|
|
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্ত্রাসের রাজত্ব
রাজশাহী : স্বপ্ন ও সম্ভাবনা আর কখনো হাতছানি দেবে না। ছবির এই মুখগুলো এখন শুধুই ছবি। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের শিকার হয়ে এরা হারিয়ে গেছে চিরতরে। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন; উপরে : রাজিব (ঢামেক), আবু বকর (ঢাবি), জুবায়ের (জাবি), কায়সার (চট্রগ্রাম), বিপ্লব (দিনাজপুর), মাসুদ ও মুজাহিদ (চবি)। শরীফুজ্জামান নোমানী (রাবি), নাসিম (রাবি), রেজোয়ান চৌধুরী (রাজশাহী), সজিব (রুয়েট), সোহেল (রাবি), তৌফিক (যশোর) ও সোহেল (কুমিল্লা)। নিচে: পলাশ (সিলেট), রিপণ (যশোর), মৃণাল (দিনাজপুর), অপু (নড়াইল), আবিদ (চবি), শাহাদত (পটুয়াখালি) ও সানি (ঢাকা)-ফাইল ফটো
সরদার আবদুর রহমান : স্বপ্ন ও সম্ভাবনা আর কখনো হাতছানি দেবেনা। পিতা-মাতা কিংবা পরিবারের জন্য কোন ভবিষ্যত রচনা করবেনা ওরা। সেই মুখগুলো এখন শুধুই ছবি। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের শিকার হয়ে এরা হারিয়ে গেছে চিরতরে। তারুণ্যে ভরপুর ঢাকা মেডিকেলের রাজিব, ঢাবি'র আবু বকর, জাবি'র জুবায়ের, চট্রগ্রামের কায়সার, দিনাজপুরের বিপ্লব ও মৃণাল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মাসুদ, মুজাহিদ ও আবিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীফুজ্জামান নোমানী, নাসিম ও সোহেল, রুয়েটের সজিব, রাজশাহী পলিটেকনিকের রেজোয়ান চৌধুরী, যশোরের তৌফিক ও রিপণ, কুমিল্লার সোহেল, সিলেটের পলাশ, নড়াইলের অপু, পটুয়াখালির শাহাদত, ঢাকার সানি প্রমুখরা অকালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে।
ক্ষমতার সাড়ে তিন বছরে ছাত্রলীগের হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে এমন বহু সংখ্যক ছাত্র। এসময় সারা দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেন তাদের সন্ত্রাসের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, শুধু প্রতিপক্ষ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত হয় না ছাত্রলীগ, নিজেদের সংগঠনের নেতা-কর্মীদের পর্যন্ত হত্যা করে রেকর্ড গড়ে চলেছে তারা। গত সাড়ে তিন বছরে আওয়ামী লীগের এই ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নিজেদের ও প্রতিপক্ষ সংগঠনের মধ্যে ছোট-বড় ঘটনা মিলিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে কমপক্ষে চারশ' বার। এসব সংঘর্ষের ফলে প্রাণ হারিয়েছে নিজ সংগঠনের নেতাকর্মীসহ অন্তত ৩৩ জন। খুনের শিকার হয়েছে শিবিরের ৪ জন, ছাত্রদলের এক জন, ছাত্রমৈত্রীর এক জন ও অরাজনৈতিক তিন জন ছাত্র।
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ ছাত্রলীগ তাদের হত্যাকান্ডের এই পর্বের সূচনা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক শরিফুজ্জামান নোমানীকে সুপরিকল্পিতভাবে তারা হত্যা করে। আর দ্বিতীয় হত্যাকান্ডটি ঘটায় ৩১ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজে। এখানে নিজেদের মধ্যে সংঘাত করতে গিয়ে কলেজের ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ ওরফে রাজীবকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে সর্বাধিক আলোচিত ছিলো রাজশাহী মহানগরীর প্রতিষ্ঠানগুলো। কেবল ছাত্রলীগের কারণেই এখানে চলতি জুলাই মাস পর্যন্ত মোট ৭ জন নিহত হয়। এরা হলো, রাবির শরীফুজ্জামান নোমানী, ফারুক হোসেন, নসরুল্লাহ নাসিম ও সোহেল রানা, রাজশাহী পলিটেকনিকের রেজওয়ানুল ইসলাম চৌধুরী সানি, রুয়েটের আবদুল আজিজ খান সজিব ও যশোর থেকে কাজের উদ্দেশ্যে রাজশাহী আসা ব্যবসায়ী তৌফিকুল ইসলাম। হত্যার দ্বিতীয় তালিকায় রয়েছে চট্টগ্রাম। এখানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসে হত্যার শিকারে পরিণত হয় ৬ জন। এরা হলো, চবির মুজাহিদুল ইসলাম, মাসুদ বিন হাবিব, আসাদুজ্জামান আসাদ, মহিউদ্দিন মাসুম, হারুন অর রশীদ কায়সার ও চমেকের আবিদুর রহমান আবিদ। অন্যান্য খুনের ঘটনাগুলোর মধ্যে ঢামেকে আবুল কালাম আজাদ রাজীব, ঢাবির আবু বকর, জাবির জুবায়ের আহমেদ, সিলেটের উদয় সিংহ পলাশ, যশোরের রিপন হোসেন দাদা, পটুয়াখালির শাহাদত হোসেন, নড়াইলের আমিরুল ইসলাম অপু, দিনাজপুর হাজি দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহফুজ বিপ্লব ও মৃণাল, কুমিল্লা পলিটেকনিকের সোহেল আহমদ, গাজিপুরের সাজিদুর মোনায়েম রানা, ঢাকা পলিটেকনিকের রাইসুল ইসলাম রাহিদ, পাবনা টেক্সাইল কলেজের মোস্তফা কামাল শান্ত, ঢাকার শ্যামপুরের কিশোর সানি।
হত্যাকান্ড ছাড়াও দেশের প্রায় প্রতিটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের ফলে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সর্বশেষ, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজের সুপ্রাচীন হোস্টেল আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে তারা। অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিপক্ষের কক্ষে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ছিলো নিত্য বিষয়। মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর বেসামাল হয়ে প্রায় প্রতিটি অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে তারা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র দায়িত্বশীল ভূমিকায় নিয়োজিত হওয়া দূরের কথা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শান্তি-শৃক্মখলাটুকুও বজায় রাখতে পারেনি। ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের সঙ্গে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হত্যা, ধর্ষণ, সংঘর্ষ, হামলাসহ নানা অপরাধে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দলীয় ও অঞ্চলভিত্তিক গ্রুপের কোন্দল, কমিটিতে প্রত্যাশিত পদ দখল করা কিংবা কোন পদ না পাওয়া, ত্রিভূজ প্রেমের বিরোধ, ধর্ষণ, ছাত্রীর গোপন ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা, কোন অনুষ্ঠানে খাবারের টোকেন নিয়ে বিরোধ, নেতাকে সালাম না দেয়া, নেতার সামনে সিগারেট খাওয়াসহ তুচ্ছাতি তুচ্ছ ঘটনা। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের পাশাপাশি প্রতিপক্ষ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে ছাত্রলীগ।

