|
|
পুরনো পাম্প ও পানির স্তর নীচে নামায় ভয়াবহ সংকটের আশংকা
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ঢাকা ওয়াসার ৬২২টি পাম্পের মাঝে পাঁচ শতাধিক পাম্পেই নির্ধারিত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন একটি পাম্পে যে পরিমাণ পানি পাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয় তার থেকে অনেক কম পানি পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ২৫০টির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সেগুলো মেরামতের সুপারিশ করেছে সংশ্লিষ্টরা। শতাধিক পাম্পে পানিই ওঠে না। ওঠে বাতাস। পুরনো পাম্প যখন তখন বিকল হয়ে যাওয়া এবং ঢাকায় প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় নিকট ভবিষ্যতে রাজধানীতে ভয়াবহ পানি সংকটের আশংকা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি সংকট আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে যেখানে দৈনিক ৭০-৮০ কোটি লিটার পানি ঘাটতি ছিল তা এখন বেড়ে শতাধিক কোটি লিটারে গিয়ে ঠেকেছে।
ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী এস ডি এম কামরুল আলম চৌধুরী দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, প্রতিনিয়ত রাজধানীতে পানির স্তর নীচে নেমে যাচ্ছে। বৃষ্টি হলেও আমরা পানি ধরে রাখতে পারছি না। ইট পাথরে এমনভাবে শহরটিকে আচ্ছাদন করে ফেলা হয়েছে যেখানে বৃষ্টির পানি মাটির নীচে পৌঁছাতে পারছে না। রাজধানীতে নেই কোনো জলাধার। উদ্ধার করা যায়নি খালগুলোও। পানি গিয়ে পড়ছে নদীতে। তিনি জানান, এখন ঢাকা ওয়াসার প্রায় সব ক'টি পানির পাম্পেই সমস্যা চলছে। পানির স্তর নেমে যাওয়াতে নির্ধারিত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া প্রায়শ কোথাও না কোথাও পাম্পে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একটির সমধান হলে আরেকটিতে সমস্যা দেখা দেয়। তিনি বলেন, পাম্পেতো আর জোর খাটানো যায় না। এটি একটি টেকনিক্যাল বিষয়। বললেই সমস্যার সমাধানও হবে না।
জানা গেছে, ঢাকা শহরে পানির স্তর অঞ্চলভেদে প্রতি বছর এক থেকে তিন মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে সব পাম্পেই ক্ষমতার সমপরিমাণ পানি উৎপাদিত হচ্ছে না। ওয়াসার একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে চলমান পাম্পের মধ্যে প্রায় ২৫০টির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে সেগুলো মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্টরা প্রস্তাব দিয়েছেন। ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, সূত্রাপুর থেকে বাংলাবাজার, দয়াগঞ্জ, আরমানিটোলা হয়ে লালবাগ পর্যন্ত এলাকায় পানির পাইপ বসানো হয়েছে ১৯৪০ সালের আগে। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৩ সালের দিকে বসানো হয় খিলক্ষেত, বাসাবো, মগবাজার, মালিবাগ এলাকায়। ১৯৭৩ সালে রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী এলাকায় বাসানো হয় পানির লাইন। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, রাজধানীর ৬০ শতাংশ স্থানে পানির পাইপ পুরনো হয়ে গেছে। এসব পাইপে কাটাছেঁড়া হয়েছে অসংখ্যবার। পুরান ঢাকা এলাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার এলাকায় পানির লাইনে রয়েছে অনেক বড় ফুটো। ফলে এসব এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন যেমন দুর্গন্ধ, ময়লাযুক্ত পানি পাচ্ছেন, তেমনি সিস্টেম লস বাড়ছে। শতাধিক পাম্প থেকে কোনো পানিই ওঠে না। পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এগুলো সংশ্লিষ্টদের অনেকেই জানলেও সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেন না। প্রতিবছর পানির স্তর নীচের দিকে নেমে আসলেও গভীর নলকূপগুলো আছে আগের অবস্থায়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাত্র এক যুগের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে প্রায় ৩০-৩৫ মিটার। ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহার না করে অব্যাহতভাবে গভীর নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় রাজধানীর এ অবস্থা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেভাবে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে নলকূপ দ্বারা পানি উত্তোলন দুরূহ হয়ে পড়বে। তবে আশার বাণী ছিল এই যে, ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে দুইটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পানি শোধনাগার নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ দুটি প্লান্ট চালু হলে তা থেকে প্রতিদিন ১০০ কোটি লিটার পানি শোধন করা যাবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কিছুটা কমে যাবে। ওয়াসা চাচ্ছে নদী থেকে ৭০ শতাংশ পানি সরবরাহ করতে। যা এখন হচ্ছে মাত্র ১৩ শতাংশ। তবে এই প্রকল্প কবে নাগাদ বাস্তবায়ন হবে তা কেউই বলতে পারছে না।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) এক রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে নগরীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের গভীরতা ছিল ২৬ দশমিক ৬ মিটার। সেখানে গত বছর পানির স্তর ৬০ মিটারে নেমে গেছে। ভার্টিকাল অটোমেটিক ওয়াটার লেভে রেকর্ডারের সাহায্যে প্রাপ্ত বিএডিসির ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, ১৯৯৭ সালে পানির স্তর ছিল ২৮ দশমিক ১৫ মিটার, ১৯৯৮ সালে ৩০ দশমিক ৪৫ মিটার, ১৯৯৯ সালে ৩১ দশমিক ৮৬ মিটার, ২০০০ সালে ৩৪ দশমিক ১৮ মিটার, ২০০১ সালে ৩৭ দশমিক ৭৮ মিটার, ২০০২ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৮৭ মিটার, ২০০৩ সালে ৪৬ দশমিক ২৪ মিটার, ২০০৪ সালে ৫০ দশমিক ৬ মিটার। ২০০৭ সালে ছিল ৫০ দশমিক ৬ মিটার। প্রতি বছর কয়েক মিটার করে নামতে নামতে তা গত বছর এসে দাঁড়িয়েছে ৬০ মিটারে। গত বছর মোহাম্মদপুরে ৩৭.৫৮, সবুজ বাগে ৬১.৮৮, সূত্রাপুরে ২০.৯৫, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ২৯.৭৪, মিরপুরে ৬৯.৩৫ মিটার নিচে পানির স্তর নেমে যায়।
ঢাকা ওয়াসার সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ শীষ বলেন, ষাট থেকে সত্তরের দশকের দিকে রাজধানীতে মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ ফুটের মধ্যে পানি উঠানো যেতো। তখন ওয়াসার গভীর নলকূপ ছিল ৭০ থেকে ৮০টি । নলকূপের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির স্তর নিচে নামতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, গভীর নলকূপের সংখ্যা বৃদ্ধি না করে ঢাকার আশেপাশের নদীগুলো থেকে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে অদূর ভবিষ্যতে মাটির নিচ থেকে পানি তোলা কষ্টকর হয়ে যাবে। নগরবাসীকে পড়তে হবে মারাত্মক পানি সংকটে। এছাড়া ভূমি ধসের মত ঘটনাও ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
ওয়াসা সূত্র জানায়, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা ৬২২টি গভীর নলকূপ এবং ৪টি শোধনাগারের মাধ্যমে ২১০-২২৫ কোটি লিটার চাহিদার বিপরীতে ২১০-২২০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করছে। তবে এ ক্ষেত্রে সিস্টেম লস রয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এ হিসেবে প্রতিদিন রাজধানীবাসী পানি পাচ্ছে চাহিদার থেকেও প্রায় ৭০ কোটি লিটার কম। তবে গত কিছুদিন ধরে পানির স্তর নীচে নেমে যাওয়াতে পানির ঘাটতি শতাধিক লিটারে গিয়ে পৌঁছেছে। নগরীতে স্থাপন করা ৫ শতাধিক পাম্পই এখন তার নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। ওয়াসা জানায়, উৎপাদিত পানির ৮৭ শতাংশই ভূগর্ভ থেকে নলকুপের মাধ্যমে প্রাপ্ত। প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা জেনারেটর চালিয়ে গভীর নলকূপ থেকে এ পানি উত্তোলন করা হয়। বাকি ১৩ শতাংশ আসে ভূপৃষ্ঠের পানি শোধনের মাধ্যমে।
ওয়াসা সূত্র জানায়, প্রতিবছরই তারা গভীর নলকূপ স্থাপন করছে। দেখা যাচ্ছে দুই তিন বছর পরেই বসানো পাম্পে ঠিক মত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে পুরনো নলকূপগুলোতে এখন পানি তেমন একটা উঠে না। জেনারেটর চালালে পানির পরিবর্তে এসব নলকূপ থেকে বাতাস বের হয়।
ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশলী মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন ‘বাংলাদেশের নিরাপদ পানি সংকট ও সমাধানের উপায়' শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নির্বিচারে নগর সম্প্রসারণ, শহর সংলগ্ন খোলা মাঠ, জলাভূমি, পুকুর, খাল, নদী ভরাট করে ক্রমাগত কংক্রিটের শহর নির্মাণের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের পুনর্ভর প্রক্রিয়াকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তোলা হচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ড. আজহারুল হক মনে করেন, ঢাকা মহানগরী বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ভূগর্ভ থেকে আর পানি উঠানো ঠিক হবে না। রাজধানীর আশেপাশের নদী থেকে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পানি শোধনাগার নির্মাণ করবে। ইতোমধ্যে খিলক্ষেত ও পাগলায় দুটি প্লান্ট নির্মাণ কাজ চলছে। আগামী দুই এক বছরের মধ্যে এগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ করা হবে। শোধন করা হবে পদ্মা ও মেঘনার পানি। তিনি বলেন, এ দুটি প্লান্ট থেকে প্রতিদিন ১০০ কোটি লিটার পানি শোধন করা যাবে। তিনি বলেন, ওয়াসার টার্গেট হচ্ছে ৭০ শতাংশ পানি নদী থেকে শোধন করে রাজধানীতে সরবরাহ করা। যদি এটি সম্ভব হয় তাহলে পানির স্তর সময়ের ব্যবধানে অনেক ওপরে উঠে আসবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওয়াসার মডস জোনে অভিযোগের স্তূপ বাড়ছেই। সবার একটিই অভিযোগ পানি নেই। ভিকটিমরা বলছেন, যদি সময়মত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হতো তাহলে পানি সমস্যা কেটে যেত। সূত্র জানায়, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ ২০১০ সালের ১৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হবার কথা। জানা গেছে, প্রকল্পের অর্ধেক কাজও এখনো শেষ হয়নি। এটি চালু হলে দৈনিক আরও ২২.৫ কোটি লিটার পানিসহ মোট ৪৫ কোটি লিটার পানি এই শোধনাগার থেকে নগরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এছাড়া ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পদ্মা নদীর পানি শোধন করে রাজধানীতে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের লক্ষ্যে পাগলা জশলদিয়া প্রকল্প এবং মেঘনা নদীর পানি শোধন করে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহের লক্ষ্যে খিলক্ষেত পানি শোধনাগার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে অনেক আগেই। এছাড়াও সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প ফেজ-৩ গ্রহণ করা হয়েছে যার মাধ্যমে দৈনিক আরও ৪৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সূত্র জানায়, ওয়াসা প্রকল্পগুলো হাতে নিয়েই তাদের কাজ শেষ করে। এগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই পানি সরবরাহের ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া মুশকিল হবে। পানি নিয়ে হাহাকার দেখা দিবে। দেরি করলেই বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। যত সময় গড়াবে মহানগরীতে পানি সঙ্কট ততই তীব্র হবে। তখন ঢাকা বসবাসের উপযুক্ততা হারাবে। আগামী ১০ বছরের মধ্যে এই বিপর্যয় নেমে আসার আশংকা করা হচ্ছে। ২০ বছর পরে পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর রূপ নেবে। বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতি বছর এভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হলে কয়েক বছরের মধ্যে তা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। তারা বলছেন, বৃষ্টির পানি এবং ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহার করা না হলে রাজধানীতে ভূপরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিবে।

