Quantcast
ঢাকা, বৃহস্পতিবার 2 August 2012, ১৮ শ্রাবণ ১৪১৯, ১৩ রমযান ১৪৩৩ হিজরী
Online Edition
Twitter
Facebook
Sangram RSS
Our videos
Weather

প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ খবর মেইলে পেতে চাইলে গ্রাহক হোন -

Delivered by
FeedBurner

| পড়া হয়েছে: ৪০৯ বার | মন্তব্য টি

মূলপাতা » প্রথমপাতা

৩নং সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা

ময়মনসিংহে বদর বাহিনীর তালিকায় কামারুজ্জামানের নাম নেই

স্টাফ রিপোর্টার : জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন ৩নং সাক্ষী জহিরুল হক মুন্সী বীর প্রতীক (বার)। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে তাকে জেরা করেন ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট কফিন উদ্দিন চৌধুরী। জেরাতে সাক্ষী বলেন, ময়মনসিংহ এলাকায় রাজাকার বা আল বদর বাহিনীর যে তালিকা যুদ্ধের পরে তৈরি করা হয়েছে তাতে কামারুজ্জামানের নাম নেই। তবে জেলা পরিষদের তালিকায় তার নাম আছে বলে শুনেছি কিন্তু তা দেখাতে পারবো না। স্বাধীনতার পরে কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে কোন মামলা করা হয়নি বলেও তিনি জেরাতে স্বীকার করেছেন। আজ বৃহস্পতিবার তাকে আরো জেরা করা হবে।

জবানবন্দি

আমার নাম জহিরুল হক মুন্সী বীর প্রতীক (বার), পিতার নাম- মৃত আবদুল গফুর মিয়া, আমার জন্ম তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৫০। আমার গ্রাম খামারীয়াপাড়া, থানা শ্রীবরদী, জেলা শেরপুর। ১৯৭১ সালে না'গঞ্জের ইপিআইডিসি, ডকইয়ার্ডে সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি করতাম। ১৯৭১ সালে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বেচ্ছাসেবক গঠন করি এবং ফায়ার ডিফেন্স গঠন করি যাতে বিমান আক্রমণ করলে আমরা বাঁচতে পারি। আমরা ট্রেনিং করতে থাকি। ২৫ মার্চ কালরাতে হানাদারবাহিনী রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করে এবং ঘুমন্ত অবস্থায় বাঙ্গালীদের ওপর চড়াও হয়ে ২০ হাজার বাঙ্গালীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। সেই খবর পূর্বপাকিস্তানে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ২৬ ও ২৭ মার্চ আমরা না'গঞ্জের চাষাড়ায় মহাসড়কে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। আমাদের মনোবল ছিল অটুট। কিন্তু ট্যাংকের সামনে আমাদেরকে ৩০৩ রাইফেল ও মার্ক ৪ রাইফেল নিয়ে যুদ্ধ করতে হবে ধারণা ছিল না। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জোহা সাহেব ও আলী আহমেদ চুনকা আমাদের নির্দেশ দেন যে, পুনরায় ট্রেনিং নিতে বলেন। আমরা উচ্চতর ট্রেনিং নিতে ৪ দিন পায়ে হেঁটৈ ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ হয়ে শফিপুর মাওনা, টাঙ্গাইল মধুপুর, শেরপুর হয়ে ভারতের মহিন্দ্রগঞ্জ প্রবেশ করি। ঐ সময়ে তারিখটি ছিল ১২/৪/৭১। সেখানে গিয়ে দেখি বৃহত্তর ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগের নেতা রফিউদ্দিন ভূঁইয়া ও আরো কয়েকজন রয়েছেন। আমরা তাকে বললাম, আমরা ১২০ জন যুদ্ধে অংশ নিতে ট্রেনিং করতে এসেছি। তিনি কথাবার্তা বলে আমাদের ১৫ দিনের ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন যাতে আমরা রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ভেঙ্গে দিতে পারি। এতে পাকবাহিনীদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। ১৫ দিন পরে আমরা দেশে ফিরে আসি। আমরা ভারত থেকে রসদ নিয়ে এসে ফুলকারচর ব্রিজ, ছনকান্ডা ব্রিজ, টিকরকান্দা ব্রিজ ধ্বংস করি। শেরপুরে এসে দেখি কামরান নামে একজন আলবদর নেতা ছিল তিনি কামারুজ্জামানের টুআইসি। আমি যে কামারুজ্জামানের কথা বলছি তিনি ময়মনসিংহের ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ছিলেন এবং আল বদর-আল শামসের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কড়ুয়া হাইস্কুল মাঠে আল বদরের ট্রেনিং সেন্টার ছিল। আরো একটি ছিল শ্রীবরদী টেংগরপাড়া হাইস্কুলে, বকশীগঞ্জ নুর মোহাম্মদ স্কুল মাঠে ক্যাম্পও ছিল। আমি ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ও তোরায় গেরিলা ট্রেনিং করেছি ১ মাস করে দুই মাস। মারাঠা ফার্স্ট ব্যাটালিয়ন-৯৫ মাউনন্টেইন বিগ্রেট (এলআই)-এ আমাকে অন্তর্ভুক্ত করে আমাকে কমান্ডিং অফিসার হিসেবে নিযুক্ত করে। আমার সুপিরিয়র অফিসার ছিলেন, ভারতের হরদেব সিংক্লে। আমাকে জনগণের সাথে মিশে তথ্য সংগ্রহ করতে দায়িত্ব দেয়া হয়। আমি ভিক্ষুক সেজে হোটেলে বসে কথা বলে অনেক তথ্য নেয়ার চেষ্টা করি।

এক পর্যায়ে আমি জানতে পারি নয়আনী বাজারে সুরেন্দ্র মোহন সাহার পরিত্যক্ত বাসায় ক্যাম্প তৈরি করে দেয়। আমি ভিক্ষুক সেজে ঐ ক্যাম্পের আশপাশে ৪ দিন ভিক্ষা করে তথ্য নেয়ার চেষ্টা করি। একদিন হঠাৎ করে ক্যাম্পে ঢুকে দেখি গেটের ভেতরে মোহন মুন্সী নামে এক আল-বদরকে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি এবং তাকে সালাম দিয়ে ভেতরে গিয়ে দেখি কামারুজ্জামান ও মেজর আইয়ুব দোতলায় উঠে যাচ্ছে। সেন্ট্রি আমাকে দেখে বললো, ‘‘কোন হ্যায়- কেয়া মাংতা হ্যায়’’। মোহন মুন্সী ও সেন্ট্রি তখন ছটফট করছিল। আমি নিচ থেকে শুনতে পারলাম ওপরে দোতলায় শব্দ হচ্ছে ‘আল্লাগো মাগো বাঁচাও'।

ঐ ক্যাম্প থেকে সব তথ্য নিয়ে সন্ধ্যার দিকে আমি অন্যত্র নিরাপদে চলে যাই। পরে লোকমুখে জানতে পারি সুরেন সাহার বাড়ির ক্যাম্পে থাকা আটক মহিলা ও পুরুষদের বেয়নেট চার্জ করে ও গুলী করে পানিতে ভাসিয়ে দেয়। আমি আরো জানতে পারি প্রিন্সিপাল হান্নান সাহেবকে কলেজ বন্ধ থাকায় তাকে মাথা ন্যাড়া করে চুনকালি মেখে কোমরে দড়ি বেঁধে সারা শহর ঘুড়িয়েছে।

কানসা ইউনিয়নের মোকলেছ চেয়ারম্যান হজ্জের জন্য ৫০ হাজার টাকা জমা দিতে শেরপুর আসলে কিছু আলবদর কামারুজ্জামানকে জানায় এই চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ করেন এবং তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন। পরে মোখলেছ চেয়ারম্যানকে আটক করে রাখা হয়। পরে তাকে হত্যা করা হয়। ৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে আমি বেলটিয়া নামকস্থানে অবস্থান করার সময়ে আমাকে আটক করে জামালপুরে পিটিআইতে পাকিস্তানী ক্যাম্পে আমাকে হাত-পা বেঁধে ওয়াবদা ক্যাম্পে কোয়ার্টার গার্ডে বেঁধে রাখে। আমি বাঁধা অবস্থায় জানতে পারলাম পাকিস্তানী কমান্ডার সুলতান খান ও আল বদর নেতা কামারুজ্জামান ঝিনাইব্রিজ পরিদর্শনে গেছেন। দুপুর একটা বা দেড়টার দিকে তারা দু'জন ফিরে আসে। আমার কাছে থাকা সাড়েন্ডারপত্রটি আর্মিরা সুলতান খানকে দেয়ার পর সেটি সে পড়ে দেখে হাতের ম্যাকজিন দিয়ে আমাকে বাড়ি দিয়ে চার-পাঁচটি দাগ ফেলে দেয়। আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়ে ওপরে ঝুলিয়ে রাখতে বলে। আমি তখন বলি আমি মুক্তিযোদ্ধা না; আমি সাধারণ কৃষক। ভয় দেখিয়ে আমাকে এখানে পাঠানো হয়েছে। সুলতান খান ঐ চিঠির জবাব লিখে তা আমাকে ক্লের কাছে পৌঁছে দিতে বলে। আমি অভিনয় করে বলি আমি আর যাব না। আমাকে ওরা মেরে ফেলবে। সকাল ১১টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত আটকে রেখে আমাকে ছেড়ে দেয়। আমাকে আমার সাইকেল, টাকা ফেরত দেয়। আমাকে এক কাপ চা খেতে হয়। আমি কোনমতে আমি আমার ক্যাম্পে ফিরে আসি। চলার পথে দেখতে পাই গাছের সাথে বাঁধা অবস্থায় অনেক লাশ আর লাশ?

প্রশ্ন : স্বাধীনতার পরে আপনি কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কোথাও দাখিল করেননি কেন?

উত্তর : ২০১০ সালে তদন্তকারী অফিসারের কাছে জবানবন্দী দিয়েছি। এর আগে আমি নিরাপত্তা পাইনি কোন আইন ছিল না। তাই আগে পারি নাই।

প্রশ্ন : তদন্ত কর্মকর্তার কাছে আপনি নিজ উদ্যোগে যাননি আপনাকে ডেকে নিয়েছে?

উত্তর : হ্যাঁ, আমি নিজ উদ্যোগে যাইনি। আমাকে ডেকে নেয়া হয়েছে। নিজ উদ্যোগে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

প্রশ্ন : স্বাধীনতার পর বিজয় অর্জিত হওয়ার পরে স্বাধীনতা বিরোধীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। যারা এলাকায় ছিল তারা গণপিটুনী খেয়ে মারা গেছে।

উত্তর : হ্যাঁ, গণপিটুনীতে অনেকে মারা গেছে।

প্রশ্ন : যুদ্ধের পরে দালাল আইনে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং এসব অপরাধ যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়েছে।

উত্তর : সত্য নয়।

প্রশ্ন : দালাল আইনে সারাদেশ থেকে ৩৭ হাজার লোক গ্রেফতার করা হয়।

উত্তর : ৩৭ হাজার কি না জানি না তবে আমার এলাকা থেকেও অনেককে গ্রেফতার করা হয়।

প্রশ্ন : কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়েছিল কি?

উত্তর : এটা আমি জানি না।

প্রশ্ন : যুদ্ধের পরে প্রশাসন ও আইনশৃক্মখলার দায়িত্ব পালন করে মুক্তিযোদ্ধারা।

উত্তর : আমার জানা নেই।

প্রশ্ন : যুদ্ধের সময়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকা করা হয়েছিল।

উত্তর : মুক্তিযোদ্ধারা এই তালিকা তৈরি করেনি। ডিসি অফিসের তালিকায় নাম আছে।

প্রশ্ন : তালিকায় কামারুজ্জামানের নাম আছে বলে আপনি অসত্য কথা বলছেন।

উত্তর : সত্য নয়।

প্রশ্ন : আপনি আওয়ামী লীগ সমর্থন করেন?

উত্তর : আমি কোন পার্টি করি না। আমি মুক্তিযোদ্ধা, যখন যে সরকার আসে সে সরকারের পক্ষে কাজ করি।

প্রশ্ন : মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি দল আছে। একটি আওয়ামী লীগ সমর্থন করে অন্যটি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী দল। আপনি আওয়ামী সমর্থক।

উত্তর : সত্য নয়।

প্রশ্ন : যুদ্ধের সময়ে আপনি কোথায় থেকেছেন?

উত্তর : আমি ময়মনসিংহ শেরপুর ও ঢাকায ঘোরাফেরা করেছি। শেরপুর থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব ছিল ৭৯ মাইল। সময় লাগতো ৪ ঘণ্টা।

প্রশ্ন : শেরপুরে কোথায় কোথায় ক্যাম্প ছিল।

উত্তর : শেরপুরে জিকে হাইস্কুল, বকশীগঞ্জে নুর মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ে। জামালপুরে পিটিআই স্কুলেও আর্মি ক্যাম্প ছিল। শ্রীবরদীতে বড় কোন ক্যাম্প ছিল না। সেখানে আল বদর ক্যাম্প ছিল।

প্রশ্ন : আর্মিরা রাতে কোথায় থাকতো।

উত্তর : সাধারণত আর্মিরা তাদের বড় স্থায়ী ক্যাম্পে থাকতো তবে মাঝে মাঝে অস্থায়ী ক্যাম্পে থাকতো। নিজস্ব যানবাহন ছিল রসদ পরিবহনের জন্য।

প্রশ্ন : মেজর রিয়াজ আহত হলে তাকে কোথায় নেয়া হয়?

উত্তর : মেজর রিয়াজ কামালপুরে যুদ্ধে আহত হয়। তাকে আর্মিদের জীপে করে জামালপুর নেয়া হয়। পরে তাকে ও আলবদর নেতা কামরানকে পাকিস্তানে নেয়া হয়। সময় হবে আগস্ট মাসের প্রথম দিকে।

প্রশ্ন : সুরেন সাহার বাড়ি থেকে সেরিব্রিজ কত দূর হবে?

উত্তর : ১ কিলোমিটার দূরে হবে।

প্রশ্ন : কামালপুর থেকে শেরপুরের দূরত্ব কত হবে।

উত্তর : কামালপুর থেকে বকশীগঞ্জ ও শ্রীবরদী হয়ে শেরপুরের দূরত্ব হবে ৫৪ কিলোমিটার। এটিই ছিল মূল রাস্তা।