|
|
১৮ দলীয় জোটের বিক্ষোভ সমাবেশে মির্জা ফখরুল
গতকাল রোববার ১৮ দলীয় জোটের উদ্যোগে নয়াপল্টনস্থ বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য পেশ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম
0এই সরকার আদালতকে দলীয় আদালতে পরিণত করেছে -অধ্যাপক মুজিব
স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে আগে নিঃশর্তভাবে ঘোষণা দিতে হবে আগামী নির্বাচন হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই। তারপরই কেবল সেই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অন্য কিছু নিয়ে নয়। তিনি বলেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সরকারি দলের জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। অবিলম্বে তত্ত্বাবধায়কের দাবি না মানলে ঈদের পরে যে আন্দোলন শুরু হবে তা গতিরোধ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
গতকাল রোববার দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর ১৮ দলীয় জোট আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। ১৮ দলীয় জোটের ৪৬ নেতার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজন করা হয়।
ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবদুস সালামের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, এনডিপির মহাসচিব আলমগীর মজুমদার, বাংলাদেশ পিপলস লীগের মহাসচিব সৈয়দ মাহবুব হোসেন ও ন্যাপ মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী সহকারী সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল বারী বাবু প্রমুখ। সমাবেশে ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রস্তাব দিয়ে লাভ হবে না। আপনি প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, মন্ত্রী ও এমপিরা সপদে থাকবেন তারপর নির্বাচন হবে। তখন কি আমরা ডুগডুগি বাজাবো? সেটা হতে দেয়া হবে না। আপনাকে সবার আগে বলতে হবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ (তত্ত্বাবধায়ক) সরকারের অধীনে। এরপরই প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন তা নিয়ে আলোচনা-সংলাপ হতে পারে। আমরা যেকোন স্থানেই আলোচনায় রাজি আছি।
মির্জা ফখরুল প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, '৯৫ সালের কথা আপনার ভুলে গেলে চলবে না। আপনার মনে থাকার কথা, তখন আপনি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। ওই সময় কমনওয়েলথের মহাসচিব (স্যার নিনিয়ান) ৫ জন সরকারি এবং ৫ জন বিরোধী দলের সদস্য নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি তখন সেই প্রস্তাব তো মানেনইনি বরং সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছিলেন। আমার লজ্জা হয় আপনি আজ কোন মুখে বলেন, আপনি প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, মন্ত্রীরা মন্ত্রী থাকবেন, এমপিরা এমপি থাকবেন, আর সে নির্বাচন জনগণ মেনে নেবে! এখনো সময় আছে এসব উদ্ভট চিন্তা বাদ দিয়ে জনগণের ভোটের অধিকারের দাবি অনুযায়ী নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন।
সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, অবিলম্বে তত্ত্বাবধায়কের দাবি মেনে নিন। নইলে ঈদের পরে যে আন্দোলন আসছে সে দুর্বার গণআন্দোলনের গতিরোধ করা আপনাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালতো করতেই হবে, তবে বিদায় নিতে হবে নাস্তানাবুদ হয়ে। এখনো সময় আছে সোজা পথে আসুন। জনগণকে জিম্মি অবস্থা থেকে মুক্ত করুন। তিনি বলেন, আজ যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে তাকে এবং তাদের আইনজীবীদের কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না। এটা কেমন আইনের শাসন চলছে? এ প্রশ্ন তুলে ফখরুল বলেন, বর্তমান আইনের শাসন ব্যবস্থা ৭২-৭৫কেও হার মানিয়েছে। তখন এই আ.লীগ বিরোধী দলের ৪০ হাজারেরও বেশি নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছিল। দেশের মানুষের নিরাপত্তা নেই উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ইলিয়াস আলীকে সরকারের লোকেরাই তুলে নিয়ে গেছে। তারপর ৪ মাস চলে গেলেও তাকে ফেরত দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, প্রতিটি অন্যায়ের হিসাব এ দেশের মানুষ সময় মতো নেবে। কারণ এ সরকারের সময় হত্যা-গুম-নির্যাতনে শুধু অতিষ্ট নয়, কেউ স্বজন হারানোর বিচারটি পর্যন্ত পাননি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবি জানানোর পাশাপাশি তিনি হত্যা-গুম বন্ধ করা এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি না করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করছে। আর সে কারণেই বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ করে ১৮ দলীয় জোটের নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিচ্ছে এবং যাদের বিরুদ্ধে মামলা তাদের কোনো ধরনের সুযোগ না দিয়ে অভিযোগ গঠন করেছে। সরকারকে বলবো, মামলা দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের আহবান জানিয়ে বলেন, আপনারা এতো জনপ্রিয় হলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে দেখুন রাজনৈতিক আন্দোলন কোন পর্যায়ে যায়।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, যে আদালত কামরুলের (আইনপ্রতিমন্ত্রী) টেলিফোনের অপেক্ষায় থাকে সেখানে আমরা ন্যায় বিচার পাবো না এটাই স্বাভাবিক। সেই আদালতে আমরা যদি না যাই তাহলে আদালত অবমাননা হবে না। কিন্তু যারা ন্যায় বিচার করছে তারাই আদালত অবমাননা করছে। তিনি বলেন, মুজিব মার্কা কোর্ট দিয়ে আদালতের মান রক্ষা করা যাবে না। যারা প্রহসনের এজলাসে বসে বিচারের নামে প্রহসন করে তাদের জন্যে এই সমাবেশ কোনো কাজ দিবে না। ভিকটিমদের কথা বলার সুযোগ না দেয়ার কারণে একদিন তাদেরও জনতার সম্মুখে আনা হবে।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, পবিত্র রমযানে এখানে সমাবেশ করার কোনো কথা ছিল না। কিন্তু বর্তমান স্বৈরাচার সরকারের মামলা হামলার কারণে বাধ্য হয়ে এ সমাবেশ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলার চার্জশিট দিয়ে এ সরকার আগুন নিয়ে খেলা শুরু করেছে। তারা সারা দেশে আগুন জ্বালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই আগুনে তারাই (সরকার) জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী একদিকে আলোচনার কথা বলছেন। অন্যদিকে বিরোধী জোটের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলার চার্জশিট দেয়া হচ্ছে। এটা তার কথার সাথে মিলে না।
অধ্যাপক মুজিব বলেন, আমরা সরকারের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি। তবে তার আগে ১৮ দলীয় জোটের নেতাদের নামে দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও কারাগারে আটক নেতাদের মুক্তি দিতে হবে। আর আদালতের রায় অনুযায়ী কেয়ারটেকার ব্যবস্থার অধীনে আগামী নির্বাচন দিতে হবে। এই দাবি মানা না হলে সরকারের সাথে কোনো আলোচনাই হবে না। তিনি বলেন, এই সরকার আদালতকে দলীয় আদালতে পরিণত করেছে। এটা এখন প্রজাতন্ত্রের নয়, আ.লীগের আদালতে পরিণত হয়েছে। এই দলীয় আদালতের রায় আমরা মানি না। আমরা নিরপেক্ষ আদালতের রায় মানবো।
তিনি বলেন, জনগণের প্রতি এই সরকারের কোনো নজর নেই। তারা ব্যস্ত কথিত মানবতাবিরোধী বিচার নিয়ে। অথচ তারাই মানবতাবিরোধী অপরাধ করে চলেছে। জাবিতে ধর্ষণের সেঞ্চুরি করছে, সিলেটে কলেজে আগুন দিয়েছে, প্রতিনিয়ত গুম, হত্যা, সন্ত্রাস করছে। ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা দিয়ে শুধু মানুষই হত্যা করেনি লাশের ওপর উঠে তারা নৃত্য করেছে। আগে বিচার করতে হলে এসবের বিচার করতে হবে। তিনি বলেন, এই সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অবশ্যই করা হবে। আর সেটি হবে জনতার আদালতে।

