|
|
তদন্ত কর্মকর্তার জেরার সময় দীর্ঘ বিতর্ক
স্টাফ রিপোর্টার : বিশ্ববরেণ্য মোফাসসিরে কুরআন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ২৬৮টি প্রদর্শনী (এক্সিবিট) করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। এর মধ্যে ২০১ টিতেই মাওলানা সাঈদীর নাম পর্যন্ত নেই। তার মামলার সাথে এসব প্রদর্শনীর কোন সম্পৃক্ততা বা সংশ্লিষ্টতা নেই। এই প্রদর্শনী সংখ্যাগুলো হলো প্রদর্শনী ৩৪-৪৮, ৫৪-৫৯, ৬২-৮৪, ৮৬-১২৭, ১২৯-১৫৩, ১৫৮-১৬৫ এবং ১৬৭-২৫১। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনিত ১৯৭১ সালের কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাথে এসব প্রদর্শনীর কোন সম্পর্ক না থাকলেও শুধুমাত্র অভিযোগের পাল্লা ভারি ও মামলার কাগজপত্রের ভলিউম বৃদ্ধির জন্য এসব প্রদর্শনী করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী এডভোকেট মিজানুল ইসলাম। এই প্রশ্ন করা নিয়ে গতকাল রোববার বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, বিচারপতি আনোয়ারুল হক ও এ কে এম জহির আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ দীর্ঘ ৩৫ মিনিট বিতর্ক হয়। ট্রাইব্যুনাল বনাম এডভোকেট মিজানুল ইসলামের এই বিতর্কে ট্রাইব্যুনালের পক্ষ নেন সরকার পক্ষে প্রসিকিউটর হায়দার আলী। এতগুলো প্রদর্শনীর সাথে মাওলানা সাঈদীর নাম নেই একথা একটি একটি করে তদন্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করলে দীর্ঘ সময় লাগবে বিধায় এডভোকেট মিজানুল ইসলাম অনেক অধ্যয়ন করে এসে একবারে প্রশ্ন করেন ট্রাইব্যুনালের সময় বাচানোর জন্য। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা একবারে কিভাবে জবাব দেবেন তা নিয়েই ছিল বিতর্ক। মিজানুল ইসলাম শুরু থেকেই বলেন, আজকে বলতে সমস্যা হলে উনি দেখে শুনে এসে আগামীকাল জবাব দিতে পারেন। উত্তর হ্যাঁ হলে এখানেই এ বিষয়টি শেষ হবে, না হলে আরো জেরা হবে। সময় অনেক লাগবে। আদালত বলেন, এতে আপনার লাভ কি। নাম থাকলে আছে। না থাকলে নেই। এটা তো ডকুমেন্টেই বলে দেবে। আর্গুমেন্টের সময় বলতে পারবেন। মিজানুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা যা কিছু প্রদর্শনী করেছেন তা আসামীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্যই করেছেন এটাই ধরে নিতে হবে। সুতরাং সে বিষয়ে প্রশ্ন করার অধিকার আমার রয়েছে। অন্যথায় আমরা প্রি-জুডিস হবো। এ প্রসঙ্গে ডকে দাড়ানো তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনও কয়েকবার রাগান্বিত হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, এসব নিয়ে আগে প্রশ্ন হয়েছে। হায়দার আলীও তার সাথে সুর মিলান। শেষ পর্যন্ত কোর্টের সময় শেষ হওয়ার পরেও আধা ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয় এই বিতর্ক শেষ করতে। ট্রাইব্যুনাল অবশেষে সিদ্ধান্ত দেন যে এই প্রশ্ন রেকর্ডে থাকবে না। প্রশ্ন তদন্ত কর্মকর্তাকে দিয়ে দেয়া হয়। আগামীকাল তিনি জবাব দেবেন। আজ সোমবার পুনরায় তদন্ত কর্মকর্তাকে যখন জেরা করা হবে তখন হয়তো তিনি এই প্রশ্নের জবাব দেবেন। গতকাল সকালে ৫০ মিনিট এবং বিকেলে সোয়া ১ ঘণ্টার মতো জেরা করা হয় তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিনকে। জেরায় এডভোকেট মিজানুল ইসলামকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার তানভীর আল আমিন, এডভোকেট মনজুর আহমেদ আনসারী, আবু বকর সিদ্দিক প্রমুখ।
গতকালের জেরার বিবরণ নিম্নরূপ : প্রশ্ন : ২৩নং সাক্ষী মধুসুধন ঘরামীর জবানবন্দী কত তারিখে নিয়েছিলেন?
উত্তর : ৩/১১/২০১০ তারিখে।
প্রশ্ন : তার জবানবন্দী নেয়ার জন্য পিরোজপুরে কত তারিখে যান?
উত্তর : ২/১১/২০১২ তারিখে।
প্রশ্ন : এই তারিখ পর্যন্ত শেফালী ঘরামীর ধর্ষণ বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য ছিল না।
উত্তর : জি না। ছিল না।
প্রশ্ন : মধুসুধন ঘরামীর জবানবন্দী আপনি তার বাড়িতে গিয়ে নিয়েছিলেন?
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : শেফালী ঘরামীকে ধর্ষণের বিষয়ে সর্বপ্রথম তথ্য কে আপনাকে দেয়?
ওউত্তর : মধুসুধন ঘরামী নিজেই ৩/১১/২০১০ তারিখে দেয়।
প্রশ্ন : ৩/১১/২০১০ তারিখের আগে আপনি কখনো হোগলাবুনিয়া গ্রামে গিয়েছিলেন?
উত্তর : জি না।
প্রশ্ন : হোগলাবুনিয়া গ্রামের মধুসুধন ঘরামী ব্যতিত অন্য কোনো ব্যক্তিকে আপনি সাক্ষী করেননি। অন্য কারো জবানবন্দীও নেননি?
উত্তর : সাক্ষী করি নাই। জবানবন্দী রেকর্ড করি নাই। তবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।
প্রশ্ন : ৩/১১//২০১০ তারিখে আপনি পিরোজপুর সার্কিট হাউস থেকে সরাসরি মধুসুধন ঘরামীর বাড়িতে যান।
উত্তর : সরাসরি যাইনি। প্রথমে মৃত তরণী সিকদার ও হরলাল মালাকারের বাড়ি হয়ে তারপর গিয়েছি।
প্রশ্ন : মধুসুধন ঘরামীর বাড়ি আপনাকে কে দেখিয়ে দিয়েছিল?
উত্তর : স্থানীয় মালেক মেম্বর দেখিয়ে দেন।
প্রশ্ন : তরণী সিকদার ও হরলাল মালাকারের বাড়ি পাশাপাশি?
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : ঐ দু'টি বাড়ি থেকে মধুসুধন ঘরামীর বাড়ি কোন দিকে কত দূরে।
উত্তর : একই গ্রামে উত্তর-পশ্চিম দিকে পৌনে ১ কিলোমিটার।
প্রশ্ন : মধুসুধন ঘরামীর বাড়ি ক'টায় যান?
উত্তর : সকাল ১০টা ২০ মিনিটে।
প্রশ্ন : মধুসুধন ঘরামীর বক্তব্য আপনি অডিওতে ধারণ করেছেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : যখন তার বাড়ি ও তাকে ভিডিও করেন তখন তার কথা রেকর্ড করেছেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : ধর্ষণের তারিখ ও মাস সম্পর্কে আপনি কোনো তথ্য পাননি?
উত্তর : জি, না উনি বলতে পারেননি। যুদ্ধের শেষের দিকে বলেছিল।
প্রশ্ন : সন্ধ্যা ঘরামীর জন্ম কবে এ সম্পর্কে আপনি কোনো তথ্য পাননি।
উত্তর : জি, না।
প্রশ্ন : মধুসুধন ঘরামী মুসলমান হয়েছিল কবে সে সম্পর্কে কোনো তথ্য পেয়েছিলেন?
উত্তর : তারিখ বলতে পারেনি। তবে তাকে জোরপূর্বক মুসলমান করা হয়েছিল।
প্রশ্ন : আপনি উনার বাড়িতে কতক্ষণ ছিলেন?
উত্তর : প্রায় ২ ঘণ্টা।
প্রশ্ন : ‘‘আমি ফাল্গুন মাসের শেষের দিকে বিয়ে করেছিলাম’’ এই কথা আপনার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেননি।
উত্তর : জি, ওভাবে বলেননি। তবে ট্রেজারি লুটের আগের দিন তিনি বিয়ে করেন, এটা বলেছিলেন।
প্রশ্ন : ট্রেজারি লুটের ঘটনা ক'তারিখে হয়েছিল?
উত্তর : তারিখ আমার নোটে নেই।
প্রশ্ন : ‘‘দেলোয়ার পরে নিজেকে দেলোয়ার সিকদার পরিচয় দিতেন। আগে শুনিনি। এখন সাঈদী।’’ একথা আপনার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে মধু ঘরামী বলেননি।
উত্তর : জি, একথা বলেননি।
প্রশ্ন : ঘটনার ৩/৪ দিন পরে রাজাকারের লোকজন আমার বাড়িতে আসে। এই কথা মধুসুধন ঘরামী আপনার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেননি।
উত্তর : জি, বলেনি।
প্রশ্ন : ‘স্ত্রী আমাকে পরে বলে যে সে এসেছিল' একথাও তিনি আপনাকে বলেননি।
উত্তর : জি, না বলেননি।
প্রশ্ন : পারেরহাট বাজারে মসজিদে বসে মুসলমান হয়েছিলাম। এই কথাটি মধুসুধন ঘরামী আপনার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে বলেননি।
উত্তর : জি, বলেননি।
প্রশ্ন : আমার নাম আলী আশ্রাফ এবং গনেশকে আলী আকবর রাখা হয়। একথাও তিনি আপনাকে বলেননি।
উত্তর : জি, বলেননি।
প্রশ্ন : মধুসূধন ঘরামী সাক্ষী দেয়ার জন্য ঢাকায় কবে এসেছিলেন?
উত্তর : তারিখ মনে নেই।
প্রশ্ন : উনি ঢাকায় কোন হাসপাতালে ছিলেন?
উত্তর : জানি না।
প্রশ্ন : ৩১ জানুয়ারি থেকে ১ ফেব্রুয়ারি কোর্টে আসা পর্যন্ত কি তিনি একই হাসপাতালে ছিলেন?
উত্তর : আমি জানি না।
প্রশ্ন সাক্ষী দেয়ার পরে তিনি কোর্ট থেকে নিজ বাড়িতে চলে গেছেন?
উত্তর : জি।
কোর্টের প্রশ্ন : মধুসূধন ঘরামী কি সাক্ষ্য প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি গেছে না ক'দিন পরে গিয়েছেন?
উত্তর : আমার জানা নেই।
প্রশ্ন : সাক্ষী দিতে কোর্টে আসার সময় তার সাথে তার ভাইয়ের মেয়ে অঞ্জলী ও অঞ্জলীর ছেলে সুমন ছিলেন?
উত্তর : আমি বলতে পারব না। আমি শুধু মধুসুধন ঘরামীকেই এনেছিলাম। একটি ছেলেকে সাথে দেখেছি বলে মনে পড়ে।
প্রশ্ন : সাক্ষ্য দেয়ার পর অসুস্থ মধুসুধন ঘরামীকে আপনি কার কাছে হস্তান্তর করেছিলেন?
উত্তর : আমি কারো কাছে হস্তান্তর করি নাই, কারণ তিনি আমার হেফাজতে ছিলেন না।
প্রশ্ন : ৩/১১/২০১০ তারিখ ছাড়া তদন্তকালে মধুসুধন ঘরামীর সাথে আপনার আর দেখা হয়নি।
উত্তর : জি, হয়নি।
প্রশ্ন : তদন্তকালে পাড়েরহাটে চরখালী পীর সাহেবের খানকায় আপনি গিয়েছিলেন?
উত্তর : না, যাইনি।
প্রশ্ন : ১৯৭১ সালে পাড়েরহাট মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি ছিল এমন কাউকে আপনি পরীক্ষা করেছেন? তাদের নাম বলুন।
উত্তর : এমন কাউকে আমি পাইনি।
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে পাড়েরহাট মসজিদের ঈমাম ও মোয়াজ্জিন কারা ছিলেন? খবর নিয়েছেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : আপনি মধুসুধন ঘরামীকে এই মামলার রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে সাক্ষ্য প্রদান করিয়েছেন?
উত্তর : সত্য নয়।

