Quantcast
ঢাকা, সোমবার 30 July 2012, ১৫ শ্রাবণ ১৪১৯, ১০ রমযান ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৪৫১ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসের সহকারী পরিচালকের সাক্ষ্য

মিরপুরে আব্দুল কাদের মোল্লা হত্যকান্ড সংঘঠিত করেছে তা ড্রাইভারের কাছে শুনেছেন

স্টাফ রিপোর্টার : জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসের সহকারী পরিচালক খন্দকার আবুল আহসান (৫৫)। সাক্ষ্য দেয়ার সময় তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মিরপুরে ১০ নাম্বার জল্লাদ খানায় নিয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে বাবা শহীদ আবু তালেবকে হত্যা করা হয়। এ সময় আব্দুল কাদের মোল্লা, আকতার গুন্ডাসহ কিছু অবাঙ্গালী ছিল। জেরায় তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর মুক্তিযুদ্ধকালীন কোন ঘটনাই তিনি নিজ চোখে দেখেননি। মিরপুরে আব্দুল কাদের মোল্লা হত্যাকান্ড চালিয়েছেন তিনি তা তাদের অবাঙ্গালী ড্রাইভারের কাছ থেকে শুনেছেন। আর পিতাকে আব্দুল কাদের মোল্লার কাছে হস্তান্তরের কথাও তিনি শুনেছেন। তবে কোথায় তাকে হস্তান্তর করা হয় তিনি জানেন না। স্বাধীনতার পর তার পিতার হত্যাকান্ড নিয়ে থানা বা অন্য কোথাও কোন অভিযোগ করেননি।

গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পঞ্চম সাক্ষী তার জবানবন্দি পেশ করেন। জবানবন্দি শেষে ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবী একরামুল হক তাকে জেরা করেন। আজও তার জেরা করা হবে।

জবানবন্দী :

জবানবন্দিতে সাক্ষী খন্দকার আবুল আহসান (৫৫) বলেন, আমি ১৯৭১ সালে মিরপুরে শাহআলী একাডেমীর নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। আমি আমার বাবা-মার সাথে প্লট ন-১৩, রোড নং-২, ব্লক বি, সেকশন-১০, মিরপুর হাউজিং এস্টেট, ঢাকায় বসবাস করতাম। আমার পিতা একজন সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও আইনজীবী ছিলেন। বাবা সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ, দৈনিক আযাদ, সংবাদ, ইত্তেফাক, দ্য মর্নিং নিউজ, অবজারভারে কাজ করেছেন এবং পয়গাম পত্রিকায় খন্দকালীন চাকরি করেন।

তিনি বলেন, আমার বাবা ১৯৬১-৬২ সালের তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সাংবাদিক ইউনিয়নের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন।

সাক্ষী বলেন, ১৯৭০ সালে মিরপুরে জহির উদ্দিন নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচন করেন। অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আযম দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নির্বাচন করেন। ওই নির্বাচন কালীন সময়ে আব্দুল কাদের মোল্লা গোলাম আযমের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন। নির্বাচনের সময় আমার বাবা নৌকা মার্কার পক্ষে কাজ করেছে।

তিনি বলেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক জয়ের কারণে পরাজিত পক্ষ আব্দুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে ৭১ সালের ২৫ মার্চের পর মিরপুরে বিভিন্ন ধরনের নৃশংস হত্যাকান্ড চালানো হয়। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস ছিল। ওই দিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বাংলা দিবস হিসেবে পালন করে। ১ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান সেনা বাহিনী কর্তৃক সাধারণ জনগণকে হত্যার প্রতিবাদে ২৩ মার্চ সর্বত্র ছাত্ররা কালো পতাকা ও বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করে। সে দিন আমরা মিরপুর-১০ এ বাংলা স্কুলে পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে কালো পতাকা উত্তোলন ও স্বাধীন বাংলার পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।

তিনি বলেন, মিরপুর বাংলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন সৈয়দ কাইয়ুম সাহেব। ২৩ মার্চ রাত ১২টা এক মিনিটে পাকিস্তানী টেলিভিশনে আমার সোনার বাংলা- আমি তোমায় ভালোবাসী গান গেয়ে অনুষ্ঠান শেষ করা হয়। সে সময় কাইয়ুম স্যার আমাদের বাসায় ছিলেন।

সাক্ষী বলেন, ওই দিন দিবাগত রাত আড়াইটা-তিনটার  দিকে ৩/৪ জন গিয়ে কাইয়ুম সাহেবের বাসার দরজা ভেঙ্গে ঢুকে জিজ্ঞাস করে- স্বাধীন বাংলার পতাকা কেন উঠিয়েছিলি এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে, তাকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে রক্তাক্ত করে। এ সময় তিনি প্রাণভয়ে পালানোর চেষ্টা করলে রাস্তায় পড়ে যান। তখন একজন বাঙ্গালি তাকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসেন। তখন মিরপুর রাড্ডা বার্ণেন হসপিটাল, পূর্বে সরকারি আউটডোর ক্লিনিক ছিল, সেখান থেকে একজন বাঙ্গালি ডাক্তার এনে তার প্রাথমিক চিকিৎসা করা হয়। ডাক্তার তার সমস্ত শরীর নেকড়া দিয়ে পেঁচিয়ে দেন। পরদিন সকালে আমার বাবা কাইয়ুম স্যারকে যথারীতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখান থেকে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বাস ভবনে যান এবং মিরপুরের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করেন।  তখন বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক ফোন করে মিরপুরে ইপিআর মোতায়েন করতে বলেন এবং আমার পিতাকে মিরপুরে অবস্থান করতে বলেন।

সাক্ষী বলেন, কাইয়ুম স্যারের অবস্থা দেখে আমার মা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। তখন আমরা মিরপুরে বাবাকে রেখে ২৪ মার্চ শান্তিনগরে আমার ফুফুর বাসায় চলে আসি। আমার বাবাসহ ৭/৮ জন মিরপুরের বাসায় অবস্থান করছিলেন। বাবা এসে আমাদের জানান, মিরপুরে খুব টেনশন চলছে। বিহারীদের মধ্যে খুব উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, একাত্তর সালের ২৫ মার্চ ক্রার্ক ডাউন হয়। ২৭ মার্চ অল্প সময়ের জন্য কারফিউ রহিত করা হয়। এ সময়ে বাবা পয়গাম পত্রিকার খন্ডকালীন ফিচার এডিটর ছিলেন এবং বিএনআর নামক এডভোকেটস ফার্মে কাজ করতেন। ওখানে তিনি সংবাদ পান ইত্তেফাক অফিস গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তখন সহকর্মীদের অবস্থা দেখার জন্য বাবা সেখানে গিয়ে কিছু মৃত ব্যক্তি দেখতে পান।

সাক্ষী বলেন, একাত্তর সালের ২৯ মার্চ বাবা বলেন টাকা ও গাড়ি আনতে মিরপুরের বাসায় যাবেন। একথা বলে তিনি তার নিজ কর্মস্থল এডভোকেটস ফার্মে যাচ্ছিলেন। পথে ইত্তেফাকের তৎকালীন অবাঙ্গালি চিফ একাউন্টেন আব্দুল হালিমের সঙ্গে দেখা হয়েছে। পরে শুনেছি আব্দুল হালিম তার গাড়িতে তুলে নিয়ে বাবাকে আব্দুল কাদের মোল্লার কাছে হস্তান্তর করে।

সাক্ষী বলেন, মিরপুরে ১০ নাম্বার জল্লাদ খানায় নিয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে বাবাকে হত্যা করে। এ সময় আবদুল কাদের মোল্লা, আকতার গুন্ডাসহ কিছু অবাঙ্গালী ছিল।

২৯ মার্চ আমার বাবার হত্যাকান্ডের পর আমাদের কোনো জায়গা জমি ও আয় উপার্জন ছিল না। আমার মা পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে যান। এরপর আমার বড় ভাইয়েরও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থা ছিল। এ অবস্থায় আমরা পুবাইলস্থ বেউড়া গ্রামে পরিচিত একজনের বাসায় চলে যাই।

সাক্ষী বলেন, এরপর আমি ঢাকায় এসে চকবাজার থেকে চা-পাতা কিনে ফেরি করে চা বিক্রি করতাম। এ সময় একদিন আমি চক বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম। সে সময় আমাদের গাড়ির অবাঙ্গালি ড্রাইভার নিজামের সঙ্গে দেখা হয়। যার বাসা ছিল মিরপুরের ১০ নাম্বারে। আমি তার মাধ্যমে জানতে পারি, জাতীয় নির্বাচনের পর পরাজিত লোকদের সঙ্গে অর্থাৎ আব্দুল কাদের মোল্লা, আক্তার গুন্ডা ও আব্দুল্লাহসহ বেশকিছু বিহারী আব্দুল কাদের মোল্লার নির্দেশে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। গাবতলী বাসস্ট্যান্ড ও টেকনিক্যাল থেকে বাঙ্গালিদের ধরে এনে শিয়ালবাড়ী, মুসলিম বাজার বদ্ধভূমি জল্লাদখানায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ওই সময় ওখানে হাজার হাজার বাঙ্গালিকে ধরে এনে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি তার জবানবন্দিতে বলেন।

এ সময় প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলীর এক প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী আবুল আহসান বলেন, আমি আব্দুল কাদের মোল্লার ছবি টিভি ও পত্র-পত্রিকায় দেখেছি। তাকে কখনো সরাসরি (ফিজিক্যালি) দেখিনি।  এ সময় প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী সাক্ষীকে বলেন, আপনি কী চান? তখন বিচারক শাহিনুর ইসলাম বলেন, উনি চাইবে কেন? চাইবে তো প্রসিকিউশন। তখন সাক্ষী বলেন, আমি একজন শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য হিসেবে এ হত্যার বিচার চাই।

জবানবন্দি শেষে সাক্ষীকে জেরা করেন ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবী একরামুল হক।

জেরা :

প্রশ্ন : সে সময় আপনার বয়স কত ছিল?

উত্তর : ১৩/১৪ বছর হবে।

প্রশ্ন : আপনার জন্ম তারিখ বলতে পারে?

উত্তর : ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭।

প্রশ্ন : এই মর্মে আপনার কোন আইডি কার্ড এনেছেন?

উত্তর : হ্যাঁ, আমি আইডি কার্ড সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। (তিনি এ সময় তার আইডি কার্ড ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করেন।)

প্রশ্ন : আপনি চাকরি করেন?

উত্তর : হ্যাঁ।

প্রশ্ন : আপনার আইডি কার্ডটি কিসের?

উত্তর : অফিসিয়াল আইডি কার্ড।

প্রশ্ন : কোন অফিস থেকে তা ইস্যু করা হয়েছে?

উত্তর : প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তা ইস্যু করা হয়েছে। 

প্রশ্ন : কী পোস্টে আছেন?

উত্তর : ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসের সহকারী পরিচালক।

প্রশ্ন : কোন সালে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন?

উত্তর : ১৯৭৭ সালে।

প্রশ্ন : ১৯৭১ সালে যে বাসায় ছিলেন, এখনও কী সেই বাসায় আছেন?

উত্তর : আমরা এখনো সেই বাড়িতে আছি। বাড়িটি বাবার নামে বরাদ্দকৃত।

প্রশ্ন : ওই বাসাতে কে কে বাস করে?

উত্তর : আমি, আমার পরিবার ও বোন।

প্রশ্ন : আপনার ভাই নেই?

উত্তর : আমার বড় ভাই মারা গেছেন।

প্রশ্ন : আপনার বড় ভাইয়ের কেউ আছে?

উত্তর : আমার বড় ভাই-এর কন্যা তার স্বামী সংসার নিয়ে আমার বাড়ির সামনে থাকে। আর ভাবী আমাদের সাথেও থাকেন, তার মেয়ের সাথেও থাকেন।

প্রশ্ন : আপনার বাবা যে আইনজীবী ছিলেন, তার সাক্ষ্য-প্রমাণ এনেছেন?

উত্তর : সে মর্মে কোন কাগজ এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে নেই। এনেছি। তা প্রসিকিউশন অফিসে রেখে এসেছি। আমার পিতা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তার স্মারক হিসেবে আমার আববার নামে মিরপুরে শহীদ আবু তালেব উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। প্রেস ক্লাবে শহীদদের নামফলকে আমার বাবার নাম আছে। ঢাকা আইনজীবী সমিতিতে শহীদ হিসেবে নামফলক আছে, জাতীয় জাদুঘরে একটা গ্যালারী আছে। অন্যান্য শহীদদের মতো তার নামেও স্মারক ডাক টিকেট আছে।

প্রশ্ন : আপনি আপনার পিতার যে পরিচয় দিলেন, তার সমর্থনে কোন কাগজপত্র তদন্ত কর্মকর্তা জব্দ করেছেন?

উত্তর : তাকে দেখিয়েছি। কিন্তু তিনি জব্দ করেননি।

প্রশ্ন : আপনার পিতা পত্রিকায় কাজ করেছেন, তার প্রমাণ দেখিয়েছেন?

উত্তর : এমন কোনো কাগজ আমার কাছে নেই। আমাদের বাসা পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাই আমার কাছে কোন কাগজপত্র নেই।

প্রশ্ন : তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন, এমন কোনো কাগজপত্র দিয়েছেন?

উত্তর : জবানবন্দী প্রাসঙ্গিক কোন কাগজপত্র এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে নেই।

প্রশ্ন : '৭০-এর নির্বাচনে এডভোকেট জহির উদ্দিন নৌকা মার্কা নির্বাচন করেছিলেন, তিনি তো বিহারী ছিলেন।

উত্তর : হ্যাঁ, তিনি অবাঙ্গালী ছিলেন।

প্রশ্ন : নির্বাচনে তিনি........

উত্তর : তিনি জয়লাভ করেছিলেন।

প্রশ্ন : নির্বাচনে মিরপুরে কতটা ভোট কেন্দ্র ছিল?

উত্তর: আমার জানা নেই।

প্রশ্ন : আপনার পিতা ও পরিবার বঙ্গবন্ধুর সমর্থক ছিলেন?

উত্তর : বঙ্গবন্ধুর সমর্থক ছিলাম এবং নৌকা মার্কার সমর্থক ছিলাম।

প্রশ্ন : আপনার বাসার আশপাশে কয়টা নির্বাচনী প্রচারনার অফিস ছিল?

উত্তর : কয়টা অফিস ছিল, তা আমার জানা নেই। আমি ভোটারও ছিলাম না।

প্রশ্ন : দাঁড়ি-পাল্লার পক্ষে কয়টা ছিল?

উত্তর : আমার জানা নেই।

প্রশ্ন : ক্র্যাক ডাউন কখন হয়, ২৫ মার্চ দিনে নাকি রাতে?

উত্তর : ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে।

প্রশ্ন : ২৫ মার্চ আপনি কোথায় ছিলেন?

উত্তর : শান্তিনগর ফুপুর বাসায় ছিলাম।

প্রশ্ন : শান্তিনগর কবে আসেন?

উত্তর : ২৪ মার্চ দিনে।

প্রশ্ন : ফুপুর বাসায় কয়দিন ছিলেন?

উত্তর : ২৯ তারিখ পর্যন্ত।

প্রশ্ন : ফুপার নাম?

উত্তর : মরহুম শেখ হাবিবুল হক। আর ফুপুর নাম হোসনে আরা হক। তিনি জীবিত আছেন।

প্রশ্ন : মিরপুরে আপনার আববার সাথে ৭/৮জন ছিল বলে জবানবন্দীতে বলেছেন। এর মধ্যে নিজেদের লোক কয়জন ছিল?

উত্তর : আববার সাথে মিরপুরের বাসায় ২৪ তারিখ রাতে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে প্রতিবেশী শাহজাহান ও তাজুলকে চিনি।

প্রশ্ন : তাদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে, কাদের কাছ থেকে শুনেছেন?

উত্তর : টল্টু মিয়ার কাছ থেকে শুনতে পেরেছিলাম শাহজাহান ও তাজুলকে আমাদের বাড়িতে পুড়িয়ে মারা হয়।

প্রশ্ন : কোন তারিখে?

উত্তর : ২৬ তারিখ বেলা ১০/১১টার দিকে।

প্রশ্ন : টল্টু মিয়া জীবিত না মৃত?

উত্তর : তিনি জীবিত। সম্ভবত ফরিদপুরে গ্রামের বাড়িতে আছেন।

প্রশ্ন : উনার বয়স কত হবে?

উত্তর :  ষাটোর্ধ, তার পিতার নাম জানি না।

প্রশ্ন : টল্টু মিয়ার কাছ থেকে কবে কোথায় শুনেছেন?

উত্তর : স্বাধীনতার পর আমি টল্টু মিয়ার কাছ থেকে শুনেছি, তবে তারিখ বলতে পারবো না, জায়গাও মনে নেই।

প্রশ্ন : টল্টু মিয়ার বাড়ির নম্বর কত?

উত্তর : তার বাড়ি নয়, তিনি আমাদের প্রতিবেশী, তার আত্মিয় হান্নান হাজীর বাসায় থাকতেন।

প্রশ্ন : তিনি কী করতেন?

উত্তর : তিনি হান্নান হাজীর কন্ট্রাকটারি কাজ দেখাশোনা করতেন।

প্রশ্ন : স্বাধীনতার পর কত তারিখে মিরপুরে যান?

উত্তর : ১৯৭৩ সালের দিকে যাই। দিন তারিখ মনে নেই।

প্রশ্ন : কী দেখলেন?

উত্তর : বাসায় গিয়ে দেখলাম কিছুই নেই। ফ্লোরগুলো খোরানো, ওখানে বিহারীরা তাঁত বসিয়েছিল।

প্রশ্ন : কোন বিহারী?

উত্তর : তা জানা নেই।

প্রশ্ন : কে কে গিয়েছিলেন?

উত্তর : আমি ও আমার ভাই খন্দকার আবুল হাসান প্রথম যাই।

প্রশ্ন : আশপাশের বাসার কেউ ছিল?

উত্তর : ছিল।

প্রশ্ন : কে কে ছিল?

উত্তর : হান্নান হাজী, শাফা মাতবরের বাসা ছিল।

প্রশ্ন : আপনার বাড়িতে যাওয়ার সময় কাউকে জিজ্ঞেস করেছিলেন?

উত্তর : কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা না করে সরাসরি বাসায় ঢুকেছিলাম।

প্রশ্ন : সেদিন কতক্ষণ ছিলেন?

উত্তর: ৩ ঘণ্টার মতো ছিলাম। সন্ধ্যার পূর্বেই ফিরে আসি। কারণ তখন মিরপুর নিরাপদ ছিল না।

প্রশ্ন : আবার কবে যান?

উত্তর : ২/৩ সপ্তাহ পর পর গিয়েছি।

প্রশ্ন : কোন মাসে উঠলেন?

উত্তর : সম্ভবত '৭৩ সালের শেষ দিকে।

প্রশ্ন : কাইয়ুম সাহেবের বাসা ও আপনার বাসার দূরত্ব কত?

উত্তর : কাইয়ুম স্যারের বাসা ছিল সি ব্লকে আর আমার বাসা ছিল বি ব্লকে।

প্রশ্ন : দূরত্ব কত?

উত্তর : হেঁটে ১০ মিনিটের রাস্তা।

প্রশ্ন : কাইয়ুম সাহেবের বাসার চারপাশে কারা থাকতো?

উত্তর : উনি ভাড়া বাসায় থাকতেন। চারপাশে কাদের বাসা ছিল জানি না।

প্রশ্ন : কারা ছুরিকাঘাত করে?

উত্তর : বাঙ্গালী অবাঙ্গালী কয়েকজন।

প্রশ্ন : তিনি কোথায় পড়ে যান?

উত্তর : আমার বাসার ৩০০ গজ দূরে।

প্রশ্ন : কে তার সাহায্যে এগিয়ে আসে?

উত্তর : মোল্লা নামক এক বাঙ্গালী ভদ্রলোক কোদাল হাতে চিৎকার করতে করতে এগিয়ে আসে। তখন আক্রমণকারীরা পালিয়ে যায়। মোল্লা কাইয়ুম স্যারকে তুলে নিয়ে আসেন।

প্রশ্ন : কয়টার দিকে?

উত্তর : আনুমানিক রাত ৩টার দিকে।

প্রশ্ন : আপনার বাসা থেকে হাসপাতালের দূরত্ব কত?

উত্তর : ৫০০/৭০০ গজ দূরে।

প্রশ্ন : কে ডাক্তার ডাকতে গিয়েছিল?

উত্তর : আমি নিজে গিয়েছিলাম।

প্রশ্ন : স্বাধীনতার পর ওই ডাক্তারের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে?

উত্তর : ওই ডাক্তারের সাথে স্বাধীনতার পর আমার সাক্ষাৎ হয়নি।

প্রশ্ন : তার নাম কী ছিল?

উত্তর: নাম মনে নেই।

প্রশ্ন: আপনার পিতা কাইয়ুম সাহেবকে কিসে করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গিয়েছিলেন?

উত্তর: আমাদের গাড়িতে করে নিয়ে যান।

প্রশ্ন: কয়দিন হাসপাতালে ছিলেন?

উত্তর: আমার জানা নেই।

প্রশ্ন: ২৪ তারিখের পরে কবে কোথায় কাইয়ুম সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল?

উত্তর: সঠিক মনে নেই। সম্ভবত: ৭৩/৭৪ সালে হতে পারে।

প্রশ্ন: কোন জায়গায়?

উত্তর: সে ভাবে মনে নেই।

প্রশ্ন: তিনি জীবিত আছেন?

উত্তর: হ্যাঁ

প্রশ্ন: তিনি কোথায় থাকেন?

উত্তর: মিরপুরে।

প্রশ্ন: বাসা কোথায়?

উত্তর: মিরপুর-৬ নম্বরে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন।

প্রশ্ন: তার সাথে কবে সাক্ষাত হয়?

উত্তর: প্রায়ই সাক্ষৎ হতো।

প্রশ্ন: শেষ কবে সাক্ষৎ হয়?

উত্তর: বছরখানেকের মধ্যে সাক্ষাৎ হয়নি।

প্রশ্ন: তিনি কি সুস্থ অবস্থায় আছেন?

উত্তর: হ্যাঁ। তবে মুখে, হাতে ও শরীরে কাটা চিহ্ন আছে।

প্রশ্ন: আপনার মা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন, নাকি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন?

উত্তর: কাইয়ুম স্যারের অবস্থা দেখে আমার মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, কিন্তু তিনি মানসিক ভারসাম্য হারান নি।

প্রশ্ন: শান্তিনগর থেকে পূবাইলের দূরত্ব কত?

উত্তর: আমাদের নৌকা পথে যেতে ২দিন সময় লেগেছিল।

প্রশ্ন: ওখানে কয়দিন ছিলেন?

উত্তর: সম্ভবত: জুলাই মাসে ঢাকা আসি।

প্রশ্ন: কে কে আসেন?

উত্তর: মা ভাই বোন সাতক্ষীরায় গ্রামের বাড়িতে চলে যান। আর আমি ঢাকায় আসি।

প্রশ্ন: তারা কী ভাবে সাতক্ষীরায় গেলেন?

উত্তর: বাসে।

প্রশ্ন: ঢাকায় কোথায় ছিলেন?

উত্তর: শহীদ সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিনের বাসায় থাকতাম।

প্রশ্ন: বাসাটা কোথায়?

উত্তর: ওরা ভাড়া থাকতো ৫নং চামেলীবাগ বাসায়।

প্রশ্ন: ওখানে কোন মাস পর্যন্ত ছিলেন?

উত্তর: জুলাই থেকে সম্ভবত ১লা ডিসেম্বর পর্যন্ত।

প্রশ্ন: ওই বাসায় কে কে থাকতো?

উত্তর: উনার পরিবারসহ ছিলাম।

প্রশ্ন: জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মিরপুরে গিয়েছিলেন?

উত্তর: না যাই নি।

প্রশ্ন: আপনি এসএসসি পাস করেছেন কবে?

উত্তর: ১৯৭৩ সালে সাতক্ষীরা প্রাণনাথ হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছি।

প্রশ্ন: এরপর উচ্চ শিক্ষা কোথায়?

উত্তর: আমি আর পড়াশুনা করিনি।

প্রশ্ন: কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক ছিল?

উত্তর: না ছিল না।

প্রশ্ন: এসএসসির পর ঢাকায় কবে ফিরলেন?

উত্তর: এসএসসির পর ঢাকায় চলে আসি। পরে গ্রামে খুব একটা যাওয়া হয়নি।

প্রশ্ন: কোথায় উঠলেন?

উত্তর: মিরপুরে আমার বাড়িতে যাই। তবে কোন মাসে গিয়েছি খেয়াল নেই।

প্রশ্ন: মা ভাই বোন কবে আসে?

উত্তর: যতদূর মনে পড়ে প্রথমে আমরা দুই ভাই মিরপুরে নিজ বাসায় আসি। পরে মাসহ অন্যরা আসেন।

প্রশ্ন: তখন আপনাদের পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কে ছিল?

উত্তর: আমার বড় ভাই ছাড়া আর কেউ ছিল না।

প্রশ্ন: ২৪ মার্চের পর থেকে যুদ্ধকালীন সময়ে মিরপুরের ঘটনা আপনি চাক্ষুস দেখেছেন?

উত্তর: না চাক্ষুসভাবে দেখিনি। কোন বাঙ্গালীর পক্ষেই তা সম্ভব ছিল না, কতিপয় লোক ছাড়া।

প্রশ্ন: নিজাম আপনাদের ড্রাইভার কতদিন ছিল?

উত্তর: অবাঙ্গালী ড্রাইভার নিজাম আমাদের গাড়ি ২ বছর চালিয়েছিল।

প্রশ্ন: বেঁচে আছে?

উত্তর: হ্যাঁ, তিনি পাকিস্তানে আছেন।

প্রশ্ন: নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক জয়ের পর পরাজিত পক্ষ মিরপুরে আবদুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে ২৫ মার্চ নৃশংস হত্যাকান্ড চালায় তা কী নিজ চোখে দেখেছেন?

উত্তর: নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ব্যাপক জয়ের পর পরাজিত পক্ষ মিরপুরে আবদুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে ২৫ মার্চ নৃশংস হত্যাকান্ড করেছে. এ কথা আমি ড্রাইভার নিজামের কাছ থেকে শুনেছি। নিজ চোখে দেখিনি।

প্রশ্ন: আবদুল কাদের মোল্লার নেতৃত্বে যে হত্যাকান্ডের কথা বলেছেন, স্বাধীনতার পর তা কী পত্রিকায় উঠেছিল?

উত্তর: আমি বলতে পারবো না।

প্রশ্ন: আপনার পিতার হত্যা নিয়ে কোন মামলা করেছেন?

উত্তর: বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ লুটপাট নিয়ে থানায় জিডি করেছিলাম। পিতার হত্যাকান্ড নিয়ে থানা বা অন্য কোথাও অভিযোগ করিনি।

প্রশ্ন: আপনার পিতাকে ইত্তেফাকের অবাঙ্গালী চীফ একাউন্টেন্ট আবদুল হালিম নিয়ে গেছেন তা কে দেখেছে?

উত্তর: আমি ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ বিএনআর (ল ফার্ম) এ গিয়ে আববার খোঁজ করতে জানতে পারলাম এডভোকেট খলিল সাহেব দেখেছেন যে, আবদুল হালিম আমার আববাকে তার গাড়িতে করে নিয়ে যায়।

প্রশ্ন: এডভোকেট খলিলের বাড়ি কোথায়?

উত্তর: বাড়ি কোথায় জানি না। তিনি মারা গেছেন।

প্রশ্ন: তিনি কোথায় জায়গা দেখেছেন?

উত্তর: তা জিজ্ঞেস করার মানসিকতা ছিল না।

প্রশ্ন: আপনার পিতাকে আবদুল কাদের মোল্লার কাছে কোন জায়গায় হস্তান্তর করেছে?

উত্তর: মিরপুরে।

প্রশ্ন: তা কে দেখেছে?

উত্তর: আমার ড্রাইভার নিজামের মুখে শুনেছি।

প্রশ্ন: কোন জায়গায় হস্তান্তর করেছে?

উত্তর: সুনির্দিষ্ট কোন জায়গায় হস্তান্তর হয়েছে বলে শুনি নি। আর জিজ্ঞাসাও করিনি। তবে জল্লাদ খানায় তাকে হত্যা করা হয়েছে।

প্রশ্ন: ৭১ সালে আবদুল কাদের মোল্লার অবস্থান কোথায় ছিল?

উত্তর: শুনেছি মিরপুরের দুয়ারী পাড়ায়।

প্রশ্ন: কার কাছে শুনেছেন?

উত্তর: মিরপুরের অধিকাংশ লোকই তা জানে।  নির্দিষ্ট কোন লোকের নাম বলতে পারবো না।

প্রশ্ন: আবদুল কাদের মোল্লার ব্যাপারে শেখানো কথা আপনি বলছেন।

উত্তর: সত্য নয়।

প্রশ্ন: আবদুল কাদের মোল্লা ৭১-৭২ সালে ঢাকা শহরের কোথাও ছিলেন না।

উত্তর: আমি জানি না। ঢাকায় ছিল না তা অবিশ্বাস্য।

গত ২৪ জুলাই ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি পেশ করেন কাজী রোজি। এর আগে গত ২০ জুন  আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে  ওপেনিং স্টেটমেন্ট (সূচনা বক্তব্য) উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন।  এরপর তার বিরুদ্ধে মোজাফফর আহম্মেদ খান, শহীদুল হক মামা ও একজন নারী সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।

গত ২৮ মে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে পৃথক ছয়টি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে গত ১ নভেম্বর জমা দেয়া তদন্ত প্রতিবেদনে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। ট্রাইব্যুনাল গত ২৮ ডিসেম্বর এসব অভিযোগ আমলে নেয়।

তাকে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই গ্রেফতার করা হয়। পরে ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী সংস্থার এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২ আগস্ট কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আটক রাখার আদেশ দেয়া হয়।