংসের একটি প্রকল্প। বিবিয়ানার গ্যাস অবৈধ পাইপে পাচারের রিপোর্ট করতে গিয়ে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি খুন হয়েছে- আমরা সরকার ও শেভরনের কাছে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই। তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর মতো উপদেষ্টারা দেশকে বিক্রি করে তা থেকে বখরা নেয়ায় তৎপর হয়েছে। দেশী-বিদেশী লুটেরা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাকারী এসব নব্য রাজাকারদের প্রতিহত করা হবে। বিইআরসিকে একটি ‘রাবার স্ট্যাম্প কমিশন' বলেও বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেন।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে পুরানা পল্টনের মৈত্রী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘দেশী-বিদেশী লুটেরা গোষ্ঠীর স্বার্থে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা চলবে না' শীর্ষক এক প্রতিবাদী আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদগণ এসব কথা বলেন। বাম রাজনৈতিক দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি এ আলোচনার আয়োজন করে। কমিটির আহবায়ক প্রকৌশলী শেখ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কমিটির সদস্য সচিব ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ, পাওয়ার সেলের সাবেক পরিচালক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহ, বাংলাদেশ পানি সম্পদ সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক, সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স প্রমুখ। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা।
প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, শেখ হাসিনার সরকার গলাবাজি করে দেশের ক্ষতি করছে। তাদের রুখে দিতে হবে। জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী যেন জ্বালানি খাত ধ্বংসের ইজারা নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা জনমত ও জনস্বার্থের তোয়াক্কা না করে অসীম ক্ষমতা প্রদর্শন করে চলেছেন। তারা ভারতের স্বার্থ দেখছেন। হাসিনাও ভারতকে খুশি করার জন্য যা ইচ্ছে তাই করছেন। তিনি বিদ্যুতের দাম আরেক দফা বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সরকারের লুটপাটের দায় জনগণ নেবে কেন। কুইক রেন্টাল প্লান্ট সর্বনাশা সিদ্ধান্ত। বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিএমআরই করলেই বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান করা যেতো বলে তিনি মনে করেন। সুন্দরবনের ধার ঘেষে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবন ধ্বংসের সাথে সাথে অর্থনৈতিকভাবেও বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মন্তব্য করেন প্রকৌশলী শহীদুল্লাহ।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ অনুযোগের স্বরে বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) ব্যবহার করে সরকার খুশিমতো বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। সরকারের ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণে আজ বিদ্যুৎখাতে দুরবস্থা। রেন্টাল প্লান্ট গোদের ওপর বিষ ফোঁড়ায় পর্যবসিত হয়েছে। বিইআরসি গণশুনানির নামে প্রহসন করে বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। বিইআরসি ও পিডিবির মতো প্রতিষ্ঠানের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, সরকার একটি অঘোষিত পথ নকশা অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ায় তেল-গ্যাস খাতকে বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এই পথনকশা বাস্তবায়ন করতেই দাম বাড়ানো হচ্ছে। অথচ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে সহজেই বিদ্যুৎখাতের সমাধান করা সম্ভব। তেল-গ্যাস কমিটির সদস্য সচিব আরো বলেন, বিবিয়ানার গ্যাস অবৈধ পাইপে পাচারের রিপোর্ট করতে গিয়ে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি খুন হয়েছে। আমরা সরকার ও শেভরনের কাছে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চাই। ফুলবাড়ি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নেরও দাবি জানান তিনি।
প্রকৌশলী বিডি রহমত উল্লাহ সরকারের ভ্রান্তনীতির সমালোচনা করে বলেন, রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট দেশ ধ্বংসের একটি প্রকল্প। অর্থনীতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকার প্রয়াস। বিদেশী প্রভুদের খুশি করতে সরকার তা করেছে। দেশী-বিদেশী লুটেরা গোষ্ঠীর স্বার্থ যারা দেখছে তারা নব্য রাজাকার। তাদের প্রতিহত করতে হবে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে গোটা অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি বলেন, রেন্টালের নামে সাড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকা সরকার ভর্তুকি দিয়েছে। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, দেশকে বিক্রি করে তা থেকে বখরা নেয়ার জন্য সরকারের দালালরা উঠে পড়ে লেগেছে। সরকারের উচ্চ মহলই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে জিইয়ে রাখছে। বিইআরসি একটি রাবার স্ট্যাম্প কমিশন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রকৌশলী ম ইনামুল হক বলেন, সরকার রেন্টাল পাওয়ার চুক্তি করে দেশবাসীকে বিপদে ফেলেছে। রেন্টাল প্লান্টগুলোকে সস্তায় জ্বালানি তেল দেয়ায় পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের লোকসান ৭ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে সরকার অধিক দাম দিয়ে বিদ্যুৎও কিনছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী ‘রাজপুটিন' হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। তাকে প্রতিহত করতে হবে।
সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সরকার জনগণের পকেট কাটার জন্য বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়ানোর তৎপরতা চালাচ্ছে। বিইআরসির গণশুনানির নামে নাটক চলবে না। জনগণের অর্থে গণমাধ্যমে দেয়া বিদ্যুতের উৎপাদন সংক্রান্ত পিডিবির মিথ্যা বিজ্ঞাপন দেয়ার কথাও জানান তিনি।
মূল প্রবন্ধে প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা বলেন, সরকারি খাতে অর্থের অভাবের কথা বলে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ খাত তুলে দেয়া হলেও বেসরকারি খাতের অর্থও সরকারকে যোগাড় করে দিতে হচ্ছে। সার্বভৌম গ্যারান্টি দিতে হচ্ছে। চুক্তির এক বছর পরও যদি সরকারকেই অর্থের সংস্থান করতে হয় তাহলে সামিট, ওরিয়ন ইত্যাদি গ্রুপের হাতে বিদ্যুৎখাত তুলে দেয়ার যুক্তি কি? অর্থটা পিডিবিকে যোগাড় করে দিলেই তো হয়। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মেরামত, সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি, গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি, নতুন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি স্বল্প খরচের উদ্যোগগুলো না নিয়ে কুইক রেন্টালসহ বেসরকারি খাত থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার দিকে ঝোঁকার ফলেই বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে বাড়তি ভর্তুকির চাপ তৈরি করেছে। এর দায় এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর মাধ্যমে জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার তৎপরতা চলছে।

