|
|
গাড়ি পোড়ানো মামলায় চার্জ গঠন
কোর্ট রিপোর্টার: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ১৮ দলীয় জোটের ৪৬ নেতার বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোর মামলায় অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেছেন দ্রুত বিচার আদালত-৫ এর বিচারক হারুন-অর-রশিদ।
গতকাল মঙ্গলবার শুনানি শেষে ওই মামলায় তাদেরকে অভিযুক্ত করেন আদালত। চার্জ গঠনের মধ্য দিয়ে ফখরুলদের বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোর মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো। আগামী ৭ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর দিন ধার্য করেন আদালত। এছাড়া অভিযোগ গঠনকালে মামলার আসামি সাদেক হোসেন খোকা, আমান উল্লাহ আমান ও নাজিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
তবে সাদেক হোসেন খোকা হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য, আমান উল্লাহ আমান ও নাজিম উদ্দিন আলম ওমরাহ হজ্জ পালনের জন্য সৌদি আরবে থাকায় তাদের পক্ষে আলাদা আলাদাভাবে সময়ের আবেদন করা হয়।
আদালতে অনুপস্থিত থাকায় বিচারক আবেদনগুলো নাকচ করে দিয়ে তাদের জামিন বাতিল করে দেন। একই সঙ্গে ওই তিন জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন।
এর আগে গত ২০ জুন, ৩ ও ২৪ জুলাই অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল। চার্জ শুনানির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উত্তপ্ত ছিল আদালতের পরিবেশ।
এর আগে গাড়ি পোড়ানোর মামলাটি দ্রুত বিচার আদালত-৫ এর বিচারক হারুন-অর-রশিদের আদালতে স্থানান্তর করেন সিএমএম আদালত। বেলা পৌনে একটা নাগাদ স্থানান্তরিত আদালতে চার্জ শুনানি শুরু হয়।
তবে এ মামলাটি ছিল দ্রুত বিচার আদালত-৭ এর বিচারক মোহাম্মদ এরফান উল্লাহর আদালতে। সকালে বিচারকের প্রতি আসামিপক্ষ অনাস্থা প্রকাশ করায় মামলার নথি সিএমএম আদালতে প্রেরণ করেন তিনি।
সিএমএম আদালত পরে মামলার চার্জ শুনানি বিচারের জন্য দ্রুত বিচার আদালত-৫ এর বিচারক হারুন-অর-রশিদের আদালতে মামলাটি স্থানান্থর করেন।
বিচারক এরফান উল্লাহর আদালতে সকাল সাড়ে দশটায় আসামিপক্ষের আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন আদালতের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা করা হয়েছে মর্মে আদালতকে অবহিত করেন।
তিনি বলেন, যেহেতু আদালতের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, তাই বিষয়টি হাইকোর্টে নিত্তি না হওয়া পর্যন্ত চার্জ শুনানি মুলতবি রাখা হোক। এ বিষয়ে আইনজীবীর সনদপত্র দাখিল করা হয়েছে।
উচ্চ আদালতের আবেদন সংক্রান্ত আইনজীবী সনদের আদালতে দাখিল করা হয়েছে। সাধারণত এমতাবস্থায় সময় মঞ্জুর করার বিধান রয়েছে।
তিনি চার্জ শুনানি সাত অথবা দশদিন পিছিয়ে দেয়ার জন্য আদালতে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু, অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর শাহ আলম তালুকদার ও রেজাউল করিম চার্জ শুনানি স্থগিত রাখার বিরোধিতা করেন।
আব্দুল্লাহ আবু বলেন, ‘‘যেহেতু হাইকোর্টে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ শুনানি হয়নি এবং চার্জ শুনানির বিষয়ে হাইকোর্টের কোনো স্থগিতাদেশ নেই, সুতরাং চার্জ শুনানি করতে কোনো বাধা নেই।
শুনানি শেষে বিচারক আসামিপক্ষের চার্জ শুনানি স্থগিতের আবেদন নাকচ করে দেন এবং চার্জ শুনানি করার নির্দেশ দেন।
বিচারকের এ আদেশের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ উচ্চ আদালতে যাবেন, মর্মে চার্জ শুনানি স্থগিত রাখার জন্য ফের আবেদন করেন। বিচারক তাও নাকচ করে দেন। এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বিচারকের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেন এবং তার আদালতে মামলার শুনানি করবেন না মর্মে জানান।
এমন পরিস্থিতিতে বিচারক এরফান উল্লাহ সোয়া ১১টায় মামলার নথি মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) বিকাশ কুমার সাহার কাছে পাঠিয়ে দেন। সিএমএম মামলাটির শুনানি ও বিচারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে দ্রুত বিচার আদালত-৫ এর বিচারক হারুন-অর রশিদের কাছে প্রেরণ করেন।
হারুন- অর রশিদের আদালতে পৌনে একটায় মামলার শুনানি শুরু হয়। একই ভাবে তারা আদালতে সময়ের আবেদন করেন। বিচারক তাদের আবেদন নাকচ করে দিয়ে চার্জ শুনানি করতে বলেন। কিন্তু আসামিপক্ষ চার্জ শুনানি না করে বারবার সময়ের আবেদন করলে বিচারক রেকর্ড অনুযায়ী সকল আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের নির্দেশ দেন।
চার্জ শুনানি উপলক্ষে সকাল ১০টা নাগাদ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আববাসসহ প্রায় সব আসামি আদালতে উপস্থিত হন।
আসামিপক্ষে শুনানি করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন, সানাউল্লাহ মিয়া, বোরহান উদ্দিন, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, খোরশেদ আলম, মোহসীন মিয়া, ইকবাল হোসেন, ওমর ফারুক ফারুকী প্রমুখ আইনজীবী। এছাড়া জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধানের মেয়ে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধানসহ শতাধিক আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এ মামলার ৪৬ আসামির মধ্যে মির্জা ফখরুলসহ ৩৯ জন আসামিই জামিনে আছেন। চারজন পলাতক ও তিনজন কারাগারে। গতকাল মঙ্গলবার মির্জা ফখরুলসহ জামিনে থাকা ৩৬ জন আসামি আদালতে হাজির ছিলেন।
মির্জা ফখরুল ছাড়া এ মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হচ্ছেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার, স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, সাবেক মেয়র বিএনপির ঢাকা মহানগর কমিটির আহবায়ক সাদেক হোসেন খোকা, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ছাত্রদলের সাবেক নেতা কামরুজ্জামান রতন, বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আববাস, স্বনির্ভর সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম ফজলুল হক মিলন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নাজিম উদ্দিন আলম, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংসদ সদস্য ও ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিবুন-উন-নবী খান সোহেল, সাধারণ সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, সাধারণ সম্পাদক আমীরুল ইসলাম খান আলীম, সাংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান খোকন, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন সরদার, ঢাকা মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মজনু, বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এমপি, ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দল আহবায়ক ইয়াসিন আলী, যুবদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম নীরব, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহবায়ক আ. মতিন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশীদ হাবিব, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক কামাল আনোয়ার আহমেদ লিটু, বিএনপি নেতা ও ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার আবুল বাসার, বিএনপি নেতা ও ৪০ নং ওয়ার্ড কমিশনার আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপি নেতা লুৎফর রহমান ওরফে এল রহমান, বিএনপির সাবেক ধর্মবিষয়ক সম্পাদক নবী সোলায়মান, খিলগাঁও থানা বিএনপির সভাপতি সাবেক কমিশনার ইউনুস মৃধা, তিতুমীর কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ইসমাইল খান শাহীন, স্বেচ্ছাসেবক দল মোহাম্মাদপুর থানা শাখার সভাপতি মান্নান হোসেন শাহীন, ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম-সম্পাদক ওবায়দুল হক নাসির।
জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ, ঢাকা মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম বুলবুল, ছাত্রশিবিরের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন ও সেক্রেটারি আব্দুল জববার মামলার শুরু থেকেই পলাতক।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীর সন্ধান দাবিতে বিএনপির ডাকে হরতালের সময় গত ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে গাড়ি পোড়ানো হয়। ওই রাতেই তেজগাঁও থানায় বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ৪৪ নেতা-কর্মীকে আসামি করে একটি মামলা করে পুলিশ।
গত ১০ মে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে মামলাটিতে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। ২৭ মে ছাত্রশিবির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জববারকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দেয়া হয়।

