|
|
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন
বার্মায় রোহিঙ্গা মুসলিম গণহত্যার ভয়াবহ চিত্র -ইন্টারনেট
সংগ্রাম ডেস্ক ঃ নিউইর্য়ক ভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের আটক করে হত্যা, ধর্ষণ ও গণগ্রেফতার করেছে যা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লংঘন। ৫৬ পৃষ্ঠার রিপোর্টে বলা হয়েছে, চলতি বছর জুনের মাঝামাঝি আরাকান রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে দাঙ্গা থামাতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। এতে করে ঐ অঞ্চলের এক লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং খাদ্য ও চিকিৎসা বঞ্চিত হয়েছে।
চলতি বছর গত জুনের মাঝামাঝি আরাকান রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে দাঙ্গা থামাতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। এর ফলে ওই অঞ্চল থেকে এক লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং খাদ্য ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইন ও রোহিঙ্গারা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছে, দাঙ্গা বন্ধে সেনাবাহিনী কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। যার ফলে সেখানে অসংখ্য হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছেন, আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর যে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড হয়েছে তা বন্ধ করতে মিয়ানমারের নিরাপত্তারক্ষীরা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ রাখতে পারে নাই।
প্রতিবেদনটি রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের ৫৭টি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
রক্ষা না করে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীই রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ড, ধর্ষণ ও গণগ্রেফতার চালিয়েছে। চলতি বছরের জুনে পশ্চিম মিয়ানমারে বৌদ্ধদের মারাত্মক সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকালে এ সকল ঘটনা ঘটে। রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের কাছে মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর পথ বন্ধ করে দেয়। এতে করে লক্ষাধিক মানুষকে বসতভিটা ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে। খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসা সহায়তায় ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়।
দ্য গভর্নমেন্ট কুড হ্যাভ স্টপড দিসঃ সেকটোরিয়ান ভায়োলেন্স এন্ড এনসুইং এবিউসেস ইন বার্মার আরাকান স্টেট’’ শীর্ষক ৫৬ পৃষ্ঠার রিপোর্টে দেখানো হয়েছে। কিভাবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ আরাকান রাজ্যে জাতিগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা সৃষ্টি থামাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আরাকান ও রোহিঙ্গা প্রত্যক্ষদর্শীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলে, এক সম্প্রদায়ের মানুষ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় সরকারি বাহিনী ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল। এমনি পরিস্থিতিতে ব্যাপক হত্যাকান্ড ঘটে। এতে বলা হয়, বর্মী নিরাপত্তা বাহিনী আরাকান ও রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্রাড এডামস বলেন, বর্মী সরকার দাবি করেছিল তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অবসানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অথচ আরাকান রাজ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, নিপীড়ন-নির্যাতন ও বৈষম্য সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের প্রশ্রয় রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, মিয়ানমার সরকারকে তাদের বাহিনী দ্বারা লংঘিত মানবাধিকার পুনর্বহালের জন্য জরুরী পদক্ষেপ নিতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে। মানবিক সাহায্য প্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
‘‘গভর্নমেন্ট কুড হেভ স্টপড দিস’’ রিপোর্ট ৫৭টি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে করা হয়। আরাকান, রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের অন্যত্র ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জুন ও জুলাইয়ে একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। বাংলাদেশেও সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। কারণ সহিংসতা থেকে জীবন বাঁচাতে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় চেয়েছে।
আরাকানের ২৯ বছর বয়স্ক এক তরুণ এবং একজন বৃদ্ধ রোহিঙ্গা উভয়ই পৃথক পৃথকভাবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে বলেছিল।
সরকার এ নিপীড়ন নির্যাতন বন্ধ করতে পারত।
সিতউইয়ে ৩৬ বছর বয়স্ক এক রোহিঙ্গা বলেন, আরাকানের উচ্ছৃংখল জনতা বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছিল। বাসিন্দারা ঘর থেকে বের হবার চেষ্টার সময় আধাসামরিক বাহিনী তাদের উপর গুলী চালায়। বড় বড় লাঠি দিয়ে জনতাকে প্রহার করা হয়।
সরকার জুন মাস থেকেই শত শত রোহিঙ্গা পুরুষ ও বালকদেরকে আটক করে যারা ছিল কার্যত অবরুদ্ধ। উত্তরাঞ্চলীয় আরাকান রাজ্যের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা বন্দী নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। মানবাধিকার কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ করেছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত শহর মৌউলমেইনে জুনের শেষ দিকে ইমিগ্রেশন আইন লংঘনের অভিযোগে ৮২ রোহিঙ্গা মুসলমানকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা কেউ জানে না।
মানবাধিকার কর্মী এডামস এ প্রসঙ্গে দাবি করেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের উচিত কালবিলম্ব না করে আটককৃত রোহিঙ্গাদের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা এবং তাদের পরিবারের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মীদেরকে তাদের সাথে দেখা করার অনুমতি প্রদান করা এবং যাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি তাদেরকে মুক্তি দেয়া। তিনি বলেন, সরকারের জন্য এটি একটি পরীক্ষা, তারা মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার পূরণে কতটা আন্তরিক ও সক্ষম তা এতে প্রমাণিত হবে। মিয়ানমার সরকার ১৯৮২ সালে একটি নাগরিকত্ব আইন তৈরি করে যার মাধ্যমে দেশটির ৮ থেকে ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানের নাগরিকত্ব বেমালুম অস্বীকার করা হয়। কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমানদের দেশ থেকে নির্মূল করতে চায়। গত ১২ জুলাই বার্মার প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন সাম্প্রদায়িক সংঘাতের জন্য সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদেরকেই একতরফাভাবে দায়ী করেন। তিনি বলেন, সংঘাত নিরসনের ‘একমাত্র উপায়' হল তাদেরকে বহিষ্কার করা। তিনি জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থা অথবা তৃতীয় কোন দেশকে রোহিঙ্গাদের দায়িত্ব নেয়ারও আহবান জানান।
বার্মার আইন ও নীতি রোহিঙ্গাদের স্বার্থ পরিপন্থী। দেশটিতে সংখ্যালঘু মুসলমানরা চরম বৈষম্যের শিকার। সে দেশের আইনে রোহিঙ্গা চলাফেরা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি কোন অধিকারই স্বীকার করা হয়নি। সরকারিভাবে তাদেরকে ‘তথাকথিত রোহিঙ্গা' এবং ‘বাঙালী' হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, সরকার রোহিঙ্গাদের রক্ষা করার জন্য কোন তদারকিও করেনি। সংস্থাটি অতিশীঘ্রই তথাকথিত নাগরিকত্ব আইন সংস্কার করে রোহিঙ্গাদের মৌলিক মানবাধিকার সমুন্নত করারও আহবান জানিয়েছে।
ইন্টারনেটে পাওয়া এক খবরে জানা যায়, মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর এখনো গণহত্যা, সম্ভ্রমহরণ, নিপীড়ন ও নির্যাতন চলছে। মিয়ানমারের মংডু থেকে জয়নুল আবেদিন নামে এক রোহিঙ্গা মুসলমান বিদেশী রেডিওকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা জানিয়েছেন।
তিনি জানান, তিন মাইল এলাকা জুড়ে একটি খালে গত দু'দিনে দুই থেকে তিন হাজার লাশ ভাসতে দেখা গেছে। তাছাড়া, আইক্যাপ এলাকায় মাত্র তিনটি মুসলিম অধ্যুষিত গ্রাম ছাড়া অবশিষ্ট সবগুলো গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার পর বাড়ি-ঘর বুলডোজার দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, নাসাকা এবং মগ বৌদ্ধরা মুসলমানদের হত্যার পর বৌদ্ধদের চিতার স্থানে নিয়ে গণকবর দিচ্ছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে জয়নুল আবেদিন জানান।
তিনি জানান, মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা মুসলমান এবং তাদের ধর্ম ইসলাম-শুধু এ কারণেই তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, অত্যাচার নির্যাতনের পথ বেছে নেয়া হয়েছে।
তারাবি নামাজ পড়ানোর অভিযোগে চার বিশিষ্ট ইমামকে সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে বলেও জানিয়েছেন জয়নুল আবেদিন। তাছাড়া, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে কোনো মসজিদে আযান দেয়া যাবে না; একই সঙ্গে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পুলিশ এবং নাসাকা বাহিনী এখনো যাকে খুশি তাকে অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং তার আর খোঁজ মিলছে না।

